প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজের পর নতুন ইস্যু ধর্মপ্রতিমন্ত্রী নিয়োগ
বিএনপি ও জমিয়ত © লোগো
রাজপথের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা করে বিএনপি। সরকার গঠনের পর প্রত্যাশিত রাজনৈতিক মূল্যায়নের অপেক্ষায় ছিল এসব জোট শরিকরা। কিন্তু সেই সম্পর্কেই এখন তৈরি হয়েছে অস্বস্তি। ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের দূরত্ব ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে। এর প্রথম নজির, সরকার গঠনের প্রায় পাঁচ মাস পর প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত শরিক ও সমমনা দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় ও নৈশভোজে জমিয়তের মূল ধারার শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি।
ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী শরিক জমিয়তের দূরত্ব ও ক্ষোভের সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ ঘটে সরকারের ছয় মাস পূর্তির পর মন্ত্রিসভার প্রথম রদবদল অনুষ্ঠানের পর। রদবদলের মন্ত্রিসভায় ধর্মপ্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মো. শামীম কায়সার লিংকন। কিন্তু জোট শরিক জমিয়তসহ অন্যান্য ইসলামিক দলগুলো ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর ‘আকিদা’ প্রশ্নে তার নিয়োগে তীব্র বিরোধিতা করেন। দলটির অভিযোগ, সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে আলেমদের অংশীদারত্ব, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কওমি ও আলেম সমাজের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে।
শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের বিরোধিতায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কয়েকজন শীর্ষ নেতা বেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী ও মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীর বক্তব্যে বিষয়টি শুধু নিয়োগের আপত্তি নয়, বরং বিএনপি সরকারের সঙ্গে আলেম-ওলামা ও জোট-রাজনীতির সম্পর্কের প্রশ্ন হিসেবেও উঠে এসেছে।
জমিয়ত শুধু নির্বাচনী মিত্র নয়; ইসলামি রাজনৈতিক পরিসরে বিএনপির জন্যও দলটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। নির্বাচনের আগে জমিয়তের সঙ্গে সমঝোতা বিএনপিকে ইসলামপন্থী ভোটের একটি অংশের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখতে সহায়তা করেছিল।
ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর নিয়োগকে ‘ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত’ দাবি করে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব নিয়োগের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করার শামিল।
মাওলানা হাবিব আরও বলেন, আলেম-ওলামাদের দাবি উপেক্ষা করে এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগে যেভাবে আলেম সমাজ সরকারকে সহযোগিতা করেছে, ভবিষ্যতে সেই সহযোগিতার হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে। এটি এখন পর্যন্ত সরকারের প্রতি সবচেয়ে রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ সতর্কবার্তাগুলোর একটি।
গুরুত্বপূর্ণ হলো, জমিয়তের নেতারা এখনো সরকারবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান ঘোষণা করেননি; বরং তারা সরকারকে চাপ দিয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা বা অন্তত তাদের আপত্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিচ্ছেন। তবে জুনায়েদ আল হাবিবের ‘সহযোগিতার হাত গুটিয়ে নেওয়ার’ সতর্কতা বা হুশিয়ারীতে স্পষ্ট, বিষয়টি দ্রুত সমাধান না হলে তা জোটের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনে রূপ নিতে পারে।
এর আগে, ২০ জুলাইয়ের মিত্রদের সৌজন্যে প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজের ওই আয়োজনে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জমিয়তের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা যাননি। জমিয়তের মহাসচিব জানিয়েছেন, দলীয় ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণেই তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেননি।
গত নির্বাচনে চারটি আসনের একটিতেও দলটির প্রার্থী জয় পাননি। ফলে সংসদে প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারে জমিয়তের অবস্থান হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও মিত্ররা মোট ২১২টি আসন পেলেও জমিয়তের ঘরে কোনো আসন যায়নি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এই অনুপস্থিতিকে নিছক একটি অনুষ্ঠানে না যাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। কারণ, নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে জমিয়তের আসন সমঝোতা নিয়ে প্রকাশ্য টানাপোড়েন ছিল। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে জমিয়তের পক্ষ থেকে অন্তত ১২টি আসনের প্রত্যাশার কথা জানানো হয়েছিল। দলটির সিনিয়র নায়েবে আমির আবদুর রব ইউসুফী তখন বলেছিলেন, কাঙ্ক্ষিত আসনে সমঝোতা না হলে জমিয়ত এককভাবে নির্বাচন করবে। তিনি প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছিলেন, আসন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে ‘কিছুটা টানাপোড়েন’ রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত বিএনপি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে চারটি আসন ছাড়ে। এগুলো হলো—সিলেট-৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, নীলফামারী-১ ও নারায়ণগঞ্জ-৪। ওই চার আসনে বিএনপির কোনো প্রার্থী না থাকার সিদ্ধান্ত হয় এবং জমিয়তের প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক ‘খেজুর গাছ’ নিয়ে নির্বাচন করেন।
