শহীদ ড. শামসুজ্জোহা

ছাত্রকে বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন যিনি

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৪২ AM

সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা। একজন শিক্ষাবিদ, একজন অধ্যাপক। যিনি ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আজকের এই দিনে শহীদ হন। তিনিই প্রথম বাঙালী শহীদ বুদ্ধিজীবী। বলা হয়ে থাকে, ড. জোহার আত্মদান সামরিক শাসক আইয়ুব শাহীর পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল। আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুবার্ষিকী। মূলত দিনটিকে ঘিরেই দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের অনুসন্ধান। লিখেছেন- ফরহাদ কাদের

 

‘আজ আমি ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত। এরপর কোন গুলি হলে তা ছাত্রকে না লেগে যেন আমার গায়ে লাগে’। শহীদ ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহার এ উক্তি আজও অমর, চিরভাস্বর। গল্পটা ১৯৬৯ সালের। গণঅভ্যুত্থানের সময়কার। এ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানের মত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলন গড়ে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণায় পাক-বাহিনী পূর্ব-পাকিস্তানে ১৪৪ ধারা জারি করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে শিক্ষার্থীরা এ ধারা উপেক্ষা করে প্রধান ফটকের সামনের মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সংবাদে প্রক্টর ড. জোহা প্রধান ফটকে ছুটে যান।

প্রক্টর হিসেবে তিনি ছাত্রদের শান্ত করার ও ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। ছাত্ররা পিছু হঠতে না চাইলে পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন হাদী ছাত্রদের গুলি করার নির্দেশ দেয়। তখন জোহা পাক বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, ‘কোন ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে আমার গায়ে যেন গুলি লাগে’। ড. জোহা ডন্ট ফায়ার! ডন্ট ফায়ার! বলে চিৎকার করতে থাকেন। তিনি ছাত্রদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দেন। কিন্তু প্রক্টরের আশ্বাসে কর্ণপাত না করে বেলা ১১টার দিকে ক্যাপ্টেন হাদী তার পিস্তল বের করে ড. জোহাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। হাসপাতালে নেয়ার পথে ড. জোহা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু লিখেছেন, শামসুজ্জোহার শাহাদতবরণের ঘটনার মধ্য দিয়ে ছাত্রপ্রীতি ও কর্তব্যপরায়ণতার যে মহান দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় স্থাপিত হয়েছে, তা এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় না। ড. শামসুজ্জোহা ইচ্ছে করলে সেদিন মোটামুটি নিরাপদ দূরত্বে থেকে পারতেন নিজের জীবন বাঁচাতে। কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ তার কাছে নিজের জীবনের চেয়ে তার ছাত্রছাত্রীদের জীবন বড় ছিল।

ড. জোহার স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেটে ড. জোহার গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থানটিতে নির্মাণ করা হয়েছে জোহা স্মৃতি ফলক এবং মেইন গেইট দিয়ে প্রবেশ করলে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থিত শহীদ জোহার মাজার। শহীদ শামসুজ্জোহা হলের সামনে নির্মিত হয়েছে শহীদ শামসুজ্জোহা স্মৃতি ভাস্কর্য ‘স্ফুলিঙ্গ’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনকারী যে কোন দর্শনার্থী এসব স্মৃতি চিহ্ন দেখে শহীদ জোহার আত্মত্যাগের স্মৃতিকে স্মরণ করলে তাদের দু’চোখ সজল হয়ে উঠে।

ড. জোহার স্মৃতিফলকে লেখা

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, জোহার মৃত্যু তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছিলো এবং প্রভাব ছিলো সূদূরপ্রসারী; যা দেশকে স্বাধীন করতে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিলো। দেশ স্বাধীনের পর তার অবদানের কৃতজ্ঞতাস্বরুপ তাকে শহীদ বুদ্ধিজীবির সম্মানে ভূষিত করা হয়। নাটোরে তার নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়াও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ প্রতিবছর জোহা সিম্পজিয়াম পালন করা হয়ে থাকে। সম্প্রতি দেশের শিক্ষকসমাজ জোহার মৃত্যুদিবসকে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালনের দাবি জানিয়ে আসছে।

