মোশফেকুর রহমান © টিডিসি ফটো
এনআইডি স্মার্ট কার্ডের মতো সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় পরিচয়পত্রটি সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও কাছাকাছি যেকোনো একটি কেন্দ্রে কেন ভোট দেয়া যায় না? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে ক্ষোভের সঙ্গে এমন প্রশ্ন তুলেছেন দেশের অনেক নাগরিক।
রাজধানীর একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাখাল গত চার বছরে তিনি তার জাতীয় পরিচয়পত্রের অস্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করতে চেয়েছেন। কিন্তু সরকারি দপ্তরের দীর্ঘসূত্রিতা ও ব্যুরোক্রেটিক জটিলতায় এখনও তিনি সেই ঠিকানা পরিবর্তন করতে পারেননি। ভোটের দিন সকালে তাকে তার কর্মস্থল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে উপস্থিত থাকতে হবে। তার পক্ষে তার নিবন্ধিত এলাকার টঙ্গীতে গিয়ে বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে ফিরে ভোট দেয়া সম্ভবপর হবে না। কারণ তার ১০ ঘণ্টার কর্মঘণ্টা শেষ হবে বিকেল ৪টায়। আর ভোটগ্রহণ শেষ হবে বিকেল সাড়ে ৪টায়। অথচ তিনি অনায়েসে তার কর্মস্থল তেজগাঁওয়ের যেকোনো একটি সরকারী স্কুলে কাজের ফাঁকে ভোট দিয়ে আসতে পারতেন যদি আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকতো। তিনি আফসোস করে বলেন, হয়তো তার অনুপস্থিতে টঙ্গীতে তার নির্ধারিত ব্যালটে অন্য কেউ সিল মেরে দিতে পারে।
তার সরল প্রশ্ন, আমি যদি মোবাইল ব্যাংকিং, এটিএম কার্ড দিয়ে যেকোনো এলাকায় যেকোনো ব্যাংকের বুথ থেকে অনায়েসে টাকা তুলতে পারি তবে কেন আমি আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোটটি আজ ১৮ বছর পরেও এই নতুন বাংলাদেশে দিতে পারবো না? এর দায় কার।
এই প্রতিবেদককে করা রাখালের প্রশ্নটি ছিল সরল, কিন্তু গভীরভাবে যৌক্তিক।
‘আমি যদি বিকাশ/নগদ আর এটিএম কার্ড দিয়ে যেকোনো জায়গা থেকে টাকা তুলতে পারি, তাহলে কেন আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোটটি আমার সুবিধামতো যেকোনো কেন্দ্র থেকে দিতে পারবো না?’
এটি রাখালের কোনো আবেগী প্রশ্ন নয়। এটি আধুনিক যুগে বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থায় সেকেলে ভাবধারা ও আধুনিক প্রযুক্তিবিবর্জিত ধ্যানধারণার মুখোশ খুলে দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রাজধানীর ভাষানটেকের দামালকোট এলাকার সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ আলী বলেন, তার জাতীয় পরিচয়পত্র হয়েছিল সুনামগঞ্জের সাল্লার গ্রামের বাড়িতে ২০০৭-৮ সালে। ১২ বছর আগে তারা গ্রামের বাড়ি ছেড়ে রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। এখন তিনি ঢাকা-১৭ আসনের বাসিন্দা। কিন্তু প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও তার পক্ষে ভোটের আগে ব্যবসা বন্ধ করে গ্রামের বাড়ি যাওয়া এবং আসা সম্ভবপর নয়। তার বয়স এখন ৭৫ এর বেশি। আর ঢাকাতেও তার ভোট দেয়া সম্ভব নয়- কারণ এখানে তিনি নিবন্ধিত ভোটার নন। তাই এবারও তিনি ভোট দিতে পারছেন না। তাকে ব্যবসার কাজে সহায়তা করা স্ত্রী একইভাবে ক্ষোভের কথা জানান। তিনি প্রশ্ন করেন, ভোটদানের ক্ষেত্রে কেন এই সীমাবদ্ধতা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নথিতে মোহাম্মদ আলী ও তার স্ত্রীর ভোটাধিকার আছে তবে তা এখন শুধুই কাগজ,ব্যালট, নির্ধারিত ভোটকেন্দ্র আর সময়ের মারপ্যাঁচে আঁটকে গেছে। নাগরিক জীবনের কঠিন বাস্তবতা, তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রশাসনিক কাঠামো, নির্বাচন পরিচালনাকারী পর্যদ আর আইনি বাধার সামনে।
একইভাবে ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন ৭০ উর্ধ্ব বয়সী আলী নওয়াব ভূইয়া। তিনি জানান, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জাতীয় পরিচয়পত্র কার্ড করার সময় তিনি ছিলেন তার কর্মস্থল রাজধানীর তেজকুনিপাড়ায়। প্রায় ১০ বছর আগে একটি স্বায়ত্বশাসিত সরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে অবসরে যান এবং তিনি স্ত্রী-সন্তানসহ পৈতৃক নিবাস কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বাহেরগড়া গ্রামে স্থায়ী হয়ে যান। এর মধ্যে কয়েক দফায় তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রের