একটি কর্মশালায় স্কুলের স্লিপ ফান্ডের টাকা অগ্রিম দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয় © টিডিসি
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (স্লিপ) বাস্তবায়নে রিইম্বার্সমেন্ট বা খরচ করার পর টাকা ফেরত দেওয়ার পদ্ধতি বাদ দিয়ে স্কুলের অ্যাকাউন্টে অগ্রিম অর্থ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ইউনিসেফ। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত একটি ডিসেমিনেশন ওয়ার্কশপে এমন সুপারিশ জানায় সংস্থাটি। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন ইউনিসেফের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ জয় মিলান মালের।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শঙ্কর বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কুলভিত্তিক অনুদানের ক্ষেত্রে অর্থ সরাসরি স্কুলের অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়। সেখানে রিইম্বার্সমেন্টের পরিবর্তে আগেই অর্থ দেওয়া হয় যাতে স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই কত টাকা পাবে তা জানতে পারে এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে পারে।
তিনি বলেন, শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে অনুদানের ফর্মুলা নির্ধারণ করা উচিত নয়। একটি স্কুলের বিশেষ প্রয়োজন, শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্য, ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বাস্তবতাসহ অর্থ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং কোথায় কত টাকা খরচ হয়েছে, তার তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।
স্লিপের বর্তমান রিইম্বার্সমেন্ট পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, একজন প্রধান শিক্ষক মূলত শিক্ষক। তাকে ব্যবসায়ীর মতো নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করে পরে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা হতে পারে না।
গবেষণায় রিইম্বার্সমেন্ট ব্যবস্থাকে স্লিপ বাস্তবায়নের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, নিজের টাকা খরচ করে পরে তা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষকদের চাপ ও মানসিক অস্বস্তি তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ধার করতে হয়, হিসাব সংরক্ষণ ও অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে পড়ে। অর্থ ফেরত পেতে দেরি হলে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কেনা ও শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণের কার্যক্রমও বিলম্বিত হয়।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, স্লিপের মাধ্যমে স্কুল পর্যায়ে অর্থ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যা বিকেন্দ্রীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে অর্থ দেওয়ার পদ্ধতি এমন হওয়া উচিত নয় যাতে সেই ক্ষমতা ব্যবহারের পরিবর্তে প্রধান শিক্ষককে আর্থিক ঝুঁকি নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে অর্থ সরাসরি ও সময়মতো স্কুলে পৌঁছানো জরুরি।
রেইম্বার্সমেন্ট পদ্ধতি নিয়ে সরাসরি আপত্তি জানিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রধান শিক্ষক বা শিক্ষকদের নিজের পকেট থেকে টাকা খরচ করে পরে সেই টাকা ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়। স্কুলের প্রয়োজন মেটাতে আগে অর্থ দিতে হবে এবং সেই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শক্তিশালী জবাবদিহি ও মনিটরিং থাকতে হবে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, শুধু টাকা দিয়ে দিলেই হবে না সেই টাকা কীভাবে খরচ হচ্ছে, তার কার্যকর নজরদারিও থাকতে হবে। তবে জবাবদিহি নিশ্চিত করার নামে এমন ব্যবস্থা করা উচিত নয় যেখানে একজন শিক্ষককে আগে নিজের টাকা খরচ করতে হবে।
স্লিপের অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রেও স্কুলভিত্তিক প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, একটি পুরোনো ও বড় স্কুলের ভবন সংস্কারে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন নতুন ও ছোট একটি স্কুলের ক্ষেত্রে একই পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন নাও হতে পারে। ফলে সব স্কুলকে একই ফর্মুলায় না দেখে প্রয়োজন ও আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দ করা উচিত।
এ নিয়ে ইউনিসেফের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শঙ্কর বলেন, ‘ওয়ান সাইজ ফিটস অল’ বা সবার জন্য একই ব্যবস্থা কার্যকর নয়। প্রতিটি স্কুল, শিশু ও শিক্ষক আলাদা। তাই কর্মসূচিও সেই বাস্তবতা বিবেচনায় তৈরি হওয়া দরকার।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এখন প্রাথমিক শিক্ষার পরবর্তী পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মসূচি পিইডিপি-৫-এর দিকে যাচ্ছে। এ পর্যায়ে স্লিপের অনুদান ও অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন। ইউনিসেফের সহায়তায় পিপিআরসির এই গবেষণার ফলাফল সেই সংস্কারের ক্ষেত্রে কাজে লাগবে।
ইউনিসেফের পক্ষ থেকে তিনি জানান, গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন (জিপিই)-এর সহায়তায় বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় যে সংস্কার কার্যক্রমের কথা ভাবা হচ্ছে তার অন্যতম শর্ত হচ্ছে স্কুল অনুদান বা স্লিপের ফর্মুলা সংশোধন। নতুন ফর্মুলায় শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয়, স্কুলের প্রয়োজন ও বৈচিত্র্য বিবেচনার পাশাপাশি অর্থ কীভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্ব পাবে।
গবেষণা উপস্থাপনের সময় ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, স্লিপ পুরোপুরি ব্যর্থ নয় বরং এর সম্ভাবনার তুলনায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই পিইডিপি-৫ প্রণয়নের আগে স্লিপের অর্থায়ন, বিকেন্দ্রীকরণ ও শেখার ফলাফল এই তিনটি বিষয়কে নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মিরাজুল ইসলাম উকিলসহ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।