মোহাম্মদ আসিফ নিয়াজ চৌধুরী © টিডিসি সম্পাদিত
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) অভিনন্দন। তবে সামনে তাদের জন্য বড় কিছু নীতিগত, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে—যেগুলো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ এখন ১০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বা তার বেশি।
পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলি টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি ও বিদ্যুৎ খাতসহ বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য নেওয়া ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে ধীরে ধীরে রিপেমেন্ট ফেজে প্রবেশ করছে।
২০২৬-৩০ সময়কালে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ সতর্ক করছেন।
ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, মুদ্রাস্ফীতি, বিনিময় হার অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি—এসবের সম্মিলিত প্রভাবে Macroeconomic Stability চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ৯-১০% এর আশেপাশে ওঠানামা করেছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক সময় আরও বেশি ছিল। যদি আর্থিক শৃঙ্খলা, রাজস্ব আহরণ ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কার না হয়, তাহলে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে NPL (খেলাপি ঋণ) দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সমস্যা। সরকারি হিসাবেই খেলাপি ঋণ কয়েক লাখ কোটি টাকার ঘরে।
সুতরাং শুরু থেকেই ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত (যা এখনও ৮-৯% এর মতো, দক্ষিণ এশিয়ায় কম) বৃদ্ধি, ভর্তুকি ব্যবস্থার যৌক্তিকতা, মুদ্রানীতি-রাজস্বনীতির সমন্বয়—এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান সংস্কার প্রয়োজন।
বিএনপির আগের টার্মের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে তৃণমূল থেকে হাই-কমান্ড পর্যন্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে Credible Zero-Tolerance নীতি বাস্তবায়ন করা না গেলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।
বিএনপির ক্ষমতায় আরোহণের সঙ্গে ২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও রাজনৈতিক রূপান্তরের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে উঠে আসা ব্যক্তিত্বদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা Rule of Law প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হতে পারে।
ওসমান হাদী হত্যার বিচার, একইভাবে আবরার ফাহাদ হত্যার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের শাস্তি দ্রুত কার্যকর করা—বিএনপির জন্য নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একতরফা সাংবিধানিক পরিবর্তন প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি বিরোধ সৃষ্টি করেছে। এটি এড়ানো জরুরি। যেকোনো Structural Reform-এর ক্ষেত্রে এককভাবে Constitutional Engineering না করে বিরোধী দল, সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা হলে Democratic Legitimacy বাড়বে।
এক্ষেত্রে গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট যেহেতু জয়যুক্ত হয়েছে তাই গণভোটের 'খ' নং দফা অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে দ্রুত উচ্চকক্ষ গঠনে বিএনপির নজর দিতে হবে। মনে রাখতে হবে বিএনপি'র মোট প্রাপ্ত ভোটের চাইতেও গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট প্রদানকারীর সংখ্যা অনেক বেশী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মতামতকে কোনোভাবেই উপেক্ষার চিন্তা করা উচিত হবে না।
ইন্টেরিম সময়কালে মানুষের মধ্যে Welfare-Oriented Politics-এর প্রতি আগ্রহ দৃশ্যমান হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ছাত্র সংসদে বিজয়ী হওয়ার পর শিবির-এর কার্যক্রমের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়েছে এবং বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী এর Electoral Benefit ও পেয়েছে। বিএনপি এবং তার অঙ্গসংগঠনগুলো সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা—এসব ইস্যুতে বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণ করে কাজ করলে জনসমর্থন ধরে রাখতে সহায়ক হবে।
তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ (১৮-৩৫ বছর বয়সী ভোটার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি) বর্তমানে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তি খাতে সুযোগকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০-২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, কিন্তু পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন চাকরি সৃষ্টি না হওয়ায় বেকারত্ব ও আন্ডার-এমপ্লয়মেন্ট বাড়ছে।
