জামায়াত-এনসিপি © টিডিসি ফটো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ১২ দিন বাকি থাকলেও জট কাটেনি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ জোটের মধ্যে। নির্বাচনে জোটের পক্ষ থেকে ৩০টি আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ছাড়া হলেও এখনও সব আসন বুঝে পায়নি দলটি। নরসিংদী-২ (পলাশ উপজেলা ও সদরের আংশিক) আসন ও চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আংশিক) আসন এনসিপিকে ছাড়া হলেও সেখানে দাঁড়িপাল্লার প্রচারণা চালাচ্ছেন জামায়াত ইসলামের প্রার্থীরা। দুই দলের কেন্দ্র থেকে সমাধানের চেষ্টা থাকলেও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতায় ক্ষোভ কাজ করছে এনসিপির তৃণমূলে।
জানা গেছে, গত ১৫ জানুয়ারি ১১ দলীয় জোটের সংবাদ সম্মেলন থেকে জানানো হয় ৩০ আসনে নির্বাচন করবে এনসিপি। এরপর এনসিপির পক্ষ থেকে ঢাকায় ৬টিসহ ২৭টি আসনে প্রার্থীদের নাম জানানো হয়। পরবর্তীতে বাকি ৩টি আসন চূড়ান্ত করার কথা জানানো হয় দলটির পক্ষ থেকে। এগুলো হলো নরসিংদী-২, চট্টগ্রাম-৮ ও মৌলভীবাজার-৪। এরমধ্যে মৌলভীবাজর-৪ উন্মুক্ত রাখা হয়। আসনটিতে এনসিপি ছাড়াও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী রয়েছে।
তবে ঘটনা বিপরীত দিকে মোড় নেয় নরসিংদী-২ ও চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াত প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায়। জোটের পক্ষ থেকে একক প্রার্থী নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। তবে সময়ের সাথে বাড়ছে জটিলতা। জামায়াত ও এনসিপির কেন্দ্র থেকে বারবার চেষ্টা করা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে কোনো সুরাহা আসেনি। আসন দুটিতে এখনও প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াতের প্রার্থীর সমর্থকরা। ফলে জোটের কাগজে একক প্রার্থী থাকলেও মাঠপর্যায়ে ভিন্ন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে।
নরসিংদী-২ ও চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াত প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় বিপত্তি ঘটেছে। জোটের পক্ষ থেকে একক প্রার্থী নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। জামায়াত ও এনসিপির কেন্দ্র থেকে বারবার চেষ্টা করা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে কোনো সুরাহা আসেনি। আসন দুটিতে এখনও প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াতের প্রার্থীর সমর্থকরা। ফলে জোটের কাগজে একক প্রার্থী থাকলেও মাঠপর্যায়ে ভিন্ন বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে।
এরমধ্যে চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াতে ইসলামি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে সমঝোতার আলোচনা চললেও সমাধান আসেনি। যদিও চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াত নেতা ড. আবু নাছের শুরুতে এনসিপির প্রার্থী জোবায়ের আরিফকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। গত ২১ জানুয়ারি নগর জামায়াত কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ড. আবু নাছেরের নির্বাচনী পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী এমন ঘোষণা দেন। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এবং দক্ষিণ জেলার আমির আনোয়ারুল আলম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এরপরও ডা. আবু নাছেরকে নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীরা নির্বাচন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং প্রকাশ্যেই মাঠে নেমেছেন। যা নিয়ে ক্ষোভ কাজ করছে এনসিপি নেতাকর্মীদের ভিতর।
