উচ্চশিক্ষার সম্ভাবনা ও শিক্ষক রাজনীতি

২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:০১ AM
শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন

শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন

বিশ্ববিদ্যালয়, যাকে কেন্দ্র করে উচ্চশিক্ষা আবর্তিত হয়, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। স্বাতন্ত্র্যের সেই জায়গাটি হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু শিক্ষার্থীদের শিক্ষাই প্রদান করা হয় না, বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্পন্ন গবেষণা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, কলা, আইন ও অর্থনীতির নানা বিষয়ে মৌলিক গবেষণা হয়। গবেষণার ফলাফলকে কাজে লাগানো হয় ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণে, রাষ্ট্রের অগ্রগতি ও উন্নয়নে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি গবেষণায় সম্পৃক্ত থাকতে হয়। মানসম্পন্ন ও মৌলিক গবেষণা একদিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে, অন্যদিকে তা নিশ্চিত করে মানবকল্যাণকে।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে কয়েক দশকের মধ্যেই এ বিশ্ববিদ্যালয় তার আবাসিক চরিত্র এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণার জন্য ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। সেই সময় কোন মানের শিক্ষকরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা প্রদান করতেন এবং গবেষণার মান কতটা সে বিষয়ে কিছু উদাহরণ প্রদান প্রাসঙ্গিক হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল থেকে সত্যেন্দ্রনাথ বসু, যিনি সত্যেন বোস নামে পরিচিত, একটি প্রবন্ধ পাঠান আইনস্টাইনের কাছে। তার ওই প্রবন্ধ পড়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘আমার মতে বসু কর্তৃক প্ল্যাঙ্ক-সূত্র নির্ধারণের এই পদ্ধতিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’। বিশ্বখ্যাত আরেক বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সম্মেলন উদ্বোধন করতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। ঢাকায় এক সময়ে গড়ে উঠেছিল এক শক্তিশালী গবেষক দল যারা মৌলিক পদার্থের প্রকৃতি সম্বন্ধে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। এসব গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছিলেন কে. এস. কৃঞ্চাণ, এস. আর খাস্তগির, কাজী মোতাহার হোসেন এবং আরো অনেকে। বিখ্যাত রোনাল্ড ফিশার ঢাকার বিমানবন্দরে নেমেই কাজী মোতাহার হোসেনের খোঁজ করতেন। এটাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার শিক্ষকদের প্রকৃত পরিচয়, সত্যিকারের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের জন্যই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জগন্নাথ হলে বসে লিখতে পেরেছিলেন: “এই কথাটি মনে রেখো, তোমাদের এই হাসি খেলায়....” (অধ্যাপক এ এম হারুন-অর-রশীদ, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের প্রায় শতবর্ষের ঐতিহ্য,” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের বার্ষিক প্রীতিসম্মিলনী ২০১২ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব কর্তৃক প্রকাশিত স্যুভেনির, ২০১২।)

আলবার্ট আইনস্টাইন থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাসকি পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার প্রশংসা করেছেন। কোন মানের শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, কয়েকটি নাম উলে­খ করলে সে বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া যাবে। যে সকল খ্যাতনামা পণ্ডিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন এবং এখনও শিক্ষকতা করছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রমেশচন্দ্র মজুমদার, জি এইচ ল্যাংলি, হরিদাস ভট্টাচার্য, সত্যেন বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, কাজী মোতাহার হোসেন, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, আব্দুর রাজ্জাক, আহমদ শরীফ, সরদার ফজলুল করিম, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ুন আহমেদ প্রমুখ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯১ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে, বড় দাগে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। এক. এ অঞ্চলের শিক্ষিত একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অনন্য ভূমিকা। দুই. এ অঞ্চলের সকল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন, অনেক যুগান্তকারী আন্দোলনে তারা পুরো জাতিকে নেতৃত্বও প্রদান করেছেন। তিন. বাংলাদেশ নামক ভূ-খণ্ডে উচ্চশিক্ষার বিকাশে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অনন্য ভূমিকা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে বিশ্ববিদ্যালয়টি তার মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণার জন্য ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলে খ্যাতি অর্জন করেছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি আজ বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় কততম অবস্থানে? স্পেনের সিএসইসি একাডেমিক কার্যক্রমের ভিত্তিতে সারাবিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে তালিকা প্রস্তুত করেছে, সেই তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১৪২৬ নম্বরে। এশিয়ায় শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, সেই তালিকার প্রথম ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৭৬তম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে না থাকে, যদি এশিয়ার শ্রেষ্ঠ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গাল ভরা নাম হয়ে যাচ্ছে না?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি বড় ঘাটতির জায়গা হচ্ছে, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণার জন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে আর্থিক বরাদ্দ প্রয়োজন, তা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পায় না। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে পারি। গত কয়েক বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গড়পড়তা বার্ষিক বাজেট ২০০ কোটি টাকার মত। এর সিংহভাগই ব্যয় হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা মেটাতে। বাকি অর্থ দিয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালনা করা এবং শিক্ষকদের পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে প্রশিক্ষণসহ নানা কর্মসূচী গ্রহণ সম্ভব নয় বললেই চলে।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি শিক্ষা ও গবেষণাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে, তা হচ্ছে ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষক রাজনীতি। আদর্শিক কারণে কেউ ছাত্র রাজনীতি বা শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোন আপত্তি নাই। আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি, যেখানে আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা রাজনীতি সচেতন ও রাজনীতি সংশ্লিষ্ট না হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অনেক বড় কায়েমি স্বার্থবাদীরা জেঁকে বসতে পারে। গত শতাব্দীর ৫০ ও ৬০ - এর দশকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাষার দাবিতে, শিক্ষার দাবিতে, স্বাধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সোচ্চার ও উচ্চকণ্ঠ হতে দেখেছি। ৭০’র দশকে তারা সাম্রাজ্যবাদ ও গণবিরোধী সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন। ৮০’র দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অভূতপূর্ব এক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করে সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিলেন। ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য থাকার পরও, ১৯৯১ সাল থেকে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা আরম্ভ হওয়ার পর থেকে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। আদর্শভিত্তিক ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে আমার কোন আপত্তি নেই, ওই ধরণের রাজনীতি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। কিন্তু লেজুড়বৃত্তির যে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি চলছে, তা একদিকে শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশকে নষ্ট করছে, অন্যদিকে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য তা কোন কল্যাণ বয়ে আনছে না।

শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের জন্য যদি শিক্ষকরা রাজনীতি করতেন, পেশাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধির জন্য যদি শিক্ষকরা উচ্চকণ্ঠ হতেন, তাহলে সেটাই হত যথার্থ শিক্ষক রাজনীতি। কিন্তু শিক্ষকরা আজ যে রাজনীতি করছেন, সেটি নির্লজ্জ লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি। শিক্ষকরা আজ রাজনীতি করছেন উপাচার্য, সহ-উপাচার্য হওয়ার জন্য বা রাষ্ট্রের কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রত্যাশায়। শিক্ষক রাজনীতির মাধ্যমে শিক্ষকরা আজ কোন না কোন রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য হাসিল করছেন। শিক্ষক রাজনীতি শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের কথা বলছে না, শিক্ষকদের পেশাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধির ব্যাপারেও শিক্ষক সংগঠনগুলোর কার্যকর কোন উদ্যোগ নেই। যে শিক্ষক রাজনীতি একদা শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে ছিল উচ্চকণ্ঠ, যে শিক্ষক রাজনীতি নানা প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পুরো জাতিকে দিক নির্দেশনা দিয়েছিল, সেই শিক্ষক রাজনীতি আজ যেন শিক্ষক নেতৃবৃন্দের ব্যক্তিস্বার্থ ও লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির চোরাবালিতে পথ হারিয়ে ফেলেছে। পুরো জাতির জন্য এটি খুব লজ্জার এবং শঙ্কার! এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া না গেলে তা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার জন্য বিপর্যয়কর হবে।

কয়েক দশক আগেও শিক্ষক রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছেন ড. আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও মশিহুজ্জামানের মত পণ্ডিত শিক্ষক। কিন্তু আজ যারা শিক্ষক রাজনীতির নেতৃত্বে রয়েছেন, তাদের পণ্ডিত যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, তেমনি তাদের মধ্যে আদর্শিত সততারও ঘাটতি দেখা যায়। এমন একটি দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা রইল।

অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কলাম লেখক, অপরাধবিজ্ঞান গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী
ই-মেইল: hrkarzon@yahoo.com

 

ডুয়েটে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, জেনে নিন আবেদনের খুঁটিনাঁটি
  • ১২ মে ২০২৬
৩০ জুনের মধ্যে ভূমি কর দেওয়ার নির্দেশ সরকারের, অনলাইনে পরিশ…
  • ১২ মে ২০২৬
কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে নতুন নির্দেশনা দিল মাদ্রাসা বোর্ড
  • ১২ মে ২০২৬
একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা আতাউর রহমান আর নেই
  • ১২ মে ২০২৬
সারাদেশের ভূমি মালিকদের জরুরি নির্দেশনা দিল সরকার
  • ১২ মে ২০২৬
ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় লেবাননে ২ বাংলাদেশি নিহত
  • ১২ মে ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SUMMER 2026
Application Deadline Wednesday, May 13, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9