Brain Drain একটি বড় চ্যালেঞ্জ—উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশমুখী। রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের পূর্বঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়ন করতে হলে দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা বিনিয়োগ, স্টার্ট-আপ ও প্রযুক্তি খাত, সমরাস্ত্র উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগ, সমুদ্র হতে তেল সম্পদ আহরণে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া—এসব ক্ষেত্রে দ্রুত এবং টেকসই নীতি প্রয়োজন।
ছাত্ররাজনীতির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বড় সংস্কারের সুযোগ রয়েছে বা Merit-based, Policy-oriented Student Politics গড়ে উঠলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের মান বাড়বে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ছাত্রসংসদ নির্বাচন, ক্যাম্পাসে সহিংসতা কমানো এবং গবেষণা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিদেশি শিক্ষার্থী বৃদ্ধি, ওয়ার্ল্ড র্যাংকিং এ মান বৃদ্ধি—এসব বিষয় ইতিবাচক অবস্থান নিশ্চিত করাটা বিএনপির জন্য একটি বড় Test Case।
ভারত প্রশ্নে National Interest-কে প্রধান ভিত্তি ধরে এগোনো গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের পক্ষে। স্বাধীনতার পর থেকে অবাধে সীমান্তে হত্যা, পানিবণ্টন (বিশেষ করে তিস্তা ও পদ্মা), ট্রানজিট, শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা—এসব ইস্যুতে দৃশ্যমান সমাধান আনতে না পারলে জনমতের চাপ বাড়তে পারে।
কূটনীতির টেবিলে নেগোসিয়েশন পাওয়ার অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিকভাবেই বাংলাদেশ হাতে অনেক নেগোসিয়েশন টুলস (যেমন- আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি, বঙ্গোপসাগরীয় প্রবেশাধিকার, ট্রানজিট রুট এবং সেভেন সিস্টার্সে স্থিতিশীলতা) রয়েছে যা বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলে। এক্ষেত্রে নিজেদের আরও শক্তিশালী অবস্থান জানান দিতে জিও-স্ট্র্যাটেজিক্যাল ব্যালেন্স, মাল্টিল্যাটেরাল ডিপ্লোম্যাসি এবং Reciprocity Principle অনুসরণ করা জরুরি।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সার্ক ধারণার প্রবর্তক ছিলেন। বাংলাদেশের নিজেদের স্বার্থেই এটিকে পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মোট বাণিজ্য তাদের বৈশ্বিক বাণিজ্যের মাত্র ৫% এরও কম, যেটি EU তে প্রায় ৬০% এবং ASEAN এ ২৫%। সার্ক সক্রিয় হলে সেভেন সিস্টার্স, নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশের বাজার বিস্তৃত হবে।
অর্থনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে দেশগুলোর ভেতর পারস্পরিক সন্দেহ দূর হবে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্থিতিশীল হবে, অর্থনৈতিক সুরক্ষা ও ভৌগোলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং সর্বোপরি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে।
মানুষ সাম্প্রতিক সময়ে ভোট ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে যে আগ্রহ দেখিয়েছে, তা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন যদি তুলনামূলকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারেরই লাভ হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে—যখন নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা বাড়ে, তখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও বাড়ে।
শেখ হাসিনা তার আমলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মদদে বাংলাদেশে সুকৌশলে ইসলামফোবিয়া ছড়িয়েছে। মতের বিরুদ্ধে গেলেই শিবির, রাজাকার বলে Criminalise করেছে। ট্যাগিং রাজনীতি, বা বিভাজনমূলক ভাষা—এসব সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সহনশীল ও উদার রাজনৈতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে নতুন সরকারের ভাবমূর্তি বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
গত দেড় বছরে মানুষ অনলাইন-অফলাইনে তুলনামূলক বেশি বাক্ স্বাধীনতার সুযোগ পেয়েছে—এটি ধরে রাখার ক্ষেত্রে বিএনপি আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা দিলে রাজনৈতিক পরিপক্বতা (political maturity) প্রদর্শিত হবে।
সর্বোপরি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি, কূটনৈতিক ভারসাম্য ও মেধাবী তরুণদের সম্পৃক্ততা—এই পাঁচটি স্তম্ভে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে বিএনপি দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল ও ইতিবাচক রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
আদর্শ জাতীয়তাবাদী চেতনায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাক। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
লেখক: ব্যাংকার