ডিসেন্ট ও রিউমার স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক

আ’লীগের প্রোপাগাণ্ডা পেজে আসিফকে নিয়ে এআই দিয়ে লেখা প্রতিবেদন দুদকের তদন্তে

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:১৩ PM , আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৬ PM
আসিফ মাহমুদ

আসিফ মাহমুদ © সংগৃহীত

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের যে অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে, তার সঙ্গে আওয়ামী লীগপন্থী ওয়েবসাইট ‘ডেইলি আজকের কণ্ঠে’ প্রকাশিত একটি পুরোনো প্রতিবেদনের অঙ্ক, দেশ ও অভিযোগের বর্ণনায় উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া গেছে। তবে ওই ওয়েবসাইটের প্রতিবেদনে দাবিগুলোর পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য নথি বা সূত্র উপস্থাপন করা হয়নি। বরং কথিত ‘আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এর নথির বরাত দেওয়া হলেও অনলাইনে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে ফ্যাক্টচেক করেছে দ্য ডিসেন্ট ও রিউমার স্ক্যানার। তাদের যাচাইয়ে আলোচনায় আসা দাবিগুলোর উৎস ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে নিজেদের পুরোনো প্রতিবেদনের সঙ্গে দুদকের অভিযোগের মিলকে নিজেদের অনুসন্ধানের সত্যতা হিসেবে তুলে ধরেছে ‘ডেইলি আজকের কণ্ঠ’।

যে চার দেশে ১১ হাজার কোটি পাচারের দাবি

চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ‘মানিলন্ডারিং’ বোমা ফাটল: ৪ দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন আসিফ মাহমুদ!’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘ডেইলি আজকের কণ্ঠ’।

প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করা গোয়েন্দা সূত্র এবং কথিত ‘আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সের’ নথির বরাতে দাবি করা হয়, আসিফ মাহমুদ দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন। এসব অর্থ দিয়ে বিভিন্ন দেশে সম্পদ কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগেরও দাবি করা হয়।

চার দেশের কথিত অর্থপাচারের অঙ্ক যোগ করলে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা হয়।

কিন্তু প্রতিবেদনে দাবিগুলোর পক্ষে কোনো নথি প্রকাশ করা হয়নি। কোন গোয়েন্দা সংস্থা বা কোন কর্মকর্তার কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে, সেটিও উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি ‘আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ নামে যে প্রতিষ্ঠানের নথির কথা বলা হয়েছে, সেটিরও কোনো যাচাইযোগ্য পরিচয় প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।

সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুরিখভিত্তিক একটি ব্যাংকে ‘শেল কোম্পানির’ নামে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা জমা রাখা হয়েছে। তবে কোন ব্যাংকে অর্থ রাখা হয়েছে, ব্যাংকটির নাম কী, কিংবা এই তথ্যের উৎস কী—সেসব বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

সাত মাস পর একই অঙ্ক, একই দেশ

এর প্রায় সাত মাস পর ১৩ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ দুদকে জমা পড়ার কথা জানানো হয়।

দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচার করে পর্তুগাল, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইস ব্যাংকে সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে। তার বাবা, এপিএস ও পিওর বিরুদ্ধেও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এসেছে।

দুদকের ব্রিফিংয়ের সময় সাংবাদিকদের দেওয়া অভিযোগসংক্রান্ত কাগজে বলা হয়, আসিফ মাহমুদ দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি ও সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করে বিলাসবহুল ভিলা কিনেছেন এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।

অর্থাৎ চার দেশ ও অর্থের পরিমাণের ক্ষেত্রে ‘ডেইলি আজকের কণ্ঠে’ প্রকাশিত ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনের সঙ্গে দুদকের অভিযোগের সরাসরি মিল দেখা যায়।

শুধু অর্থের অঙ্ক নয়, অভিযোগের ভাষাতেও মিল

দুই পক্ষের বক্তব্যের মিল শুধু অর্থের অঙ্ক ও দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। দুদকের অভিযোগসংক্রান্ত কাগজের আরও কিছু বক্তব্যের সঙ্গে ‘ডেইলি আজকের কণ্ঠে’ প্রকাশিত প্রতিবেদনের বক্তব্যের সাদৃশ্য রয়েছে।

দুদকের কাগজে বলা হয়েছে, ‘শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেন।’

অন্যদিকে ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘অভিযোগ আছে, শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর একক কারিগর ছিলেন আসিফ মাহমুদ।’

একইভাবে দুদকের কাগজে আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে।

‘ডেইলি আজকের কণ্ঠের’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন এবং এপিএস মোয়াজ্জেম ছিলেন এই অর্থ সংগ্রহের মাঠপর্যায়ের কারিগর।’

এখানেও অভিযোগের বিষয়বস্তু ও বর্ণনায় স্পষ্ট সাদৃশ্য দেখা যায়।

নিজেদের তথ্যের ভিত্তিতেই দুদকের অভিযোগ—দাবি আজকের কণ্ঠের

১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ‘ডেইলি আজকের কণ্ঠ’ নিজেই দাবি করেছে, তাদের প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে দুদকের অনুসন্ধানের অভিযোগের বড় ধরনের মিল রয়েছে।

