কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে কুয়াশার খামে শীতের আগমন © টিডিসি ফটো
‘বৃক্ষের পদতলে জীর্ণপত্রের অশেষ উৎসব/বাতাসে কীসের গন্ধ/কাদের সঙ্গীত/একদিন ঘুম ভেঙে দেখি/এসে গেছে শীত’ কবির ভাষায় এভাবেই প্রকৃতিতে আগমন ঘটে কুয়াশার চাঁদর মুড়ি দেয়া শীতের বুড়ির। শীত বুড়ির ঠান্ডা হিমেল হাওয়ার পরশে বিবর্ণ হয়ে উঠে প্রকৃতি। প্রকৃতি যেন হারিয়ে ফেলে তার আপন রং। দিন শেষে সন্ধ্যা নেমে এলেও কোন কোন দিন দেখাই মেলে না শীতকালের বহু আকাঙ্ক্ষিত সূর্য্য মামার।
সেই সময়ই চলে এসেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঋতুচক্রে ক্যালেন্ডারের পাতায় এখনও হেমন্তের ছোঁয়া। এক পশলা বৃষ্টির পানি কুবিতে এনে দিয়েছে ঘন কুয়াশার শীত। ঝরে পড়ছে হলদে সবুজ পাতা, কাক ডেকে যায় হাক ছেড়ে। পাখির কিচির শব্দে ভরে উঠে চারপাশ। এপাশ থেকে ওপাশে ছুটে চলে বুড়ো শালিকের দল। কৃষ্ণচূড়ার ডালে ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে হুতুম প্যাঁচা।

এমন অমলিন সৌন্দর্যের সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে রংহীন ক্যাম্পাসে একটু রঙের ছোঁয়া লাগাতে। ঝরা পাতা সরিয়ে তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় হলুদ গাঁদা, ডালিয়া আর শিউলি ফুলে ভরে উঠে ক্যাম্পাস। তবে যত শীতই হোক না কেন বেলা বাড়তেই শিক্ষার্থীদের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা উৎসবমুখর পদচারণায় ক্যাম্পাস যেন আবারও প্রাণ ফিরে পায়। গায়ে শীতের কাপড় জড়িয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে যখন ওরা আড্ডায় মেতে উঠে, তখন মনে হয় যেন শীতের বুড়িকে ওরা উপহাস করছে।
কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্য মামা যখন পৃথিবীতে উকি দেয়, তখন যেন ঝলমল করে উঠে পুরো ক্যাম্পাস। শিশিরভেজা দূর্বাঘাসে নরম রোদের ছোঁয়া লাগতেই নতুন করে জেগে উঠে শিক্ষার্থীদের প্রাণ। অনেকে নিজের শরীরকে আরেকটু ঝালিয়ে নিতে বের হন ব্যায়াম করতে। অনেকে আবার মেতে উঠেন খেলাধুলায়।
ঋতুচক্রে অন্য পাঁচটি ঋতু হতে ক্যাম্পাসে শীতকাল ধরা দেয় আলাদাভাবে। রুক্ষতা, তিক্ততা ও বিষাদের প্রতিমূর্তি হয়ে আসে শীত। প্রকৃতি হয় বিবর্ণ, বিরাজ করে রুক্ষতা। অধিকাংশ গাছের পাতা ঝরে পড়তে থাকে। কুয়াশাচ্ছন্ন সমগ্র প্রকৃতি, শিশিরসিক্ত রাস্তাঘাট কিংবা হিমেল বাতাস নিয়ে আসে ভিন্ন রূপ। কর্মমুখর প্রকৃতি যেনো থমকে দাঁড়ায়।
আরও পড়ুন: শীত আর ব্যাডমিন্টন যেন একই সুতোয় গাঁথা!
শীতের সকালের কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশায় সবকিছু জড়সড় হয়ে আসে। সামনের কোন কিছুই দেখতে পাওয়া যায় না। সবকিছু যেনো অস্পষ্ট মনে হয়। কখনো কখনো কুয়াশার স্তর এত ঘন থাকে যে, দেখলে মনে হয় সামনে কুয়াশার পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। এ সময় হাজারো পাখির আগমন ঘটে ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে। শীতের আগে থেকেই তারা আসতে শুরু করে। তাদের কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয় পুরো বিশ্ববিদ্যালয়।
এক সকালে ঘুরতে ক্যাম্পাসে কথা হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে। শীতের সকাল উপভোগ করতে এসে লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মারুফ আহমেদ বলেন, যখন কুয়াশা ভেদ সূর্যি মামা পৃথিবীতে উকি দেয়, তখন গাছের আড়ালে সূর্যের তির্যক রশ্মির যে সৌন্দর্য, এটা নগরীর মানুষজন কখনোই উপভোগ করতে পারে না। শীতের সকালে আমাদের লাল বাস, নীল বাস দেখার একটা আলাদা মজা আছে। সকালে যারা জাগে না, তারা কখনো এটা উপলব্ধি করতে পারবে না।
মেহেদী হাসান শাহীন নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ক্যাম্পাসে এসেছি এখনো এক বছর হয়নি। কুমিল্লা আসার আগেই শুনতাম এখানের শীতের সকাল নাকি সুন্দর। আজকে সকালে বের হলাম হলাম দেখতে। দেখতে এসে তো আমি অবাক। এত সুন্দর চারদিকে, এত কুয়াশা, অবাক করার মতো। অনুভূতি প্রকাশ করার মতো না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী পুরনো স্মৃতি ভাগাভাগি করে বলেন, আমার পড়াশোনা শেষ হয়ে আসছে। ক্যাম্পাসে এটাই আমার শেষ শীত। এই শীত যেমন চলে যাবে, আমিও চলে যাব। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শীতকে আমি খুব বেশি মিস করব। শীতের সকাল, এই প্রকৃতিকে আমি খুব বেশি মিস করব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ সোহরাব উদ্দীন বলেন, যে লোকটা কখনোই সকালে বের হতো না, সে লোকটাও কিন্তু কুয়াশা দেখা জন্য বের হয়ে। শীতের সকালটা দেখে। সে জায়গায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা, পাহাড়ি পরিবেশে এখানকার প্রকৃতিটা এতই চমৎকার, শীতের সময়টা যেন একেবারে প্রাণবন্ত হয়ে সেঁজে উঠে।