মোহাম্মদ সোহাইব © টিডিসি সম্পাদিত
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন একটা অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এটা শিক্ষার্থীদের অধিকার। এই নির্বাচন আঞ্জাম দেওয়ার সম্পূর্ণ এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। আর এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কারা? উত্তর হল- শিক্ষকরা। তাহলে শিক্ষকরা যদি মন থেকে চায়, ছাত্ররাও যদি চায়, সেক্ষেত্রে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে বাধা দেওয়ার মত শক্তি কারও নেই।
তাহলে এরকম অবস্থায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়া এবং তা নিয়মিত করার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনীহা বা ভয় কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই বেরিয়ে আসবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমস্যা জিইয়ে থাকার শানে নুযুল।
প্রথমে আসি অনীহার বিষয়ে। অনীহার পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিই দায়ী। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক শিক্ষকরাই প্রশাসনে প্রভাব রাখেন। যখন যেই দল ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দলপন্থী শিক্ষকরা প্রশাসন চালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যেক রাজনৈতিক শিক্ষকরা নিজেদের রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে মত্ত থাকে। এই দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রশাসনে বা প্রশাসনের বাইরে থাকা রাজনৈতিক শিক্ষকরা নানানভাবে ছাত্রদেরকে দিয়ে হোক বা প্রশাসনকে অসহযোগিতা করে হোক, ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করার ফন্দি আঁটে।
আরেকটু খুলে বলি। ধরুন একটা দল দেখলো যে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তার লেজুড়বৃত্তি করা ছাত্র সংগঠনটা জিতবে না বা জেতার সম্ভাবনা কম। আবার শিক্ষাঙ্গনে ভোট চুরি করে জেতানো সহজ কাজ নয়। এমতাবস্থায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করা ছাত্র সংগঠন জিতলে বা নিরপেক্ষ কেউ জিতলে সেক্ষেত্রে ক্যাম্পাসগুলো থেকে বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে যা ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় থ্রেট। এই থ্রেট থেকে বাঁচার জন্য ক্ষমতাসীন দল চায় না ছাত্র সংসদের মাধ্যমে ছাত্ররা সংগঠিত হোক এবং ভয়েস রেইজ করুক।
ফলে ক্ষমতাসীন সরকার নিজেদের পন্থী শিক্ষকদেরকে নির্দেশনা দেয় যেকোনো উপায়ে ছাত্র সংসদ ইলেকশন ঠেকাতে হবে বা বন্ধ রাখতে হবে। ব্যাস, দলীয় শিক্ষকরা এবার তার দলের লেজুড়বৃত্তি করা ছাত্র সংগঠনকে সাথে নিয়ে কূট-কৌশল বের করতে এবং এক্সিকিউট করতে থাকে যাতে করে নির্বাচন না হয়। এর ফল হিসেবে দেখবেন ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কথা উঠলে নানা ধরণের নাটক উপস্থাপন হচ্ছে। অথচ, শিক্ষকরা যদি কোন রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য কম্প্রোমাইজ না করে এবং অনেস্টি নিয়ে নির্বাচন করতে চায়, তাহলে ছাত্র সংসদ ইলেকশন বন্ধ রাখে এমন কোন শক্তি নাই।
শুধু যে ক্ষমতাসীন দলের শিক্ষকরা এই খেলা খেলে তা না। ক্ষমতায় না থাকা দলপন্থী শিক্ষকরাও এই খেলা খেলে। মডেল একই। যখন দেখে যে নির্বাচন হলে ক্ষমতায় না থাকা দলের লেজুড়বৃত্তি করা ছাত্রসংগঠন জিতবে না তখন সেই দলপন্থীর শিক্ষকরা দলের হাইকমান্ড থেকে নির্দেশনা পেয়ে ইলেকশন বন্ধ রাখার নোংরা খেলায় নামে। গুটি হিসেবে ইউজ হয় ছাত্র সংগঠনগুলো।
আজকে আপনারা যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নোংরা ছাত্ররাজনীতি দেখতে পান, তার নেপথ্যে রয়েছে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক নোংরা শিক্ষক রাজনীতি। লেজুড়বৃত্তিক শিক্ষক রাজনীতি যতদিন বন্ধ হবে না, ততদিন নোংরা ছাত্ররাজনীতিও বন্ধ হবে না।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে ভয়। চেয়ারের ভয়। চেয়ার চলে যাবার ভয়েও অনেক প্রশাসন ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে চায় না। ডাকসু, চাকসু, জাকসু, রাকসু নির্বাচন অবজারভ করেন। স্পষ্ট হয়ে যাবে সব।
লেখক: চেয়ারম্যান, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়