অস্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করে চৌদ্দগ্রামের বাহেরগড়া করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তাই এবার তার ও তার স্ত্রীর পক্ষে ভোটের ঠিক আগমুহূর্তে অসুস্থ শরীরে ঢাকায় যাওয়া এবং ভোটগ্রহণের দিন তেজকুনিপাড়ায় গিয়ে ভোট দিয়ে আসা পুরোপুরি অসম্ভব। তাই নতুন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের পক্ষে ভোট দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানাভিত্তিক এই সীমাবদ্ধতার কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটেও মতপ্রকাশ করতে পারবেন না তারা।
এটি ব্যক্তিগত দুর্ভোগ বা পারিবারিক ব্যর্থতা নয়। এটি নির্বাচন কমিশনের আইনগত সীমাবদ্ধতার ফল।
একটি বেসরকারী টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদক জানান, তার বাবা গত ২৫ বছরে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে পোলিং অফিসার, নির্বাচনকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ কোনো নির্বাচনেই তিনি নিজের ভোটটি দিতে পারেননি।
কারণ খুব সাধারণ। ভোটের দিন তিনি কর্মরত ছিলেন অন্য কোন এলাকার কেন্দ্রে, নিজের নিবন্ধিত এলাকায় নয়। এদিকে নির্বাচনের দিন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া পোলিং অফিসারদের কেন্দ্র ছাড়ার অনুমতি থাকে না। ফলে যিনি শতাধিক ভোটারকে ভোট দিতে সহায়তা করেছেন, তিনি নিজেই ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এটি কী ব্যতিক্রম কোন ঘটনা? উত্তর হচ্ছে না। এটি বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্ববিরোধিতা-যেখানে দেশজুড়ে নির্বাচন পরিচালনা করতে গিয়ে রাষ্ট্র নিজেই বহু নাগরিকের ভোটাধিকার খর্ব করছে।
এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো কারাবন্দিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। কমপক্ষে ছয় হাজার বন্দি সশরীরে ভোট দেবেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দিতে কারাবন্দিদের মধ্যে মোট পাঁচ হাজার ৯৬০ জন নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। কারা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, যদিও দেশে বর্তমানে প্রায় ৮৪ হাজারের বেশি বন্দি রয়েছেন। তবে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
কিন্তু এই বাস্তবতা একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে-যদি কারাগারে থেকেও ভোট দেয়া সম্ভব হয়, তবে দেশের ভেতরে কর্মস্থল বা বাসস্থান বদলানো নাগরিক কেন ভোট দিতে পারবেন না?
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার। নির্বাচন মানেই গণতন্ত্রের উৎসব-এ কথা বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু এই উৎসবে সবাই কি আমন্ত্রিত? জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে থাকা সত্ত্বেও কি সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছেন? নাকি বাংলাদেশের নির্বাচনি কাঠামো এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে ভোটাধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে অনেক নাগরিকের জন্য তা অধরাই থেকে যাচ্ছে।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসছে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব। বাংলাদেশে ভোটাধিকার এখনো ‘ঠিকানাভিত্তিক’,অথচ নাগরিকের জীবন ‘চলমান’।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে এই ইস্যুতে আলোচনায় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভোটারদের কেন নিবন্ধিত এলাকায় গিয়েই ভোট দিতে হয়-এর ব্যাখ্যায় তিনি একে ‘প্রতিষ্ঠিত আইন’ ও ‘আরপিওভুক্ত নিয়ম’হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ঠিক কোন ধারায় ভোটারকে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধিত এলাকায় গিয়ে ভোট দিতে হবে—সরাসরি এমন কোনো ধারা তিনি উল্লেখ করতে পারেননি, যেখানে নাগরিককে স্পষ্ট ভাষায় অন্য কেন্দ্রে ভোট দিতে নিষেধ করা হয়েছে।
তিনি বলেন,‘যে এলাকায় যতজন ভোটার নিবন্ধিত, ঠিক ততগুলো ব্যালট সেখানে পাঠানো হয়। একটিও কমবেশি নয়। যদি ভোটাররা যেকোনো কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেন, তাহলে ব্যালট বরাদ্দ কীভাবে নির্ধারিত হবে?’