তবে নির্বাচনের ফল জমিয়তের প্রত্যাশা পূরণ করেনি। চারটি আসনের একটিতেও দলটির প্রার্থী জয় পাননি। ফলে সংসদে প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারে জমিয়তের অবস্থান হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও মিত্ররা মোট ২১২টি আসন পেলেও জমিয়তের ঘরে কোনো আসন যায়নি।
এখানেই তৈরি হয়েছে বর্তমান অসন্তোষের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। জমিয়তের নেতাদের একাংশের অভিযোগ, নির্বাচনের পর বিএনপির সঙ্গে তাদের আগের মতো রাজনৈতিক যোগাযোগ নেই। সরকার গঠনের পর শরিকদের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ ও মূল্যায়নের যে প্রক্রিয়া প্রত্যাশা করেছিল জমিয়ত, বাস্তবে তা হয়নি—এমন মনোভাব দলটির ভেতরে তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও জোট নেতা তারেক রহমানের দেওয়া নৈশভোজে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারে যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার ক্ষোভ রয়েছে বলেও দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
জমিয়তের সামনে রয়েছে ভিন্ন বাস্তবতা। সংসদে কোনো প্রতিনিধি না থাকায় সরকারে নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব দৃশ্যমান করার সুযোগ সীমিত। ফলে দলটি চাইছে রাজনৈতিক যোগাযোগ, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে।
জমিয়তের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক অবশ্য নৈশভোজে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি। তিনি জানিয়েছেন, আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রকাশ্য বক্তব্যে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো ঘোষণা নেই, কিন্তু একই সঙ্গে অসন্তোষের বিষয়টিও অস্বীকার করা হয়নি।
এই জায়গাতেই বিএনপি-জমিয়ত সম্পর্কের বর্তমান সমীকরণের মূল বৈশিষ্ট্যটি স্পষ্ট হয়—সম্পর্ক পুরোপুরি ভাঙেনি, কিন্তু আগের মতো স্বস্তিদায়কও নেই। জমিয়তের এক শীর্ষ নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, নৈশভোজে না যাওয়ার সঙ্গে জোট ছাড়ার সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে বর্তমান সম্পর্ককে আগের কাঠামোর জোট হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই—এমন ইঙ্গিত রয়েছে।
আরও একটি বিষয় রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জমিয়ত শুধু নির্বাচনী মিত্র নয়; ইসলামি রাজনৈতিক পরিসরে বিএনপির জন্যও দলটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। নির্বাচনের আগে জমিয়তের সঙ্গে সমঝোতা বিএনপিকে ইসলামপন্থী ভোটের একটি অংশের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখতে সহায়তা করেছিল। নির্বাচনের পর সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা বিএনপির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আদর্শিক ধারার শরিকদের সঙ্গে সমন্বয় ধরে রাখা এখন ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, জমিয়তের সামনে রয়েছে ভিন্ন বাস্তবতা। সংসদে কোনো প্রতিনিধি না থাকায় সরকারে নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব দৃশ্যমান করার সুযোগ সীমিত। ফলে দলটি চাইছে রাজনৈতিক যোগাযোগ, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করতে। নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা নিয়ে যে দর-কষাকষি ছিল, নির্বাচনের পর তা রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অংশীদারত্বের প্রশ্নে।
তবে বিএনপির জন্য জমিয়তের সঙ্গে সম্পর্কের এই টানাপোড়েন এখনই বড় কোনো রাজনৈতিক বিচ্ছেদে রূপ নেবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় হয়নি। নৈশভোজ বর্জন মূলত অসন্তোষের একটি দৃশ্যমান বার্তা। সম্পর্ক ছিন্ন করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়। বরং এটি বিএনপির প্রতি জমিয়তের এক ধরনের রাজনৈতিক চাপও হতে পারে—যাতে সরকার পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে শরিকদের গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হচ্ছে—দীর্ঘদিনের আন্দোলনের শরিকদের কীভাবে সরকার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা হবে। যমুনার নৈশভোজে অধিকাংশ শরিকের উপস্থিতির মধ্যেও জমিয়তের অনুপস্থিতি সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে।
আর ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ ইস্যুতে সেই অসন্তোষে নতুন করে উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। জমিয়তের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী সরাসরি লিংকনকে নিয়ে মতাদর্শগত আপত্তি তুলে বলেন, সরকার তাকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা মন্ত্রী করলে আপত্তি নেই; কিন্তু ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তা মেনে নেওয়া হবে না। আমরা সহ্য করব না।
নিয়োগের তীব্র সমালোচনা করে এবং সরকারের সঙ্গে কওমি আলেমদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘দ্বিচারিতা’ ও বিভ্রান্তিকর নীতির অভিযোগ তোলেন জমিয়তের এই সিনিয়র নেতা।
অর্থাৎ, নির্বাচনের আগে যে সম্পর্কের কেন্দ্রে ছিল ‘কয়টি আসন’, নির্বাচনের পর সেই সম্পর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে ‘কতটা মূল্যায়ন’। আর এই দুই প্রশ্নের সমাধান কতটা হয়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে বিএনপি-জমিয়ত রাজনৈতিক সম্পর্ক কোন পথে এগোয়।