ভাষানটেকে জনসভায় ভ্যানচালক জুয়েলকে মঞ্চে ডেকে স্থানীয় সমস্যা শোনেন তারেক রহমান © সংগৃহীত
ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের সাজানো এলাকার পাশের এলাকা হলেও রাজধানীর বস্তি এলাকা হিসেবে পরিচিত ভাষানটেক সমস্যার যেন ভাগার। মাদক, সন্ত্রাস, পূণর্বাসন ও কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে ভাষানটেকে নাম প্রায় গণমাধ্যমে উচ্চরিত হয়। সেই অবহেলিত ভাষানটেকে নির্বাচনী জনসভা করলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর জনসভা মঞ্চে ভাষানটেক বস্তিবাসীদের ডেকে সরাসরি তাদের সমস্যার কথা শুনলেন তারেক। পাশাপাশি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে এবং বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে তাদের মুখে শোনা এসব সমস্যা সমাধাণের প্রতিশ্রুতিও দিলেন তিনি।
আজ শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৬টায় ভাষানটেকের বিআরবি মাঠে এই জনসভা শুরু হয়ে শেষ হয় ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে।
তারেক রহমান গতানুতিক নির্বাচনী ও রাজনৈতিক বক্তব্য না দিয়ে উপস্থিত হাজার হাজার জনতার মধ্য থেকে যে কাউকে মঞ্চে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই এলাকার মূল সমস্যা কি, সেটা জানতে চাই। আপনারা আসুন।
প্রচলিত নিয়মে বক্তব্য না দিয়ে প্রথমেই তারেক রহমান ডাকেন মা-বোনদের মধ্যথেকে খেঁটে খাওয়া শ্রমিক বিশেষ করে কোনো গার্মেন্টস কর্মীকে। তার ডাকে সাড়া দিয়ে একে একে কয়েক মহিলা আসলেও তিনি তাদের চিনে ফেলে বলেন, আপনি তো আমাদের দল করেন। আপনাকে দিয়ে হবে না। আমি চাই যারা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, এমন কাউকে। আমি চাই নিরপেক্ষ মানুষ।
গৃহিনী নাসিমা আক্তার নামে একজন নারী মঞ্চে আসেন। তার কাছে তারেক জানতে চান তিনি ভোটার কিনা? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মিথ্যা কথা বলব না, আমি শুধু আপনাকে এক নজর দেখতে এসেছি। আমার মনের আশা পূরণ হয়েছে।’ এরপর তারেক রহমান তাকে বলেন, ‘বোন এই এলাকার ভোটার চাচ্ছি।’ নাসিমা বলেন, তাহলে আমি কি চলে যাব? তারেক রহমান তাকে বলেন, জি, আপনি যেতে পারেন অথবা বসতে পারেন। নাসিমা পরে মঞ্চেই চেয়ারে বসে পড়েন।
এরপর বিএনপি চেয়ারম্যানের ডাকে সাড়া দিয়ে লুঙ্গি পরিহিত মো. জুয়েল নামে একজন সাধারণ মানুষ মঞ্চে আসেন। তিনি ভ্যান চালক। ভাষানটেকে বেনারশি মাঠে বসবাস করেন। তিনি ঢাকা-১৭ আসনের ভোটার। তাকে চেয়ারে বসতে দেন তারেক। তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করে তার কাছে জানতে চান, এই এলাকার কি কি উন্নয়ন করতে হবে। বস্তিবাসীর মূল চাহিদা বা চাওয়াটা কি? জবাবে মো. জুয়েল বলেন, আমি ত্রিশবছর যাবত ভাষানটেকে থাকি। আমাদের মূল সমস্যা পূণর্বাসন।
তারেক আরও সমস্যার কথা জানতে চান। জবাবে জুয়েল একটু খেই হারিয়ে ফেললে বিএনপি চেয়ারম্যান তাকে আশ্বাস দেন, আপনি ভয় পাবেন না। ঘাবড়িয়ে যাবেন না। আপনাকে কেউ কিছু বলবে না। সাহস নিয়ে কথা বলুন। অভয় পেয়ে জুয়েল বস্তির ভেতরের ভাঙাচুড়া রাস্তা ও আরও কয়েকটি সমস্যার কথা জানান।
বারবার তারেক রহমান ওই এলাকার ভোটার মধ্য বয়সি কোনো নারী বা পুরুষদের মঞ্চে আসার আহ্বান জানাতে থাকেন। এরপর হেনা আক্তার মিম নামের একজন ছাত্রী মঞ্চে আসেন। তার কাছে তারেক রহমান জানতে চান, ওই এলাকার সমস্যার কথা। জবাবে মিম বলেন, আমি পুরান কচুক্ষেতের বাসিন্দা। ক্যান্টনমেন্টের বাইরের এলাকা। ক্যান্টনমেন্ট যেমন সাজানো-গোছানো, সুন্দর পরিবেশ কিন্তু তার পাশের জায়গা হলেও ভাষানটেক, কচুক্ষেত এলাকা অগোছালো, অসুন্দর, বস্তি এলাকা। ঢাকা-১৭ আসনের এই এলাকাও যেন ক্যান্টনমেন্টের মতো সুন্দর এলাকা হয়, সেই প্রত্যাশার কথা হেনা তারেক রহমানের কাছে তুলে ধরেন।
এরপর আরও কয়েকজন নারী-পুরুষ মঞ্চে আসলেও বিএনপি চেয়ারম্যান শুধু ভাষানটেক বস্তিতে বসবাস করেন এবং ওখানকার ভোটার, এমন কাউকে আসার অনুরোধ করতে থাকেন।
এ সময় লিলি নামের প্রবীণ সাধারণ এক মহিলা মঞ্চে আসেন। তারেক রহমান তাকে ‘মা’ সম্বোধন করে বলেন, ঠিক আছে মা আপনি বলুন, এই এলাকার কি সমস্যা।