এই উপসচিবের প্রশ্নটি আসলে পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থার অনড় চরিত্র উন্মোচন করে দেয়। বাংলাদেশের ভোটব্যবস্থা নাগরিকের সুবিধা-অসুবিধাকে গুরুত্ব দিয়ে গড়ে উঠেনি, এটি নির্বাচন পরিচালনাকারীদের সিদ্ধান্ত, ব্যালটের স্থির ও সুনির্দিষ্ট গন্তব্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তার যুক্তির ভিত্তি ছিল নির্বাচনি ব্যবস্থার লজিস্টিক ও কাঠামোগত বাধ্যবাধকতা, তবে সেখানে গুরুত্বহীনই হয়ে পড়েছে বহু নাগরিকের প্রত্যাশা।
এখানে নাগরিককে যেকোনো ভাবে মানিয়ে নিতে হবে নির্বাচনি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার সঙ্গে। তা না হলে তিনি ছিটকে পড়বেন ভোট দেয়ার মতো কাঙ্ক্ষিত নাগরিক অধিকার থেকে।
উপসচিবের এই কথোপকথন থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট-দেশের ভোটব্যবস্থা সরাসরি কোনো লিখিত নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ভোটারকে বঞ্চিত করছে না। কোথাও লেখা নেই—‘আপনি ভোট দিতে পারবেন না।’
কিন্তু বাস্তবে যা ঘটছে, তা আরও গভীর ও সূক্ষ্ম। ভোটার তালিকা কেন্দ্রভিত্তিক। ব্যালট বরাদ্দ কেন্দ্রভিত্তিক।
ভোট গণনা কেন্দ্রভিত্তিক।
ফলে ভোটার কোথায় থাকেন, কীভাবে চলাচল করেন, ভোটের দিন কী ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েন-এসব বাস্তবতা নির্বাচনি আইনি কাঠামোর আওতাভুক্ত করা হয়নি। এটি সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়। এটি একটি নীরব কিন্তু কাঠামোগত কঠোর বাধ্যবাধকতা।
নির্বাচন কমিশন এ বছর প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের সুযোগ চালু করলেও বাস্তবে শিক্ষিত ও প্রযুক্তি-সচেতন অনেক ভোটারই সেই প্রক্রিয়া বুঝে আবেদন করেও সফল হননি। আবেদন পদ্ধতি, সময়সীমা, যোগ্যতার শর্ত এবং অনলাইন ধাপগুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত ও কার্যকর জনসচেতনতা না থাকায় এই সুবিধা বহু নাগরিকের কাছেই অধরা থেকে গেছে। সে ক্ষেত্রে দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষা ও প্রযুক্তি-সুবিধাবঞ্চিত মানুষ কীভাবে অনলাইনে আবেদন করে সফলভাবে এই ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন-এ প্রশ্নটি এখন অনেকের কাছেই বাস্তবসম্মত নয়, বরং প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।
একইভাবে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা থাকলেও তা মোট প্রবাসী জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত সীমিত পরিসরে কার্যকর হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত কোটি সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির তুলনায় আবেদন ও অনুমোদিত পোস্টাল ব্যালটের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ফলে নীতিগতভাবে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে প্রবাসীদের বড় একটি অংশ এই ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে, যা ভোটাধিকারকে সর্বজনীন করার লক্ষ্য পূরণে বড় ধরনের ঘাটতির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
ঠিকানাভিত্তিক ভোটিং বনাম নাগরিকত্বভিত্তিক ভোটাধিকার:বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশে ভোটাধিকারকে এখন নাগরিকত্বকেন্দ্রিক অধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে ভোট দেয়ার অধিকার কখনই নাগরিকের স্থায়ী-অস্থায়ী ঠিকানার সঙ্গে কঠোরভাবে বাঁধা নয়।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানিসহ অনেক দেশে পোস্টাল ব্যালট বা ডাকযোগে ভোটের ব্যবস্থা রয়েছে, যার মাধ্যমে নাগরিকরা নিবন্ধিত নির্বাচনি এলাকার বাইরে অবস্থান করলেও সহজে ভোট দিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে ‘মেইল-ইন ব্যালট’ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাসী নাগরিক, সেনাসদস্য কিংবা অস্থায়ীভাবে অন্য অঙ্গরাজ্যে থাকা ভোটাররাও কোন ধরনের বাধা ছাড়াই ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
জার্মানিতে বসবাসরত নাগরিকরা আগাম আবেদন করে পোস্টাল ভোটের সুযোগ পান, ফলে কর্মস্থল, অসুস্থতা বা ভ্রমণ কোনোভাবেই ভোটাধিকার খর্ব করতে পারে না। এই ব্যবস্থাগুলোর মূল দর্শন হলো-রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের রাজনৈতিক সম্পর্ক তার অবস্থান বা ঠিকানার কারণে স্থগিত বা বাধাগ্রস্ত হতে পারে না।
