পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া © এআই দিয়ে বানানো ছবি
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের সরকারি চাকরি থেকে বাদ দিতে যে ভেরিফিকেশন ব্যবস্থার শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে, সময়ের সঙ্গে সেটিই সরকারি চাকরিতে নিয়োগের নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও ভেরিফিকেশনের কারণে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী নিয়োগপত্র থেকে বঞ্চিত হওয়ার এমন নজির অতীতে নেই। আগে যাচাই-বাছাইয়ে হাতে গোনা কিছু প্রার্থী বাদ পড়লেও এবার পুলিশ ভেরিফিকেশনের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ভেরিফিকেশন যুক্ত হওয়ায় বাদ পড়ার সংখ্যা বেড়েছে মত বিশ্লেষকদের।
গত ২৪ সেপ্টম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়া শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া শুরু করে সরকার। ওই দিনই শত শত প্রার্থী অভিযোগ করেন চূড়ান্ত ভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও তারা নিয়োগপত্র পাননি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও অনেকের নাম তালিকায় না থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছেন তারা। প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৭ জেলার অন্তত ৭৭৮ জন নিয়োগপত্র পাননি। তবে সব জেলার তথ্য এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ সংখ্যা ধারণার থেকেও অনেক বেশি বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টদের।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল মান্নান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সরকারি প্রাথমিকে নিয়োগের আগে সাধারণত পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হয়। প্রার্থীর আবেদনপত্রে দেওয়া ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য পুলিশ যাচাই করে থাকে।
তিনি বলেন, আগেও পুলিশ ভেরিফিকেশনে বিভিন্ন কারণে প্রার্থী বাদ পড়েছেন। কারও বিরুদ্ধে মামলা বা হত্যা মামলা থাকা, আবেদনে ভুল তথ্য দেওয়া কিংবা এক উপজেলার প্রার্থী অন্য উপজেলায় আবেদন করার মতো বিভিন্ন কারণে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ক্ষেত্রে নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না।
মান্নান বলেন, কোন প্রার্থী নিয়োগপত্র না পেলে তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারতেন। পরে তার আবেদন ও ভেরিফিকেশনের তথ্য যাচাই করে দেখা হতো। ভুল বা অসংগতির কারণে নিয়োগ না দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হতো এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রতিবেদনও দেওয়া হতো।
সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এবারই প্রথম এনএসআইয়ের গোয়েন্দা তদন্ত যুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় উপসচিব (বিদ্যালয়-২) রাজীব কুমার সরকার।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় উপসচিব (বিদ্যালয়-২) রাজীব কুমার সরকার বলেন, সহকারী শিক্ষক নিয়োগে এবার পুলিশ ভেরিফিকেশনের পাশাপাশি এবার এনএসআই ভেরিফিকেশন যুক্ত হয়েছে।’
এনএসআই ভেরিফিকেশন যুক্ত করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজীব কুমার সরকার বলেন, ‘এটার কারণ আমার জানা নেই। তবে সরকার যদি নিয়ম করে, সেটাকে অবশ্যই শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। ডেফিনেটলি পুলিশ ভেরিফিকেশনেও সবাই শ্রদ্ধাশীল ছিল।’
বর্তমানে এনএসআই ভেরিফিকেশন যুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে পরিষ্কার তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। এ সমাধানে সরকার কী করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারবেন।
নিয়োগ পরবর্তী ধাপে ভেরিফিকেশন বা নিয়োগ বাতিল-স্থগিত করার মতো কোন প্রক্রিয়া এবার যুক্ত হয়েছে কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজীব কুমার সরকার বলেন, ‘পরবর্তী ধাপগুলো নিয়ে আমার কোন ধারণা নেই।’
সুপারিশপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিন মাঠে আন্দোলনকারী এক প্রতিনিধি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নিয়োগের আগেই এমন কঠোর ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, গত ২৬ এপ্রিল প্রার্থীদের মধ্যে ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে আমাদের জানানো হয়েছিল, নিয়োগের আগে ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা হবে। এসব কারণে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দেরি হচ্ছে বলেও জানিয়েছিলেন তারা।
এই ভেরিফিকেশন এত কঠোর হবে সে বিষয়ে ধারণা ছিল না তাদের। নিয়োগের আগে ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে প্রার্থী বাদ দেওয়ার ঘটনা অতীতে খুবই কম ছিল দাবি করে তিনি বলেন, ‘একেবারেই কম, মানে নগণ্য। এটা কেউ জানতই না এরকম।’
তার দাবি, এবার বড় ধরনের বাদ পড়ার বিষয়টি মূলত এনএসআই ভেরিফিকেশন যুক্ত হওয়ার পর সামনে এসেছে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই প্রতিনিধি বলেন, ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন কোন প্রবলেমই ছিল না, মূল প্রবলেম হচ্ছে এনএসআইটা নিয়ে আসার পরে। এনএসআই আনার পরে এই যে বাদ করার বিষয়টা বেশি হলো, এত পরিমাণ বাদ কখনো যায়নি আগে।’
নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের জন্য মন্ত্রীর বার্তা
এদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের জন্য নতুন বার্তা দিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি জানিয়েছেন, ১ অক্টোবরের মধ্যে কোন উত্তীর্ণ প্রার্থী নিয়োগপত্র না পেলেও যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র দেওয়া হবে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অফিশিয়াল পেজে দেওয়া এক অ্যাডমিন পোস্টে এ কথা জানানো হয়।
পোস্টে বলা হয়, ‘১ অক্টোবর (২০২৬) পর্যন্ত সময়ে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কেউ নিয়োগপত্র না পেলে সেটি পরবর্তীতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র প্রেরণ করা হবে।’
এতে আরও বলা হয়, ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।’
এর আগে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ১ অক্টোবরের মধ্যে সব উত্তীর্ণ প্রার্থী নিয়োগপত্র পাবেন। তবে এখন পর্যন্ত যারা নিয়োগপত্র পাননি, তাদের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তীতে নিয়োগপত্র দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষা এমন একটা জিনিস, যেখানে রাজনীতি করার কিছু নাই। রাজনৈতিক কর্মী নিয়োগ দিতে হলে বহু জায়গা আছে, কিন্তু শিক্ষকতায় না। শিক্ষকের আবার জাত কী, দল কী? শিক্ষক শিক্ষকই, জাস্ট শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, আজকে আমরা শুনি বিভিন্ন অনিয়মের কথা, দুর্নীতির কথা শোনা যায়; এটা খুবই দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। বিশেষ করে ২৪-এর অভ্যুত্থানের পরে এটা মোটেই এক্সপেক্টেড না। এগুলো নিয়ে যদি টানা হেঁচড়া করতে যায় এখন, তবে সরকারি দল বিপদে পড়ে যাবে। আমরা চাই না দীর্ঘদিন পর একটা গণতান্ত্রিক সরকার এসে বিপদে পড়ুক বা হোঁচট খাক। কিন্তু তারা যদি গোঁয়ারতুমি করে, দিনশেষে সেটার কোন বিকল্প থাকবে না।
এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, সরকারকে বোঝা উচিত শুধু শিক্ষকতাই যেকোনো চাকরির ক্ষেত্রেই কোন রকম বৈষম্য বা দলীয়করণ করা যাবে না। বিশেষ করে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি এডুকেশনের ক্ষেত্রে জাতির সেরা, শ্রেষ্ঠ এবং মেধাবীদের শিক্ষকতায় আনতে হবে। তা না করে সুপারিশ বা তদবিরের মাধ্যমে নিয়োগ হলে দেশের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আমাদের শিক্ষার বেস ঠিক নাই; রিডিং-রাইটিং ক্যাপাসিটি বা হায়ার এডুকেশনের মান সন্তোষজনক না। তাই শিক্ষার মূল ভিত্তি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে নজর দিতে হবে।
পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কাউকে যদি বাদ দিতে হয়, তার কোয়ালিফিকেশন না থাকলে সে ভাইভা বা রিটেনে বাদ পড়বে। কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে বাদ দেওয়া অন্য চিন্তার মানুষ, অন্য ভাবনার মানুষ বা অন্য দল করে দেখে কিংবা পরিবার ভিন্ন দলের সাথে যুক্ত বলে নিয়োগ না দেওয়া মহা অন্যায়। এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য না এবং ইনজাস্টিস।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, শিক্ষার দর্শন, নীতি বা কারিকুলাম না থাকা এবং সাত-আট মাস পার হওয়ার পরও শিক্ষার কোন রূপরেখা না আসা খুবই দুঃখজনক। এতদিন পর একটা গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসলে এগুলো ঠিক হবে এমন আশা ছিল, কিন্তু আগের মতোই এক দলের বদলে আরেক দলের ডমিনেশনের কালচার দেখা যাচ্ছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
একই সাথে এনটিআরসিএকে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) আদলে স্বতন্ত্র কমিশনে রূপান্তরের দাবিও জানান এই শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, এনটিআরসিএকে পিএসসির আদলে একটা ‘শিক্ষক নিয়োগ কমিশন’ করা দরকার। এখন যে অতিরিক্ত সচিব চেয়ারম্যান হন তাকে বেশ চাপের মুখে কাজ করতে হয়। এটা না করে পিএসসির আদলে একটা স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী চেয়ারম্যান এবং কয়েকজন মেম্বার দিয়ে নিরপেক্ষ, স্বাধীন কমিশন গঠন করা দরকার, যারা শিক্ষকদের সুপারিশ করবে।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে জিনিসটা মাথায় রাখা দরকার আমরা যাকে বলি আগ্রহ, সাইকোলজিক্যাল রেডিনেস, সাইকোলজিক্যালি সে ফিট কি না, কনটেন্ট নলেজ আছে কি না, প্যাডাগজিক্যাল স্কিল আছে কি না এই সমস্ত জিনিস বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া উচিত। তাই পিএসসির আদলে একটি স্বতন্ত্র কমিশন করে নিরপেক্ষভাবে শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই কমিশনই গবেষণা করবে কেমন মানের ও কতজন শিক্ষক দরকার এবং সাইকোলজিক্যাল অ্যাপটিটিউড ও মোরাল স্ট্যান্ডার্ড টেস্টের মাধ্যমে যোগ্যদের নির্বাচন করবে। সরকার সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে এসব তদন্ত করতে গিয়ে সবকিছু গোলমেলে করে ফেলছে।