একই বিষয়ে পড়াশোনা করেও টিউশন ফি ভিন্ন

জাবি
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী   © সংগৃহীত

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক শেষ করেছেন শিপন চন্দ্র দাস। ফার্মেসি বিষয়ে স্নাতক করেছেন তিনি। তবে শিপনের বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার পিছনে একটি গল্প রয়েছে।

২০১৩ সালে ‘ক’ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ এবং ২০১৫ সালে সাভারের একটি কলেজ থেকে জিপিএ-৪.৯০ পেয়ে এইচএসসি পাশ করেছেন তিনি।

এরপর অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায়। তবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সীমিত আসন ও পারিবারিকভাবে ঢাকার বাহিরে পড়াশোনার সম্মতি না দেওয়ায় ঢাকার যেকোনো একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

শুরু থেকেই তার ফার্মেসি বিষয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছে ছিল। এজন্য বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিষয়ে পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় টিউশন ফি নিয়ে চিন্তায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেন তিনি।

শিপন জানান, এখন যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পড়াশোনা শেষ করেছেন, শুরুতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নয় বরং তার পছন্দের তালিকায় অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। কিন্তু এতো বেশি টিউশন ফি জেনে তার পরিবার ঘাবড়ে যায়। এজন্য আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন।

আরও পড়ুন : ছাত্রলীগের সম্মেলন কবে?

দেশের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিষয়ে স্নাতকের টিউশন ফি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে ৯ লাখ ৮১ হাজার ১২০ টাকা, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে ৮ লাখ ৭৩ হাজার ২০০ টাকা, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ৮ লাখ ৪৭ হাজার ৮৫০ টাকা, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, সিটি ইউনিভার্সিটিতে ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৮০০ টাকা, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ১০০ টাকা শিক্ষার্থীদেরকে দিতে হচ্ছে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে স্নাতক পড়াশোনায় প্রতি ক্রেডিট শিক্ষার্থী খরচ হবে ৬ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া ল্যাব ফি, স্টুডেন্ট অ্যাক্টিভিটি ফি, কম্পিউটার ল্যাব ফিসহ অন্যান্য খরচ তো রয়েছেই। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামান্য দূরেই অবস্থিত ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি পড়াশোনায় প্রতি ক্রেডিটে ৫ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়।

টিউশন ফি এর এমন সমন্বয়হীনতার শুধুমাত্র ফার্মেসি বিভাগের ক্ষেত্রেই নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিটি বিষয়ে পড়াশোনায় বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে এই পার্থক্য দেখা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সেমিস্টার ফির মধ্যে এরূপ সমন্বয়হীনতার শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের অভিযোগ করেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মনে করে যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, তারা সবাই ধনী পরিবারের সন্তান। কিন্তু একই বিষয়ে পড়েও শিক্ষার্থীদের কেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন অংকের টিউশন ফি দিতে হচ্ছে। এ নিয়ে তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ভূমিকার সমালোচনাও করেছেন।

তাদের একজন সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তবে পছন্দের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে না পারায় শুরুতে আক্ষেপ থাকলেও সাবিনার এখন সেই আপসোস নেই।

সাবিনা জানান, যাতায়াত সুবিধার কথা বিবেচনা করে আমি ও আমার প্রতিবেশী বান্ধবী একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গিয়েছিলাম। তবে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি অনেক বেশি। যা আমার পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল না। পরে আমি আমার বাসা থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই এবং আমার বান্ধবী বাসা থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। কিন্তু কিছুদিন পরেই লক্ষ্য করি আমার এবং তার পড়ার সব বিষয়ই একই, শুধুমাত্র টিউশন ফি এর ক্ষেত্রে বিস্তর ফারাক রয়েছে।

আরও পড়ুন : শিক্ষার্থী ভর্তি করালে উৎকোচ দেয় ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি

সাবিনা আরও জানান, একই বিষয়ে পড়াশোনা করেও টিউশন ফি এর এমন সমন্বয়হীনতার সাধারণ ও আমার মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সরকার ও ইউজিসির এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. লুৎফর রহমান জানান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো স্বাধীনভাবে চলছে। কেন্দ্রীয়ভাবে কোন নির্দেশনা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপরে যদি বোর্ডের মতো কেউ অভিভাবক হিসেবে থাকতো, তাহলে হতো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব ভঙ্গিতে চলে, তাহলে এটা সমন্বয় করতে গেলে সবগুলোকে একত্রে নিয়ে আসতে হবে। এরপর একজন কর্তৃপক্ষের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সেটা এখনো হয়নি। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন টিউশন ফি, বিভিন্ন ধরনের ফি নিচ্ছে।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম জানান, এটা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী চিন্তাভাবনা করছেন, এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইলে নির্ধারিত করতে পারে। সেটা আলোচনা সাপেক্ষে।

এক্ষেত্রে বিষয়টি শিক্ষার্থীদের জন্য ভোগান্তির কারণ কিনা প্রশ্নে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত। ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার বাহিরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফি তো একই হবে না। এটা শিক্ষার মান, শিক্ষার ধরনের ওপর নির্ভর করে। এজন্য আমরা শিক্ষার্থীদের সেমিস্টার ফি নির্ধারণ করতে পারি না। ভালো ভালো শিক্ষক তো আর কম বেতনে আসবে না। তবে সহনীয় পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি দেখে একটা রেঞ্জের ভিতরে করতে পারি।


x

সর্বশেষ সংবাদ