কক্সবাজারের চারটি আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী লড়াই © সংগৃহীত
দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এমন একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যেটিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ, কৌতূহল ও প্রত্যাশা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটারদের চোখে-মুখে ফিরেছে উৎসবের আমেজ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত কয়েকটি নির্বাচন ছিল একতরফা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন। ক্ষমতা ধরে রাখার ফ্যাসিস্ট মানসিকতার কারণে ভোটের অধিকার কার্যত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সেই বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনকে মানুষ দেখছে পরিবর্তনের সম্ভাবনা হিসেবে।
বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা কক্সবাজারে এবারের নির্বাচন ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত হলেও জাতীয় রাজনীতিতে কক্সবাজার বরাবরই একটি প্রভাবশালী জনপদ। অতীতে এই জেলা থেকেই উঠে এসেছেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, হুইপসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা। তবে ফ্যাসিস্ট আমলে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র ক্ষমতার দাপটে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। সেই সময় যারা রাজনীতিতে টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়েছেন, তারাই এবার নতুন উদ্যমে মাঠে নেমেছেন।
বর্তমানে কক্সবাজার জেলার ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত ৪টি সংসদীয় আসনে চলছে তুমুল নির্বাচনী প্রচারণা। অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের পাশাপাশি নতুন মুখ, ইসলামপন্থী দল ও গণতান্ত্রিক ধারার প্রার্থীদের উপস্থিতিতে প্রতিটি আসনেই গড়ে উঠেছে বহুমুখী প্রতিযোগিতা।
কক্সবাজার জেলায় মোট ৯টি উপজেলা রয়েছে, যা নিয়ে গঠিত ৪টি সংসদীয় আসন। এগুলো হলো কক্সবাজার-১: চকরিয়া ও পেকুয়া; কক্সবাজার-২: মহেশখালী ও কুতুবদিয়া; কক্সবাজার-৩: কক্সবাজার সদর, রামু ও ঈদগাঁও ও কক্সবাজার-৪: উখিয়া ও টেকনাফ।
কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া): হেভিওয়েটদের ত্রিমুখী লড়াই
কক্সবাজার-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৪০ হাজার ৪৯০ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৮ জন এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৯০ হাজার ২৯১ জন। এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনজন প্রার্থী। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার এপিএস হিসেবে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ২০১৫ সালে নিখোঁজের পর দীর্ঘ সময় ভারতে অবস্থান শেষে সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেশে ফিরে সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন তিনি। কক্সবাজারে তার সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তাকে সামনে রেখে ব্যাপক গণসংযোগ চালাচ্ছেন এই বিএনপি নেতা।
সালাহউদ্দিনের বিপরীতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে লড়ছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল ফারুখ। জাতীয় নির্বাচনে নতুন মুখ হলেও জামায়াত রাজনীতিতে তিনি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা। নিয়মিত জনসংযোগ, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং সাংগঠনিক তৎপরতায় তার অবস্থান ক্রমেই শক্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত মো. ছরওয়ার আলম কুতুবী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তার জনসভা ও প্রচারণায়ও উল্লেখযোগ্য জনসমাগম লক্ষ্য করা গেছে। ফলে কক্সবাজার-১ আসনে লড়াই যে বেশ জমজমাট, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কক্সবাজার-২ (মহেশখালী–কুতুবদিয়া): পুরোনো অভিজ্ঞতা বনাম বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব
কক্সবাজার-২ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৮৫১ জন। নারী ভোটার ১ লাখ ৮১ হাজার ৩৯৮ জন, পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬ হাজার ৪৫৩ জন। এই আসনে বিএনপি থেকে প্রার্থী হয়েছেন সাবেক এমপি আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ। রাজনৈতিক মাঠে পুরোনো ও পরিচিত মুখ হিসেবে তার রয়েছে শক্ত অবস্থান।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী এই বুদ্ধিবৃত্তিক নেতা ২০০৮ সালে এ আসন থেকেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রার্থিতা নিয়ে প্রাথমিক জটিলতা কাটিয়ে আপিলের মাধ্যমে মাঠে ফেরেন তিনি। দ্বীপাঞ্চলীয় এলাকায় তার ব্যক্তিগত ও দলীয় জনসমর্থন বেশ দৃশ্যমান।
এ ছাড়া গণঅধিকার পরিষদ থেকে এস এম রোকনুজ্জামান খান, জাতীয় পার্টি থেকে লাঙ্গল প্রতীকে মো. মাহমুদুল করিম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে জিয়াউল হক নির্বাচনী দৌড়ে রয়েছেন।
গণ অধিকার পরিষদ, জাতীয় পার্টি ও ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরাও মাঠে থাকায় এই আসনে ভোটের হিসাব জটিল হয়ে উঠেছে।
কক্সবাজার-৩ (সদর–রামু–ঈদগাঁও): প্রাণকেন্দ্রে ছয় প্রার্থীর লড়াই
কক্সবাজারের কেন্দ্রীয় আসন কক্সবাজার-৩-এ মোট ভোটার ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৯৬২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৫৪ হাজার ৮৬২ জন, পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৯১ হাজার ৯৯ জন এবং একজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
বিএনপি থেকে সাবেক এমপি লুৎফুর রহমান কাজল এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান ও সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে তার রয়েছে শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন সাবেক ছাত্রনেতা ও কক্সবাজার সরকারি কলেজের ভিপি শহীদুল ইসলাম বাহাদুর (ভিপি বাহাদুর)। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় এই নেতার জনসমর্থন চোখে পড়ার মতো।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে আমিরুল ইসলাম, বাংলাদেশ লেবার পার্টি থেকে জগসীশ বড়ুয়া পার্থ, আমজনতার দল থেকে নুরুল আবছার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মো. ইলিয়াস মিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
কক্সবাজার-৪ (উখিয়া–টেকনাফ): উত্তেজনার কেন্দ্রে সীমান্তবর্তী আসন
২৯৭ নম্বর সংসদীয় আসন কক্সবাজার-৪ এ মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬৮৮ জন। নারী ভোটার ১ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৯ জন, পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ৮০৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৬ জন।
বিএনপি থেকে এই আসনে প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরী। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলীয় প্রভাব নিয়ে তিনি এগিয়ে আছেন বলে মনে করছেন অনেকেই।
তার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ নুর আহমদ আনোয়ারী। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতায় তিনি সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে সহজেই সংযোগ স্থাপন করছেন।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে নুরুল হক এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে সাইফুদ্দিন খালেদ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
সবমিলিয়ে কক্সবাজারের চারটি সংসদীয় আসনেই এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উত্তেজনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অভিজ্ঞ রাজনীতিক, নতুন মুখ, ইসলামপন্থী ও গণতান্ত্রিক ধারার প্রার্থীদের অংশগ্রহণে ভোটের মাঠ এখন সরব। শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাবে কক্সবাজারের চার আসনের দায়িত্ব—সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে অপেক্ষা করছে পুরো জেলা।