একই দর্শনের ধারাবাহিকতায় অনেক দেশ অ্যাডভান্স ভোটিং ও ‘ভোট এনি-হোয়ার’ বা নমনীয়-সহজ ভোটিং ব্যবস্থা চালু করেছে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে নির্বাচনের কয়েক দিন আগেই আগাম ভোট দেয়ার সুযোগ থাকে, যাতে কর্মজীবী মানুষ, দূরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা বা শারীরিকভাবে সীমাবদ্ধ নাগরিকরাও ভোট দিতে পারেন। কানাডায় ফেডারেল নির্বাচনে নির্ধারিত আগাম ভোটিং ডে ছাড়াও বিশেষ পরিস্থিতিতে ভোট দেয়ার একাধিক বিকল্প পদ্ধতি রয়েছে।
এসব উদাহরণ স্পষ্ট করে যে আধুনিক গণতন্ত্রে ভোটকে আর ‘ঠিকানাভিত্তিক উপস্থিতির আনুষ্ঠানিকতা’হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং ভোটকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে, যা রাষ্ট্র নিজেই সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে নিশ্চিত করার দায়িত্ব বহন করে।
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় পরিচয়পত্র প্রণয়নের কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালে, তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। সেই সময় নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে দেশজুড়ে একটি ডিজিটাল ভোটার তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়, যার সঙ্গে নাগরিকদের ছবি, আঙুলের ছাপ ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই প্রকল্পটিই ছিল বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থার ভিত্তি।
সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২০০৮ সাল থেকে নাগরিকদের হাতে কাগজভিত্তিক (ল্যামিনেটেড) জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ শুরু হয়। এই পরিচয়পত্র ব্যবহার করেই জনগণ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার ভোটাধিকার প্রয়োগ করে।
এনআইডি স্মার্ট কার্ড: জাতীয় পরিচয়পত্রে ২০১৬ সালের শেষ দিকে মাইক্রোচিপ যুক্ত করে ডিজিটাল বা এনআইডি স্মার্ট কার্ডে উন্নীত করা হয়। কিন্তু ভোটিং কাঠামো এখনো ২০০৭–০৮ সালের জরুরি অবস্থার মধ্যে যেন আটকে রয়েছে। আর এখানেই দ্বন্দ্ব মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। নাগরিকের জীবন-পদ্ধতি এগিয়েছে, কিন্তু ভোটের কাঠামো দুই দশক আগের স্থান থেকে খুব বেশি এগোয়নি।
ভোটাধিকার যদি সত্যিই মৌলিক অধিকার হয়, তবে তা শুধু কাগজে নয়, বাস্তব জীবনেও কার্যকর হতে হবে।
নইলে জাতীয় পরিচয়পত্র বা স্মার্ট কার্ড থাকবে হাতে, কিন্তু ভোটাধিকার থাকবে দূরে-কোনো এক নিবন্ধিত ঠিকানার জালে আটকে।
আমাদের বর্তমান ঠিকানাভিত্তিক ভোটের পদ্ধতি দেখলে মনে হয়, আমাদের যেন এখনও ব্যাংকের শাখায় লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা তুলতে, জমা দিতে কিংবা বিল পরিশোধ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। অথচ উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে গত এক দশকে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা ও এটিএম কার্ডের ব্যবহার দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে গেছে। আজ এক ব্যাংকের এটিএম কার্ড দিয়েই অন্য ব্যাংকের বুথ থেকে মুহূর্তের মধ্যে টাকা তোলা সম্ভব। অর্থাৎ আর্থিক লেনদেনে ‘ঠিকানা’বা নির্দিষ্ট শাখার ধারণা কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে যখন প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্দান্তভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে-ইসির নির্বাচন ও ভোট পরিচালনা বিভাগ কেন এখনও অন্তত ২০ বছর পিছিয়ে? এই প্রশ্নই নাগরিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ইসির উপসচিবের কাছে যখন জানতে চাওয়া হয়েছিল, অনলাইনভিত্তিক ভোটিং সিস্টেম থেকে বাংলাদেশ এখনও কতটা দূরে রয়েছে, তখন তিনি সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনও অনলাইনভিত্তিক নির্বাচন শুরু হয়নি। আমরা অ্যানালগ সিস্টেমে নির্বাচনে ভোটগ্রহণ করছি।’
তিনি এই প্রতিবেদককে আরও জানান, নির্বাচন সংক্রান্ত তার ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখী কখনও হননি। এই বক্তব্যই আসলে সবচেয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়- রাষ্ট্র যখন ডিজিটালাইজেশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ভোটাধিকার প্রয়োগের পদ্ধতিতে এমন স্থবিরতা কেন?
বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। এই সন্ধিক্ষণে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নের একটি হয়তো এটিই-আমরা কি কোন একটি নির্দিষ্ট এলাকা বা ঠিকানার বাসিন্দা হওয়ার জন্য ভোট দেয়ার অধিকার পাই, নাকি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ভোটাধিকার অর্জন করেছি?