লিলি বলেন, পুণর্বাসনের সমস্যা মূল সমস্যা। এরপর আমাদের বস্তিতে অনেক শিক্ষিত সন্তান আছে, যাদের কোনো কর্মসংস্থান নেই। চাকরি-বাকরি নেই। এছাড়া লিলি তারেক রহমানের কাছে ফ্যামিলি কার্ড চান। জবাবে তারেক বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে দেশের চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে। আর বস্তির শিক্ষিত ছাত্র-ছাত্রীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।
লিলির পর শান্তা নামের একজন গৃহিনী মঞ্চে আসেন। তিনি তারেক রহমানের কাছে ফ্যামিলি কার্ড চান। শান্তা আদমজি ক্যান্টনমেন্ট কলেজে লেখাপড়া করেছেন বলে জানান বিএনপি চেয়ারম্যানকে।
শান্তা বলেন, ভাষানটেক বস্তিতে মহিলাদের কোনো কর্মসংস্থান নেই, কোনো ইনকাম নেই। বিএনপি সরকার গঠন করলে মহিলাদের যেন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। ফ্যামিলি কার্ড পেলে মাসের খরচার চাল ও অন্য পণ্য ক্রয়ে পরিবারের অনেক সাশ্রয় হবে। তারেক রহমান তার কথা শুনে নিজে নির্বাচিত হলে ও বিএনপি সরকার গঠন করলে এসব সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন।
এরপর সামনের হাজার হাজার জনতার মধ্য থেকে একজন মহিলাকে চিহ্নিত করে তারেক রহমান বলেন, ওই যে মধ্য বয়স্ক বোন অনেকক্ষণ ধরে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন, তাকে আসতে দাও। তিনি মঞ্চে থাকা তার সহকারীদের নির্দেশ দেন, সেই নারীকে মঞ্চে নিয়ে আসতে। বিএনপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে সেই নারীকে মঞ্চে আনার সময় নিরাপত্তাকর্মীরা চেক করতে চাইলে তারেক রহমান তাদের ধমক দিয়ে বলেন, আরে কিসের চেক! সেতো জানতোই না তাকে ডাকা হবে। তাকে কেন চেক করতে হবে। তাকে আসতে দাও।
এরপর সেই মহিলা মঞ্চে আসেন এবং বিগত পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে শুধু বিএনপি করার অপরাধে তাদের পরিবারের উপর নির্যাতনের কিছু বর্ণনা দেন। ওই এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা সাচ্চুর নামে অভিযোগ করে তিনি বলেন, শুধু বিএনপি করার অপরাধে আমার ছোটভাই পারভেজকে জেলে নিয়েছে। আমাদের বাসার তিন কাঠা জায়গা দখল করে নিয়েছে। আমাদের নানাভাবে নির্যাতন করেছে। তিনি তারেক রহমানকে জানান, ছোটবেলায় আপনাদের বাসার পেয়ারা গাছ থেকে অনেক পেয়ারা চুরি করে খেয়েছি। সেজন্য তিনি ক্ষমা চান।
জবাবে তারেক রহমান বলেন, আপনার বাসায় খালি জায়গায় পেয়ারা গাছ লাগাবেন এবং সেই পেয়ারা গাছে পেয়ারা ধরলে আমাকে দুটো পেয়ারা দিয়ে আসবেন।
তারেক রহমান শেষে সারাদেশে ধানের শীষের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান। নিজে নির্বাচিত হলে ও বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে ভাষানটেকসহ সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বেকারত্ব দূর, চারকোটি পরিবারের মা এবং কর্মহীন গৃহিনীদের মধ্যে ফ্যামেলি কার্ড, কৃষকদের কৃষিকার্ড দেয়ার কথা জানান।
সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, আমরা অতীতে দেখেছি এই জনগণের পাশে কারা এসে দাঁড়িয়েছে। কাজেই আমরা যদি অতীতের সবগুলো কাজ বিবেচনা করি, আমরা দেখব, একমাত্র ধানের শীষকে যতবার নির্বাচিত করেছে এই দেশের মানুষ, ততবারই এই দেশের উন্নয়ন হয়েছে। দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে, ভালো পরিবর্তন হয়েছে। কাজেই আমি ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে আপনাদের কাছে ভোট চেয়ে যাচ্ছি।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন ভাষানটেক ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. কাদির মাহমুদ। সমাবেশে তারেক রহমানের সহধর্মীনি ডা. জোবায়দা রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এবং ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমানের নির্বাচন সমন্বয়কারী আব্দুস সালাম, নাজিমুদ্দিন আলম, মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক ও ক্যান্টনমেন্ট থানা এবং স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।