স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা রক্ষা: বিএনপির রাজনীতি

২৫ মার্চ ২০২৬, ১০:০১ PM
প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম

প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের (বীর-উত্তম) রণাঙ্গনের বীরত্বগাথাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র আদর্শিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের মূল শিকড়। যদিও দলটির সাংগঠনিক যাত্রা ১৯৭৮ সালে, তবে এর ‘ঐতিহাসিক বৈধতা’ (Historical Legitimacy) প্রোথিত রয়েছে সরাসরি একাত্তরের ২৬ ও ২৭ মার্চের সেই কালজয়ী বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার ঘোষণায়, যা ছিল মূলত একটি Resistance Communication ও যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধের বিগ্রেড ‘জেড ফোর্স’-এর নেতৃত্বসহ রণাঙ্গনের এই সামরিক-রাজনৈতিক স্মৃতিরেখাকে বিএনপি একটি শক্তিশালী ‘প্রতীকী পুঁজি’ (Symbolic Capital) হিসেবে ধারণ করেছে। পিয়েরে বুর্দিয়োর সমাজতাত্ত্বিক দর্শনে যা একটি কার্যকর রাজনৈতিক সম্পদ এবং নেলসন ম্যান্ডেলার ভাষায় ‘অসম্ভবকে সম্ভব করার’ এক বীরত্বপূর্ণ আখ্যান। ফলে ১৯৭১-এর সেই অমলিন স্মৃতি ও জাতীয়তাবাদী চেতনাই পরবর্তীকালে বিএনপি’র রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের ভিত এক সুদৃঢ় উত্তরাধিকার (Post-facto Political Inheritance) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

বলাবাহুল্য, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারকে কেবল অতীতের গৌরব হিসেবে নয়, বরং সমকালীন রাজনীতিতে একটি Legitimizing Discourse হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছে। ম্যাক্স ওয়েবারের মতে, রাজনৈতিক ক্ষমতা শুধু গায়ের জোরে টিকে থাকে না, তার জন্য প্রয়োজন ‘বৈধ আধিপত্য’ (Legitimate Domination) । বিএনপি সেই বৈধতার ভাষা নির্মাণে ১৯৭১-কে একটি ‘নৈতিক ভাণ্ডার’ (Moral Reservoir) হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। তাদের এই দর্শনে স্বাধীনতা কেবল রাষ্ট্রের জন্ম নয়, বরং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার চিরন্তন উৎস। এখানে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ‘Imagined Community’ বা ‘কল্পিত সম্প্রদায়’ ধারণাটিও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক; কারণ জাতি কেবল কোনো আইনি বা ভৌগোলিক কাঠামো নয়, বরং এটি একটি গভীর আবেগে লালিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়। বিএনপি’র রাজনৈতিক পাঠে ১৯৭১ হলো সেই জাতিসত্তার জন্মলগ্নের অবিনাশী স্মারক, আর সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে কেন্দ্র করেই দলটি তাদের জাতীয়তাবাদী দর্শনের সুসংহত ভিত্তি নির্মাণ করেছে। ‘গাছের শিকড় যত গভীর, ঝড় তাকে তত কম বিচলিত করে’—এই প্রবাদটি বিএনপি’র ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। কেননা, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিকে আদর্শিক শিকড় হিসেবে ধারণ করেই তারা নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতাকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিএনপি নিজেদের ভূমিকাকে কেবল ‘রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা’র সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তারা এই গণঅভ্যুত্থানকে ‘স্বাধীনতা রক্ষা’, ‘রাজনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধার’ এবং ‘গণতান্ত্রিক পুনর্নির্মাণ’-এর সুগভীর দর্শনে সংজ্ঞায়িত করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দলটির রাজনৈতিক কৌশল ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী ও সূক্ষ্ম। তারা ২০২৪-এর এই মাহেন্দ্রক্ষণকে নতুন কোনো রাষ্ট্রজন্ম হিসেবে নয়, বরং একটি Restorative Moment বা হারানো অধিকার পুনরুদ্ধারের ঐতিহাসিক কালখণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করায় সার্থকতা খুঁজে পায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেই বয়ান—‘১৯৭১ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ ছিল সেই স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ’—মূলত একটি দ্বি-স্তরীয় আখ্যান নির্মাণ করে। এতে একদিকে যেমন ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক অনন্যতা অক্ষুণ্ণ থাকে, তেমনি অন্যদিকে ২০২৪-এর গণজাগরণকে একটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার অংশ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া সম্ভব হয়। রুশ তাত্ত্বিক আইজাইয়া বার্লিন স্বাধীনতার যে দুটি রূপের কথা বলেছিলেন—Negative Liberty এবং Positive Liberty—তার আলোকে ১৯৭১-কে পাকিস্তানি শাসন থেকে মুক্তির স্বাধীনতা এবং ২০২৪-কে রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক অধিকার পুনরুদ্ধারের স্বাধীনতা হিসেবে দেখা যায়। অর্থাৎ বিএনপি এখানে স্বাধীনতার অর্থকে ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব থেকে ‘নাগরিক সার্বভৌমত্বে’ প্রসারিত করেছে। এটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি ২০২৪-কে কেবল ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং একটি অধিকারভিত্তিক রাজনৈতিক জাগরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এখানে দলটির অবদান মূলত ত্রি-মাত্রিক: প্রথমত, ২০২৪-এর ঘটনাকে একটি নৈতিক-রাজনৈতিক ভাষা প্রদান; দ্বিতীয়ত, ভোটাধিকারকে স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা; এবং তৃতীয়ত, রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে জবাবদিহিতার প্রশ্নে পুনর্নির্মাণ করা।

