দলীয় কর্মীদের পেট ভরার জন্য নয়, মানুষের মুক্তির জন্য রাজনীতি করি: জামায়াত আমির © সংগৃহীত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা সমস্ত মানুষের মুক্তির জন্য চিন্তা করি। আমরা খাবারের জন্য চিন্তা করি না এবং দলীয় কর্মীদের পেট ভরার জন্য রাজনীতি করি না। বরং এ দেশের অভাব, দুঃখী মানুষের মুখে একটু খাবার তুলে দিতে পারি এবং গায়ে একটু কাপড় দিতে পারি। আমাদের ভিশন এই মজলুম জাতিকে একটুখানি মুক্তির স্বাদ দেওয়া। এটাই হবে আমাদের সংগ্রাম, ইনশাআল্লাহ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আজ সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিুর রহমান বলেন, আমাদের ভাই-বোনদেরকে স্বস্তিতে এক জায়গায় স্থির থাকতে দেওয়া হয়নি। আমরা দল হিসেবে কতটা মজলুম ছিলাম। এই অঞ্চলে আমাদের বোনদেরকে দফায় দফায় গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে অপমান করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আজকে মায়েরা ন্যায়ের পক্ষে, সত্যের পক্ষে, মানবতার পক্ষে আল্লাহর দীনের আওয়াজ তুলতে ঘরে ঘরে যান। কিছু লোক এটা সহ্য করতে পারে না। তাদের বিরক্ত করে, অপমানজনক আচরণ করে, কষ্ট দেয়— এমনকি দিশেহারা হয়ে দুয়েক জায়গায় তাদের গায়েও হাত দিয়েছে। আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে কোনো কিছুর বিনিময় আমরা মায়েদের সম্মান রক্ষা করব, হুঁশিয়ারি দেন ডা. শফিকুর রহমান।
আমিরে জামায়াত বলেন, খনন না করায় পদ্মা-গড়াই নদী নয়, যেন এক মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। নদী খননের জন্য প্রতি বছর বাজেট থাকে। সমস্ত টাকা পেটে চলে যায়। নদী আর খনন করা হয় না। উন্নয়নের নামে ৫৪ বছর কমবেশি যারাই ক্ষমতায় গিয়েছে এই একই কাজ তারা করেছে। এ দেশ সবার এবং সবাই মিলে রক্ষা করতে হবে।
চব্বিশের ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, আমরা প্রতিশোধ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলাম, আমরা কারো ওপর কোন প্রতিশোধ নেইনি। আমরা বলেছিলাম অন্যায়ভাবে কাউকে মামলার আসামি করা হবে না। আমরা অন্যায়ভাবে কাউকে একটা মামলারও আসামি করিনি। বাংলাদেশে হাজার হাজার মামলা আমরা দায়ের করি নাই।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের পরে মামলা বাণিজ্য শুরু হয়ে গেল। জাগায় জাগায় দখলদারি, অনেক ভাইয়েরা নেমে পড়লেন চাঁদাবাজি করতে। আমরা বলতে চাই, আপনাদের সংসারে অভাব-অনটনের কারণে যদি করে থাকেন— তাহলে আপনারা এখান থেকে সরে আসুন। আল্লাহ আমাদের যে রিজিক দিয়েছেন ওটাই আমরা ভাগাভাগি করে খেতে রাজি আছি। তবুও চাঁদাবাজি করবেন না।
মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, এই বাংলাদেশে প্রত্যেকটি পুরুষ এবং নারীদেরকে মর্যাদার কাজ তুলে দিব, বিশেষ করে যুবক-যুবতীদের হাতে। তাদের এই যৌবনের শক্তি দিয়ে তারা যেন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
দেশের সংকট দূর করতে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, আমরা তিনটা জায়গায় কাজ করব— যোগাযোগ উন্নত করা, দ্বিতীয় সিন্ডিকেট ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়া আর চাঁদাবাজিতে যারা লিপ্ত- তাদের ভাল কাজ দিয়ে বুকে টেনে নেওয়া। এই তিনটি কাজ যদি আমরা সফলভাবে আল্লাহ তায়ালার সাহায্যে করতে পারি, তাহলে আমরা বিশ্বাস করি এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন দেখবে।
কুষ্টিয়া অঞ্চলের সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, কুষ্টিয়া চিনিকল ছিল, এখন বন্ধ হয়ে আছে। ইন্ডাস্ট্রির বিস্তার ঘটছে আর একটা একটা করে তালা ঝুলানো হচ্ছে। জামায়াতের সাবেক আমির শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী যখন শিল্প মন্ত্রী ছিলেন তখন তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন আজ থেকে কোনো সরকারি কল-কারখানায় তালা ঝুলবে না। বরং ঝুলন্ত তালা যেখানে আছে সেগুলো খুলে দিব আমি এবং তিনি তাই করেছিলেন। বন্ধ কল-কারখানাগুলো খুলে দিয়ে মাত্র আড়াই বছরে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।
ডা. শফিকুর রহমান দৃঢ়তার সাথে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশের জনগণ যদি আমাদেরকে সুযোগ দেয়, তাহলে সকল সেক্টরে বিপ্লব ঘটবে। শহীদ আবরার ফাহাদকে স্মরণ করে জামায়াত আমির বলেন, শহীদ আবরার ফাহাদ আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক। সে নিজেই একটা বিদ্রোহী, একটা বিপ্লবের নাম। সে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিল। এটাই তার অপরাধ। এজন্য তাকে দুনিয়া থেকে অত্যন্ত নির্মমভাবে বিদায় করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আধিপত্যবাদীরা তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কেউ আওয়াজ তুলুক এটা পছন্দ করে না। তবে চব্বিশের দ্রোহ এটা প্রমাণ করে দিয়েছে বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে পরোয়া করে না। যাদের নেতৃত্বে এই জাতি চব্বিশের লড়াই করে মুক্তি পেয়েছে। চব্বিশের সকল যোদ্ধাদেরকে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন আমিরে জামায়াত।
তিনি আরও বলেন, এখানে দাঁড়িপাল্লা হচ্ছে ১১ দলের প্রতীক। দাঁড়িপাল্লা হচ্ছে ইনসাফের প্রতীক। অতীতের সরকারগুলো পাল্লা সহ্য করতে পারেনি। এজন্য পাল্লাকে তারা গুম করে ফেলেছিল। পাল্লা আয়নাঘরে থেকে মুক্তি পেয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। পাল্লার বিজয় হলে সমাজে ন্যায়বিচার কায়েম হবে।
আমিরে জামায়াত বলেন, বিভিন্ন নারীদের উসকানি দেওয়া হয়, পাল্লার বিজয় হলে আপনাদের কেমন লাগবে, এখন মায়েরা বলছে ভাল হবে। যুবসমাজ এবং মায়েরা বিশেষ করে বস্তাপঁচা রাজনীতি আর দেখতে চায় না। মায়েরা যেভাবে পাল্লা বিজয় করতে চায়, সেভাবে মায়েদের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হবে।
বক্তব্যের শুরুতে সদ্য ইন্তেকাল করা কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আবুল হাশেমকে স্মরণ করে তার অবদানকে কবুল করে মাগফিরত কামনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি বিশিষ্ট আলেমে দীন ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরকেও স্মরণ করে তার মাগফিরাত কামনা করেন।