সম্প্রতি গুঞ্জন ওঠে দুই দলের কেন্দ্রে দফায় দফায় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় এনসিপির প্রার্থী জোবায়ের আরিফ নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়াচ্ছেন। ফেসবুকে একাধিক পোস্টে দাবি করা হয়, চট্টগ্রাম–৮ আসনে ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী জোবাইরুল আরিফ জোটের অন্য প্রার্থী ডা. আবু নাছেরকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন। পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘চট্টগ্রাম–৮ আসনে ঐক্যের বার্তা। জামায়াত প্রার্থী ডাক্তার আবু নাছেরকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন এনসিপির প্রার্থী। চট্টগ্রাম–৮ সংসদীয় আসনে নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মোড় নিয়েছে। ধন্যবাদ এনসিপি বোধোদ্বয় হওয়াতে। ইনশাল্লাহ একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক একটা নির্বাচন হবে।’ তবে এনসিপির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
চট্টগ্রাম বোয়ালখালি উপজেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়কালী কাজী মুহাম্মদ ইয়াছিনুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জোবায়ের আরিফ নির্বাচন করছেন, সড়ে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আবু নাছের সাহেব নির্বাচনী কার্যক্রমগুলো যথারীতি পালন করছেন এবং প্রতিদিনই মিছিল-মিটিং হচ্ছে তার পক্ষে। উনার ব্যানার-ফেস্টুনগুলো সব জায়গায় লাগানো আছে। তার মানে বোঝা যাচ্ছে যে উনি উনার জায়গাতেই আছেন এবং উনার কার্যক্রমগুলো চালাচ্ছেন। গতকালকেও উনি কিন্তু বেশ কয়েকটা মিছিল বোয়ালখালী-চাঁদগাঁও এলাকায় ওনার উপস্থিতিতে। এই ব্যাপারে এনসিপির নেতাকর্মীরা খুবই ক্ষুব্ধ। কারণ ১১ দলীয় জোটের মধ্যে সিংহভাগ সমর্থনতাদের কাছ থেকেই পাওয়ার কথা ছিল যেমনটা অন্যান্য জায়গায় পাচ্ছে। আমাদের প্রার্থী হাসান আরিফ ভাই, নাহিদ ভাইয়ের সাথে বেশ কয়েকবার মিটিং করেছেন। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কি হয়!
এদিকে চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াতের প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে জামায়াতের পক্ষে কাজ না করার ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় এনসিপি নেতারা। গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জুবাইরুল আলম বলেন, চট্টগ্রামে জোটের পক্ষ থেকে মাত্র একটি আসন এনসিপিকে দেওয়া হয়েছে। অথচ সেই চট্টগ্রাম-৮ আসনেই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি। এতে করে আমাদের প্রার্থী জুবাইরুল হাসান আরিফের পক্ষে জামায়াতের নেতাকর্মীরা মাঠে নামেননি। চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াত এনসিপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ শুরু না করা পর্যন্ত আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনে জামায়াতের সঙ্গে আমরা কোনো ধরনের সহযোগিতায় যাবো না। তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে জামায়াত প্রার্থী প্রত্যাহার না করলে আমরাও চট্টগ্রাম-১৩ আসনে জামায়াতের পাশে থাকবো না। এ বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য ঘোষণা প্রত্যাশা করছি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম-৮ ও নরসিংদী-২ আসন দু’টিতে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক না রাখতে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে দেওয়া এক চিঠিতে লেখেন, ‘নরসিংদী ২ আসনটি এনসিপির গোলাম সারোয়ার এবং চট্টগ্রাম ৮ আসনটি একই দলের জোবাইরুল হাসানকে ছেড়েছে ১১ দলীয় ঐক্য। কিন্তু ওই দুই আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী দুজন যথাসময়ে তাঁদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারেননি। তাই এই দুটি আসনের ব্যালট পেপারে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক না রাখার জন্য অনুরোধ করছি। বিষয়টি বিবেচনা করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আপনার সুদৃষ্টি কামনা করছি।’ ওই চিঠির জবাবে ইসি জানিয়েছে, এই মুহূর্র্তে সেই সুযোগ নেই। গত ৩০ জানুয়ারি জামায়াতকে চিঠি দিয়ে তা জানিয়ে দিয়েছে ইসি। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারকে দেওয়া এক চিঠিতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর অনুচ্ছেদ ১৬ (২)-তে উল্লেখ করে বলা হয়, এ অবস্থায় প্রতীক প্রত্যাহারের সুযোগ না থাকার বিষয়টি আপনার অবগতির জন্য জানানো হলো।