কুদরাত-ই-খুদার প্রশ্ন- ড. জোহার এ মহান অবদানের কতটুকু স্বীকৃতি দিয়েছি আমরা? প্রতি বছর এ দিনটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালন করা হলেও এখন পর্যন্ত দিবসটিকে সরকারিভাবে পালন করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের কিছু করার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করি আমরা। ড. জোহাকে বাঙালি জাতির মণিকোঠায় ঠাঁই দিতে পারলে লাভ হবে আমাদের জাতিরই। কারণ এতে অনুপ্রেরণা পাবেন বুদ্ধিজীবী সমাজসহ দেশের জনগণ।

অফিসার থেকে লেকচারার, সবশেষ অধ্যাপক: সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহার জন্ম মে ১, ১৯৩৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায়। পিতা মুহম্মদ আব্দুর রশীদ ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের নিম্নবেতনভোগী চাকরিজীবি। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শামসুজ্জোহার প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয় পশ্চিমবঙ্গে। বাঁকুড়া জিলা স্কুলে তিনি ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহণ করে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম শ্রেনীতে উত্তীর্ন হন এবং বাঁকুড়া ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে ১৯৫০ সালে প্রথম শ্রেণীতে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন।

যতদূর জানা যায়, ১৯৫৫ সালের শেষের দিকে শামসুজ্জোহা পাকিস্তান অর্ডন্যান্স কারখানায় সহযোগী কারখানা পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হন। একই বছর ১৪ ডিসেম্বর তিনি যুক্তরাজ্যের সাউথ ওয়েলসে রয়্যাল অর্ডিনেন্স কারখানায় বিষ্ফোরক দ্রব্যের উপর প্রশিক্ষন লাভের জন্য যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে ওয়াহ ক্যান্টনমেন্টে সহকারি পরিচালক পদে যোগদান করেন। ১৯৬১ সালে রয়্যাল অর্ডিনেন্স থেকে ইস্তফা নিয়ে জোহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং একই বছর উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের লেকচারার পদে যোগদান করেন। সেখানে অধ্যাপনাকালে তিনি বৃত্তি নিয়ে পুনরায় লন্ডন ইম্পেরিয়াল কলেজে চলে যান।

zohar1e64a30cec-5a02b8de9d0e8

পরিবারের সঙ্গে সাহসী এ শিক্ষক

পিএইচডি ও ডিআইসি ডিগ্রি লাভ করে তিনি ১৯৬৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে পুনরায় অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে তাকে রিডার পদে উন্নীত করা হয়। পরবর্তীবছর ১৯৬৫ সালে তিনি শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষক এবং ১৯৬৬ সালে প্রাধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হন। লন্ডনে গবেষণাকালে তিনি কিছুকাল বেরেট স্ট্রিট ওয়েস্ট লন্ডন কমার্স কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৮ সালে নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক বছর মেয়াদী বৃত্তি পেলেও বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ছাড়েনি অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাবে।

কর্মসূচি: দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনে এবারও নানা কর্মসূচী রেখেছে রাবি প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠন। রাবির জনসংযোগ দফতর প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দিবসটি উপলক্ষে সোমবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে কালো পতাকা উত্তোলন, সকাল ৭টায় ড. জোহার মাজার ও জোহা স্মৃতিফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ কর্মসূচি রয়েছে । সকাল সোয়া ৭টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, আবাসিক হল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সমিতি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ। দিবসটি উপলক্ষে এদিন সকাল সাড়ে ৮টায় রাবি অফিসার সমিতি কার্যালয়ে আলোচনা সভা আয়োজন করছে।

এছাড়াও সকাল ১০টায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ সিনেট ভবনে জোহা স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হবে। এতে বক্তব্য রাখবেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক শ্যামল চক্রবর্তী। এরপর বাদ জোহর রাবি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে কোরানখানি ও বিশেষ মোনাজাত এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে দোয়া মাহফিল ও প্রদীপ প্রজ্বালন করা হবে।

ঢাকা-১৮ আসনে চাঁদাবাজি রুখে দিতে ব্যবসায়ীদের পাশে থাকার ঘোষ…
  • ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
তাদের নির্বাচিত করুন, যারা বিদেশে বন্ধু তৈরি করবে প্রভু খুঁ…
  • ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
নির্বাচনের আগেই প্রাথমিকের ১৪৩৮৫ সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়া…
  • ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
রাবির ‘এ’ ইউনিটের ফল প্রকাশের সময় জানা গেলে
  • ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
পূজার অর্জিত বিদ্যা কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উজ্জ্বল…
  • ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
এক বছরে দুইবার রমজান, আরেক বছরে মিলবে তিন ঈদ—কোন কোন বছর ঘট…
  • ২৩ জানুয়ারি ২০২৬