এনসিপির জাতীয় কনভেনশনে সমাপনী পর্বে আলোচকবৃন্দ © টিডিসি সম্পাদিত
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার ও গণভোট বিষয়ক জাতীয় কনভেনশন অনষ্ঠিত হয়েছে। কনভেনশনে বক্তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। এছাড়া অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
গতকাল রবিবার (৩ মে) রাজধানীর কাকরাইলে ইন্সটিটিউট অফ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে দিনব্যাপী এই আয়োজনে ৪টি সেশনে আলোচনা করা হয় জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার ও গণভোট নিয়ে। সেশনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছাড়াও স্ব স্ব খাতের বিশেষজ্ঞরা।
আলোচনায় আরও উঠে আসে, নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার টেকসই সংস্কার ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ কারণে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গণভোটসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। এছাড়া ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা।
জাতীয় নারী শক্তির আহ্বায়ক মনিরা শারমিনের পরিচালনায় উদ্বোধনী সেশনে আলোচনায় অংশ নেন এনসিপি নেতা ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী, সমাজবিজ্ঞানী মির্জা হাসান। এছাড়াও স্বাগত বক্তা ছিলেন সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপ-প্রধান সারোয়ার তুষার, সেশন চেয়ার ছিলেন এনসিপির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
বক্তারা মনে করেন, সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করছে এবং জনগণের গণভোটের রায় উপেক্ষা করছে। আখতার হোসেন বলেন, ক্ষমতায় আসার আগে সংস্কারের কথা বলা হলেও এখন সরকার সেই পথ থেকে সরে এসেছে। তারা নিরঙ্কুশভাবে ক্ষমতা ভোগ করতে চায়।
গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে উপেক্ষা করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার পরিচালনা করা হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করেন দিলারা দিলারা চৌধুরী।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতার ভারসাম্য বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ কার্যকর না হওয়াই সংকটের মূল কারণ বলে মনে করেন মির্জা হাসান।
আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সরকার এমন কিছু আইন পাস করেছে, যা ক্ষমতাকে আরও কেন্দ্রীভূত করে, অথচ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বিভিন্ন কমিশন ও সংস্কারমূলক উদ্যোগ বাতিল করা হয়েছে।
প্রথম সেশনের আলোচনার বিষয় ছিলো, ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন: দুদক, এনবিআর, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ও কর্মসংস্থান’। আলোচনায় অংশ নেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম. মাসরুর রিয়াজ, বিডিজবস-এর সিইও ফাহিম মাসরুর, ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ এবং চার্টার্ড ফাইনান্সিয়াল এনালিস্ট আসিফ খান থাকবেন। সেশনটি পরিচালনা করেন এনসিপির যুগ্ম আহবায়ক জাবেদ রাসিন। সেশন চেয়ার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।
দ্বিতীয় সেশনে আলোচনার বিষয় ছিলো, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা: বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যত করণীয়।’ এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ পরিচালনায় আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদক ইসমাইল আলী, ইন্সটিটিউট ফর এনার্জি ইকনমিকস এন্ড ফাইনান্সিয়াল এনালাইসিসের লিড এনার্জি এনালিস্ট শফিকুল আলম, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম, উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। সেশন চেয়ার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু।
জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট কোনো একক সমস্যার কারণে নয় বরং দীর্ঘদিন ধরে ভুল নীতি, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব ও ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে বলে মনে করেন বক্তারা। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই খাতকে স্থিতিশীল করা সম্ভব নয় বলে মতামত জানান তারা।
মানবাধিকার একটি সার্বজনীন বিষয়। যারা ভিন্ন মতাদর্শ লালন করেন, তাদেরও এটি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একইসাথে সরকারের সমালোচনা করার কারণে গ্রেপ্তার করা, জামিন না দিয়ে হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে।
তৃতীয় সেশনে আলোচনার বিষয় ছিলো, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার: বর্তমান ঝুঁকি ও করণীয়’। সেশন চেয়ার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। বক্তব্য রাখেন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী সারা হোসেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার, সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট জায়মা ইসলাম, গুম (প্রতিরোধ) কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস, জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি অ্যাডভোকেট তারিকুল ইসলাম, এবং মানবাধিকার কর্মী মিনহাজ আমান। সেশনটি সঞ্চালনা করেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন।
সেশনটিতে বক্তারা বলেন, মানবাধিকার একটি সার্বজনীন বিষয়। যারা ভিন্ন মতাদর্শ লালন করেন, তাদেরও এটি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একইসাথে সরকারের সমালোচনা করার কারণে গ্রেপ্তার করা, জামিন না দিয়ে হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে বলে অভিমত জানান তারা।
জাতীয় কনভেনশনের সমাপনী সেশনটি পরিচালনা করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, সভাপতিত্ব করেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুস সাকিব আনোয়ার।
সংসদের প্রথম অধিবেশ ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করে নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রথম অধিবেশনে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সরকার তা না করে নিজের মতো সংসদ পরিচালনা করেছে। এভাবে করলে জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলন আমাদের একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়াবে।
বিএনপির উদ্দেশে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আপনারা বলছেন বিরোধী দল জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। কিন্তু বাস্তবে জনগণ বুঝে ফেলেছে—বিভ্রান্তি বিরোধী দলে নয়, সরকারের মধ্যেই আছে। সরকারই জনগণকে কনফিউজ করছে।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জনগণের মূল চাহিদা হলো, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, দলীয়করণমুক্ত, ফ্যাসিবাদমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত একটি রাষ্ট্র গঠন। আপনারা সেই পথে এগিয়ে যান তাহলেই দেশ ও জাতির কল্যাণ হবে। অন্যথায়, পরবর্তী যে বিপ্লব আসবে, তার মাধ্যমে বিএনপি ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।