ওয়েবসাইটটি লিখেছে, প্রায় এক বছর আগে তারা আসিফ মাহমুদকে ঘিরে ১১ হাজার কোটি টাকা অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছিল। এবার সেই অভিযোগগুলোর বড় একটি অংশ দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বলেও দাবি করেছে তারা।

বিশেষ করে চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের অঙ্ককে নিজেদের প্রতিবেদনের সঙ্গে দুদকের অভিযোগের সবচেয়ে বড় মিল হিসেবে তুলে ধরেছে ওয়েবসাইটটি।

তবে এখানেই প্রশ্ন উঠছে—ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথাকথিত উৎস যদি প্রকাশিত বা যাচাইযোগ্য না হয়, তাহলে একই অঙ্ক ও একই দেশগুলোর তথ্য পরবর্তী সময়ে দুদকের অভিযোগে কীভাবে এল?

দুদক বলছে, দুই অভিযোগ ‘ডিফরেন্ট জিনিস’

বিষয়টি নিয়ে দ্য ডিসেন্টের পক্ষ থেকে দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

‘ডেইলি আজকের কণ্ঠের’ পুরোনো প্রতিবেদনের সঙ্গে দুদকের অভিযোগের অঙ্ক, দেশ ও অভিযোগের বর্ণনার মিল থাকার বিষয়টি তুলে ধরলে তানজির আহমেদ বলেন, ‘দুটো অভিযোগ ডিফরেন্ট জিনিস।’

দুদকের কাছে আসা অভিযোগটি ওই প্রতিবেদনে প্রকাশিত অভিযোগ থেকেই নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগটা রিয়েল। আর এ বিষয়ে তো আমি কমেন্ট করতে পারব না।’

অভিযোগটি কে করেছেন জানতে চাইলে তানজির আহমেদ অপরিচিত গণমাধ্যমকর্মীদের ফোনে তথ্য দেওয়ার বিষয়ে দুদকের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রত্যেকটা মিডিয়া হাউজের তালিকা আছে, এর বাইরে আমরা ফোনে কথা বলতে পারি না।’

পুরোনো প্রতিবেদনের দাবিই কি নতুন অভিযোগের ভিত্তি?

এখানে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, ‘ডেইলি আজকের কণ্ঠের’ প্রতিবেদনে প্রথমবার যে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের দাবি করা হয়েছিল, তার উৎস কী ছিল এবং দুদকের কাছে জমা পড়া অভিযোগে একই অঙ্ক ও একই দেশ কীভাবে এসেছে।

কারণ, ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে দাবিগুলোর পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য নথি প্রকাশ করা হয়নি। নামহীন সূত্রের পাশাপাশি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের নথির কথা বলা হয়েছিল, যার অস্তিত্বও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

অন্যদিকে সেপ্টেম্বরের অভিযোগেও একই চার দেশের জন্য একই অঙ্ক—দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি ও সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা—উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে একটি অযাচাইকৃত প্রতিবেদনের তথ্য পরবর্তীতে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগের অংশ হয়ে থাকলে, সেই তথ্যের মূল উৎস ও যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে দুদকের অনুসন্ধান চলমান থাকায় অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

একই কৌশলে অন্যদের নিয়েও প্রতিবেদন

‘ডেইলি আজকের কণ্ঠে’ এর আগেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অর্থপাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ করা হয়েছে।

আসিফ মাহমুদকে নিয়ে ১১ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনের আগে ও পরে আসিফ নজরুল, রিজওয়ানা হাসান, শফিকুল আলম এবং তাজুল ইসলামকে নিয়েও অর্থপাচার, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগসংবলিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ওয়েবসাইটটি।

এর মধ্যে ১৯ ফেব্রুয়ারি ‘ক্যাশ’ সামলাতেন স্ত্রী শীলা: আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে ১৪ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় ‘যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও আজারবাইজান: সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানার ১২ হাজার কোটি টাকা পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য!’ শিরোনামের প্রতিবেদন।

এসব প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেও অভিযোগের উৎস ও দাবির পক্ষে যাচাইযোগ্য নথির বিষয়টি স্পষ্ট নয়।

ফলে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকে জমা পড়া ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ এখন শুধু অভিযোগটির সত্যতা যাচাইয়ের বিষয় নয়; এর উৎস, তথ্যের ভিত্তি এবং আগের একটি প্রচারিত প্রতিবেদনের সঙ্গে এর অস্বাভাবিক মিলও আলাদা করে যাচাইয়ের দাবি রাখে।

সূত্র: দ্য ডিসেন্ট ও রিউমার স্ক্যানার

এক অ্যাপেই দেখা যাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিলের সব হিসাব
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আ’লীগের প্রোপাগাণ্ডা পেজে আসিফকে নিয়ে এআই দিয়ে লেখা প্রতিবে…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাঘায় গণপিটুনিতে শিমুল হত্যা, মূলহোতা গ্রেপ্তার
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিক্ষক নিয়োগ দেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আবেদন করা যাবে ১২ অ…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইবির ৫ম সমাবর্তন ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডাকসুতে থাকা জিন্নাহর সেই ছবি ছিঁড়ে ফেললেন ছাত্রনেতা তৈয়ব হ…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
4 Regular Pizzas 999 All Inclusive, All Day Everyday
All Day, Everyday
Any 4 Regular Pizzas @ ৳999
Order Now