ব্যালটে দাঁড়িপাল্লা থাকার কারণে সুযোগটা ওরা কাজে লাগাচ্ছে। প্রকাশ্যে এবং গোপনে বিভিন্ন জায়গায় তারা ভোট চাচ্ছে। আমরা কেন্দ্রে কথা বলছি, উনারা বলছে যে এ ব্যাপারে কথা হচ্ছে। আমরা যেটা বুঝছি, জেলা জামায়াত এখানে বিরোধটা তৈরি করছে। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের আমজাদ ভাই উনি কেন্দ্রের নির্দেশ মানছেন না।-নাঈম খান, এনসিপি নেতা
এদিকে নরসিংদী-২ আসনটি পলাশ উপজেলা এবং নরসিংদী সদর উপজেলার আমদিয়া ইউনিয়ন, পাঁচদোনা ইউনিয়ন ও মেহেড়পাড়া ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। আসনটিতে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির নেতা মো. গোলাম সারোয়ার (সরোয়ার তুষার)। আসনটিতে মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে পারেননি জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আমজাদ হোসাইন। জানা গেছে, দলের কেন্দ্র থেকে তাকে নির্দেশেনা দেওয়া হলেও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তার সমর্থকরা। বিষয়েটি নিয়ে ক্ষোভ কাজ করছে এখানকার এনসিপি নেতাদের মধ্যেও।
নরসিংদী জেলা এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক নাঈম খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ব্যালটে দাঁড়িপাল্লা থাকার কারণে সুযোগটা ওরা কাজে লাগাচ্ছে। প্রকাশ্যে এবং গোপনে বিভিন্ন জায়গায় তারা ভোট চাচ্ছে। আমরা কেন্দ্রে কথা বলছি, উনারা বলছে যে এ ব্যাপারে কথা হচ্ছে। তারা আশাবাদী যে আমাদেরকে সহযোগিতা করবে। আমরা যেটা বুঝছি জেলা জামায়াত এখানে বিরোধটা তৈরি করছে। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের আমজাদ ভাই উনি কেন্দ্রের নির্দেশ মানছেন না, কেন্দ্রের নির্দেশ নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছাচ্ছেন না, উনি এটা ভায়োলেট করছে। কিন্তু ওনার দলের থেকে ওনাকে বহিষ্কার বা কোন শাস্তি দেওয়া হয় নাই।
নরসিংদী জেলা এনসিপির সদস্য সচিব আওলাদ হোসেন জনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জামাতের প্রার্থী আমাদের কোন প্রচারণা চালাচ্ছে না। আমরা যে তথ্যগুলো পাচ্ছি তারা হ্যাঁ ভোটের প্রচারণার পাশাপাশি দাঁড়িপাল্লার ভোট চাচ্ছে। শাপলা কলির পক্ষে তাদের অবস্থান নাই। এনসিপির যারা তারা অনেক হতাশ ও ক্ষুব্ধ। যেহেতু আমরা আমাদের জায়গা থেকে যেরকম শিবপুরে আমরা জামায়াতকে সহযোগিতা করছি, সদরের জামায়াতকে আমরা সহযোগিতা করছি। আমরা সব জায়গা থেকে সবরকমভাবে জামায়াতকে সহযোগিতা করছি কিন্তু নরসংদী-২ আমাদেরকে জোটের থেকে তুষার ভাইকে দেওয়া সত্ত্বেও জামায়াত থেকে আমরা কোন সহযোগিতা পাচ্ছিনা।
আমাদের পলিটিক্যাল লিয়াজু যে কমিটি আছে, অলরেডি এটা নিয়ে দলগুলোর সাথে কথা বলে সমস্যাগুলো সমাধান করবার চেষ্টা করছে।-মনিরা শারমিন, এনসিপি
তবে মৌলভীবাজারে ৪ আসনটি উন্মুক্ত থাকলেও এনসিপি প্রার্থী প্রিতম দাসের পক্ষে স্থানীয় জামায়াত ইসলামের নেতাকর্মীরা কাজ করছেন বলে জানা গেছে। মৌলভীবাজার জেলা এনসিপির আহ্বায়ক খালেদ হাসান দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ১১ দল আসরটা আমাদের দিয়েছে। কিন্তু খেলাফত বাংলাদেশকেও দেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের সাথে জামাত কাজ করছে এখানে। আমরা জয়ের বিষয়ে পূর্ণ আশাবাদী।
প্রার্থীতা প্রত্যাহারের বিষয়ে জোটের দলগুলোর সঙ্গে আলাপ চলছে জানিয়ে এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের পলিটিক্যাল লিয়াজু যে কমিটি আছে, অলরেডি এটা নিয়ে দলগুলোর সাথে কথা বলে সমস্যাগুলো সমাধান করবার চেষ্টা করছে।