ইতিহাসবিদ হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, ‘Freedom is experienced in action ।’ এই অর্থে বিএনপি ২০২৪-কে শুধু ইতিহাসের একটি শুষ্ক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং জনগণের কার্যকর রাজনৈতিক উপস্থিতির একটি জীবন্ত রূপ হিসেবে পাঠ করতে চেয়েছে। বিএনপি শুধু প্রতীকী ভাষ্য নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং জুলাই-আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের পরিবারকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এই অবস্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি স্মারক-রাজনীতিকে (Commemorative Politics) সরাসরি নীতিগত অঙ্গীকারের সাথে যুক্ত করে। অমর্ত্য সেনের সেই বিখ্যাত ধারণা অনুযায়ী, স্বাধীনতা যেমন চূড়ান্ত লক্ষ্য, তেমনি এটি উন্নয়নের প্রধান মাধ্যমও বটে। এই আদর্শকে ধারণ করে বিএনপি আহত ও শহীদদের সহায়তাকে শুধু মানবিক দায় নয়, বরং স্বাধীনতার সামাজিক পরিণতি রক্ষার এক রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে দেখে। জুলাই-আন্দোলনের স্মৃতিকে নীতিগত কাঠামোয় রূপ দেওয়ার মাধ্যমে বিএনপি সেই ঋণকে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ভাষা দিতে চেয়েছে। আসলে বিএনপি’র সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য এই যে, তারা ১৯৭১ ও ২০২৪-এর মধ্যে একটি শক্তিশালী প্রতীকী সেতুবন্ধন নির্মাণ করতে পেরেছে—যেখানে প্রথমটি স্বাধীনতা অর্জনের এবং দ্বিতীয়টি স্বাধীনতা রক্ষার মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। এটি এমন এক ধরনের Narrative Continuity, যা দলীয় আত্মপরিচয়কে দীর্ঘকালীন ও জাতীয় পর্যায়ে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। 

বস্তুত, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র অবদান তাদের এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। এর মূলে রয়েছে স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের (বীর-উত্তম) সেই কালজয়ী ঘোষণা এবং রণাঙ্গনের অকুতোভয় সশস্ত্র নেতৃত্ব। একইভাবে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে দলটির ভূমিকা ছিল দেশপ্রেমিক জনতাকে একসূত্রে গেঁথে আন্দোলনের মূল স্পৃহাকে ‘সার্বভৌমত্ব রক্ষা’ এবং ‘শহীদদের আত্মত্যাগের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি’র একটি বলিষ্ঠ জাতীয় কাঠামোয় রূপ দেওয়া। এক্ষেত্রে বিএনপি’র সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, পরবর্তীতে দলের চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেই কালজয়ী বয়ান—‘১৯৭১ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ ছিল সেই স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ’—বিশেষভাবে পুনরায় স্মরণীয়। এই দুই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণকে সমন্বিত করে বিএনপি “স্বাধীনতা ’৭১, স্বাধীনতা রক্ষা ’২৪” চেতনার মাধ্যমে এক সুদৃঢ় ও দীর্ঘমেয়াদী জাতীয়তাবাদী ধারা প্রতিষ্ঠায় সার্থকতা খুঁজে পায়। জর্জ অরওয়েলের সেই বিখ্যাত উক্তি—‘Who controls the past controls the future’—এর সার্থক প্রতিফলন ঘটিয়ে ‘বিএনপি’ ১৯৭১-এর বীরত্বগাথা এবং ২০২৪-এর গণআকাঙ্ক্ষাকে একই সূত্রে গেঁথে আগামীর বাংলাদেশের জন্য এক অভেদ্য রাজনৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণে ব্রতী। এই ঐতিহাসিক বয়ান কেবল সমকালীন রাজনীতি নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথনকশা তৈরিতে দলটিকে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। 

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাবিতে জমে থাকা বৃৃষ্টির পানিতে বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে কুকুরের মৃ…
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, কৃষকদল নেতা নিহত
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
দৌলতদিয়া ঘাটে বাস দুর্ঘটনায় ভাগ্নেসহ জাবি শিক্ষার্থী নিখোঁজ…
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গণহত্যা দিবস’ পালিত
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের ঋণ পরিশোধে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা জ…
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
পদ্মায় বাস ডুবির ঘটনায় জামায়াতের বিবৃতি
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence