বাদ পড়া রুবেল
শিক্ষার্থী মো. রুবেল হোসেন © সংগৃহীত
৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও চূড়ান্ত গেজেটে নাম আসেনি ঢাকা মেডিকেল কলেজেরকে-৭৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. রুবেল হোসেনের। নিজের পরিবারের প্রথম বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘ চার-পাঁচ বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পর এমন পরিণতিতে ভেঙে পড়েছেন তিনি। তার দাবি, নিজের নামে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই, এমনকি তার নিজের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও নেই। তাহলে কী কারণে তাকে গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হলো, সেই প্রশ্ন তুলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ পুনর্বিবেচনা ও ন্যায়বিচারের আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নিজের হতাশা, পরিবারের স্বপ্ন এবং গেজেট থেকে বাদ পড়ার কারণ জানতে চেয়ে এসব কথা বলেন রুবেল। তার বাড়ি বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলায়।
ফেসবুক পোস্টে রুবেল লেখেন, ‘গেজেটে শুধু আমার নামটি বাদ পড়েনি, ভেঙে গেছে একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন! আজ জীবনে এমন একটি পোস্ট লিখতে হবে, তা কোনোদিন কল্পনাও করিনি।
তিনি বলেন, ২০২২ সালে ৪৫তম বিসিএসের সার্কুলার প্রকাশিত হলো। ২০২৩ সালে প্রিলিমিনারি, ২০২৪ সালে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম। ২০২৫ সালে ক্যাডার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হলাম। নিজের বংশের প্রথম বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্নটা তখন সত্যি হতে চলেছে বলে মনে হয়েছিল। অসুস্থ মা-বাবা, বড় ভাই ও বোনের মুখে একটু স্বস্তির হাসি দেখে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষ মনে হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে দেখলাম গেজেটে আমার নাম নেই!
‘দীর্ঘ চার-পাঁচ বছরের সাধনা, অসংখ্য নির্ঘুম রাত, ব্যক্তিগত ত্যাগ আর বুকভরা স্বপ্নের শেষ পরিণতি কি এটাই? ৪৮তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় ভালো নম্বর থাকা সত্ত্বেও ভাইভায় বাদ পড়লাম। ৪৬তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও রিপিট ক্যাডার-সংক্রান্ত বিষয় এবং ৪৫তম বিসিএসের সুপারিশের ওপর আস্থা রেখে আর ভাইভায় অংশ নিইনি। অথচ আজ সেই ৪৫তম বিসিএসের গেজেটেই আমার নাম নেই!
আমার অপরাধটা কী? আমি জানতে চাই!’
রুবেল বলেন, আমার বাবা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে দীর্ঘ ১৬–১৭ বছরের শাসনামলে আমাদের পরিবারকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমার নামে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই। আমার নিজের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও নেই। তাহলে কোন যুক্তিতে আমি গেজেট থেকে বাদ পড়লাম? আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তার স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত মূল্যায়ন চাই।
তিনি বলেন, আমি কারও করুণা চাই না। আমি চাই আমার বাদ পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ, স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং ন্যায়বিচার। আজ আমি আমার মাকে ফোন দেওয়ার সাহসটুকুও পাচ্ছি না। পরিবারকে কী বলব? যে মা-বাবা আমার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নে এত বছর অপেক্ষা করেছেন, তাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে কীভাবে বলব সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও শেষ পর্যন্ত আমি গেজেটভুক্ত হতে পারিনি? নিজের এলাকায়, মেডিকেল ক্যাম্পাসে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখে যে ছেলেটি দিনের পর দিন পড়াশোনা করেছে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চেয়েছে, আজ সেই ছেলেটিই রাষ্ট্রের গেজেট থেকে বঞ্চিত!
‘আমারও একটি পরিবার আছে। অসুস্থ মা-বাবার পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন আছে। পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার স্বপ্ন আছে। আজ সেই স্বপ্নগুলো অনিশ্চয়তায় ঢেকে গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালা উদ্দিন, চিফ হুইপ নজরুল ইসলাম মনি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমার আকুল আবেদন আমার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পুনর্বিবেচনা করুন।
বিসিএস কর্তৃপক্ষ, একবার ভাবুন একজন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী আজ নিজের অসুস্থ মা-বাবার মুখোমুখি হওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেছে! যে ছেলেটি পরিবারকে স্বস্তি দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, আজ সে নিজেই পরিবারের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা! আমি কি এই দেশের নাগরিক নই? আমার কি ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নেই? আমি বাঁচতে চাই, ঘুরে দাঁড়াতে চাই, রাষ্ট্রের সেবা করতে চাই শুধু আমার ন্যায্য অধিকারটুকু নিয়ে। আজ আমি আপনাদের কাছে করুণা চাইছি না ন্যায়বিচার চাইছি। আমার কান্না যেন সিদ্ধান্তের আগেই হারিয়ে না যায়!!!’
প্রসঙ্গত, ৩২২ দিনের অপেক্ষার পর বুধবার (১৪ অক্টোবর) ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করে সরকার। এতে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ১০৫ জন। ২ হাজার ৩০৯টি শূন্য পদের বিপরীতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
সে সময় চলমান জটের কারণে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক—এই তিন ধাপের পরীক্ষা শেষ হতে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময় লাগে। পরে গত বছরের ৬ নভেম্বর ক্যাডার পদে মোট ১ হাজার ৮০৭ জনকে সাময়িকভাবে সুপারিশ করে ফল প্রকাশ করে পিএসসি। তাঁদের মধ্যে বুধবার ১ হাজার ৭০২ জনের গেজেট প্রকাশ করে সরকার।