অনলাইন ভর্তি পরীক্ষায় যেসব চ্যালেঞ্জ সামনে আসতে পারে

লেখক
লেখক অতীশ কুমার দীপংকর

চলমান করোনা মহামারীর জন্য প্রায় সবকিছুর জন্য আমাদের বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে হচ্ছে। আপাত দৃষ্টিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে সংকটে আছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। কিছুদিন আগে এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করে ফলাফল মূল্যায়ন করার একটি বিকল্প উপায় সরকার ঘোষণা করেছে। তাই বর্তমান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে স্বায়ত্তশাসিত ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া।

ইতোমধ্যে স্বায়ত্তশাসিত ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য মহোদয়গণ এই বিষয়ে দুইটি মিটিং সম্পন্ন করেছেন। সর্বশেষ মিটিং এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটির (বিডিইউ) তৈরি করা একটি মোবাইল বেসড সফটওয়্যারের মাধ্যমে অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন করার নীতিগত সিদ্ধান্তে উপনীত হন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয়গণ।

ভর্তি পরীক্ষায় প্রচুর জনসমাগম হয় এবং শীতকাল চলে আসায় অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু যে সফটওয়্যারটি ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে সেটি ব্যবহারে বিডিইউ ব্যতীত অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অভস্ত নয়।

তাই বিডিইউ ব্যতীত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রথমে নতুন সফটওয়্যারটি ব্যবহারে অভস্ত হতে হবে যেমন গত সেমিস্টারের পরীক্ষাগুলি এই সফটওয়্যারটির মাধ্যমে নেওয়া যেতে পারে। সামনে পূজা ও বিভিন্ন ছুটি বাদ দিলে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমাদের হাতে সময় থাকে দুই মাস। এই সময়টি কি নতুন সফটওয়্যারটিতে অভস্ত হওয়া এবং অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করার জন্য পর্যাপ্ত কিনা সেটা ভেবে দেখা দরকার।

বিডিইউ এর তৈরী সফটওয়্যারটি কিভাবে কাজ করবে তার বিস্তারিত এখনো প্রকাশিত হয়নি। যেটা খুব তাড়াতাড়ি করা দরকার মনে হয়। তাহলে সফটওয়্যারটির কোনো সীমাবদ্ধতা থাকলে তা বেরিয়ে আসবে। সফটওয়্যারটির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা বিডিইউ এর উপাচার্য মহোদয় দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস দিয়েছেন।

‘এ সফটওয়্যারটি মোবাইল বেইজড একটি অ্যাপস, এটি অফলাইন এবং অনলাইন-দুটোতেই কাজ করবে। যখন শিক্ষার্থীরা অ্যাপসটি ওপেন করবে তখন আমরা তার মোবাইলের ক্যামরার কন্ট্রোলটা নেব এবং সাথে সাউন্ডেরও কন্ট্রোলও।

এছাড়াও তখন সে ফোনে আর কোন অ্যাপস অন করতে পারবে না এবং কোন কাজ করতে পারবে না। যতক্ষণ না আমাদের এই অ্যাপসটি অন থাকবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা অনলাইনে থেকে যখন অ্যাপসটি অন করবে তখন আমরা তাদের লাইভ মনিটরিং করতে পারবো। আর অফলাইনে থাকলে ছবি এবং সাউন্ড রেকর্ড করা থাকবে। এটা পরবর্তীতে আমাদের সার্ভারে চলে আসবে। তখন আমরা বুঝতে পারবো সে নকল করেছে কিনা। এটা হচ্ছে সিম্পল কনসেপ্ট। - অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ’

বিডিইউ এর উপাচার্য মহোদয়ের বক্তব্য খুবই আশা জাগানিয়া এবং আত্মবিশ্বাসী যেমন একদম সিম্পল কনসেপ্টে এই সফটওয়্যারটির এবং এখানে অংশ নেয়া পরীক্ষার্থীদের কোন ধরনের অনিয়ম কিংবা নকল করার সুযোগ থাকবে না।

কিন্তু বিগত বছরগুলোতে ভর্তি পরীক্ষায় দায়িত্ব পালনের ও একটি মাল্টি ন্যাশনাল সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে নিচের বিষয়গুলো চ্যালেঞ্জিং মনে হচ্ছে।

১. অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষার সময় বিডিইউ এর তৈরী সফটওয়্যারটি শিক্ষার্থীর সাউন্ডসহ ভিডিও ধারণ করবে এবং তা পরীক্ষা শেষে একটি সার্ভারে জমা হবে। বিডিইউ এর মতে কেউ যদি নকল করে তাহলে তা সার্ভারে জমা হওয়া ভিডিও যাচাই করে ধরা যাবে। বিডিইউ এটাকে বলেছে সিম্পল কনসেপ্ট। কিন্তু কনসেপ্টটা কতটুকু বাস্তবসম্মত সেটা ভেবে দেখা দরকার। যেমন সরকার ঘোষিত পদ্ধতিতে তের লক্ষ শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় পাশ করতে যাচ্ছে। এখন এই তের লক্ষ শিক্ষার্থী যদি অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা দেয় তাহলে নকল ধরার জন্য তের লক্ষ শিক্ষার্থীর এক থেকে দেড় ঘন্টার ভিডিও যাচাই করতে হবে। এটা কতটুকু বাস্তবসম্মত?

২. তের লক্ষ শিক্ষার্থীর একসাথে অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার জন্য বিডিইউ এর তৈরী সফটওয়্যারটির একটি অংশ (ব্যাকএন্ড) অবশ্যই উচ্চ কনফিগারেশনের সার্ভারে হোস্ট করতে হবে। কারণ সার্ভারটিকে একসাথে তের লক্ষ শিক্ষার্থীর লোড নিতে হবে। এমন সার্ভার প্রস্তুত করে লোড টেস্ট করার জন্য দুইমাস সময় কতটা পর্যাপ্ত তা ভেবে দেখা দরকার। এক্ষেত্রে ক্লাউড থেকে সার্ভার ভাড়া নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু স্বায়ত্তশাসিত ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের ডাটা ক্লাউডে রাখতে সবসময়ই অনীহা প্রকাশ করে থাকেন। তাই ভর্তি পরীক্ষার মত ডাটা ক্লাউডে রাখতে কতটুকু রাজি হবেন সেটাও চিন্তা করা দরকার।

৩. বিডিইউ অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষার সময় নকল ঠেকানোটাকে যতটা সিম্পল মনে করেছে বিগত বছরগুলোতে ভর্তি পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন করে আমার কাছে ততটা কমপ্লেক্স মনে হয়েছে। যারা ভর্তি পরীক্ষায় অসৎউপায় অবলম্বন করে তাদের চিন্তা চেতনা বিচিত্র রকমের হয়ে থাকে। যেমন বিডিইউ এর তৈরী সফটওয়্যারটি সাউন্ডসহ ভিডিও ধারণ করবে যাতে পাশে থেকে কেউ সাহায্য না করতে পারে। ধরা যাক পরীক্ষার সময় সফটওয়্যারটি ফ্রন্ট ক্যামেরা দিয়ে শিক্ষার্থীর করছে ভিডিও ধারণ। এক্ষেত্রে কেউ যদি সাহায্য করার জন্য মোবাইলের পিছনে বসে থাকে এবং যে মোবাইল দিয়ে শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে তার স্পীকার যদি নষ্ট হয় মানে সাউন্ড রেকর্ড করতে অক্ষম তাহলে ভিডিও যাচাই করে নকল সম্পর্কে কিভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে? এইরকম সূক্ষ সূক্ষ বিষয়গুলো নিয়ে আরো ভেবে দেখা দরকার।

৪. আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা যাতে অনলাইনে ক্লাস করতে পারে তার জন্য সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে যেমন ডাটা ও মোবাইল কিনতে সাহায্য করা। এখন যে তের লক্ষ শিক্ষার্থী অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে তাদের ভিতর নিঃসন্দেহে অনেকে আর্থিকভাবে অসচ্ছল থাকবে। তাই তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা করে অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষার কথা ভাবা উচিৎ।

ভর্তি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনে খুবই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এই পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করেই একজন শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষার শুরু হয়। তাই কর্তৃপক্ষের সবকিছুর আগে নিশ্চিত করতে হবে এখানে যেন কেউ বেশি সুবিধা না পায় এবং অন্যদিকে কেউ যেন বঞ্চিত না হয়। আশা করি সকল চ্যালেঞ্জ দূর হবে, ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে।

 

লেখক: লেকচারার, কম্পিউটার সায়েন্স ইজ্ঞিনিয়ারিং বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


মন্তব্য

এ বিভাগের আরো সংবাদ