তিস্তা মহাপরিকল্পনার ভূরাজনৈতিক প্রভাব এবং করণীয়

২৭ জুন ২০২৪, ০৭:৪০ PM , আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৫, ১২:০৭ PM
তিস্তা মহাপরিকল্পনার ভূরাজনৈতিক প্রভাব এবং করণীয়

তিস্তা মহাপরিকল্পনার ভূরাজনৈতিক প্রভাব এবং করণীয় © সংগৃহীত

এক: তিস্তার ভিক্টিম কারা?

উত্তরাঞ্চলের পাঁচটি জেলার দুই কোটি মানুষের জীবন জীবিকার সাথে গভীরভাবে যুক্ত তিস্তা নদী। হিমালয় থেকে সিকিম এবং পশ্চিম বঙ্গের মধ্যে দিয়ে নদীটি বাংলাদেশে ঢুকেছে। তিস্তার পানি যেন উত্তরাঞ্চলের প্রাণ। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী তিস্তার উজানে ভারতের গজলডোবায় ব্যারাজ নির্মাণ করে পানি আটকে দেয়! ফলে স্বাভাবিক পানির প্রবাহ হারায় তিস্তা! সেচ মৌসুমে তিস্তায় পানির অভাবে কৃত্রিম মরুকরণ চলে আর বর্ষায় অস্বাভাবিক বন্যা, সময়ে অসময়ে বন্যাই এখন তিস্তা পাড়ের মানুষের নিয়তি। তিস্তার স্বাভাবিক যে পানি বাংলাদেশের পাওয়ার কথা তা পাচ্ছে না। ফলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনের এক অভিশাপ এখন তিস্তা। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টোটা। যার জন্য একমাত্র দায়ী আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র।

২০১১ সালে মনমোহন সিংহ সরকার বাংলাদেশের সাথে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির কাছাকাছি চলে গেলেও সেই চুক্তিটি আজও হয়নি। বলা হয় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বাধার কথা! এক যুগ পেরিয়ে গেছে। যা দেওয়ার সব দেওয়াও হয়েছে শুধু বাংলাদেশ তার তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পায়নি! পাচ্ছে না। ফলে তিস্তা পাড়ের দুই কোটি মানুষ পানি সংকটের ভিক্টিম।

দুই: তিস্তা মহাপরিকল্পনা কী?

প্রতিবেশীর সাথে পানিবণ্টন চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশ সরকার তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়। যার নাম তিস্তা মহাপরিকল্পনা। অর্থাৎ ভারতের সাথে বাংলাদেশের তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি হলে কিন্তু এই তিস্তা মহাপরিকল্পনা করার প্রয়োজনই পড়তো না। এই তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে কেন্দ্র করেই এখন ভা র ত, চীন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তোলপাড় চলছে! খুব সহজ করে বললে তিস্তা মহাপরিকল্পনা হচ্ছে তিস্তা নদী পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। তিস্তা নদীর খনন, নদী শাসন,গভীরতা বাড়ানো, প্রস্থ কমানো, নৌ বন্দর নির্মাণ, তিস্তাকে কেন্দ্র করে উজানে সেচ মৌসুমে পানির জন্য বৃহৎ জলাধার নির্মাণ এবং নদীর দুই পাড়ে স্যাটেলাইট সিটি নির্মাণ। তিস্তা মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে প্রায় ১৭১ বর্গ কিলোমিটার ভূমি উদ্ধার করা সম্ভব এবং নদীর গভীরতা বাড়বে পাঁচ থেকে দশ মিটার পর্যন্ত। তিস্তা মহাপরিকল্পনা যা চীন করতে যাচ্ছে সেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে রংপুর বিভাগের তিস্তা পাড়ের দুই কোটি মানুষের জীবন জীবিকায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখবে। কিন্তু প্রকল্পটি নিয়ে এখন ব্যাপক রাজনীতি হচ্ছে। জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির খুব মুখ রোচক গল্প হয়েছে এখন এই তিস্তা। গল্প এখানেই থেমে নেই। চলুন, আরেকটু আগাই!

তিন: তিস্তায় ভারতের রাজনীতিটা কী?

২০২২ সালে চীনা রাষ্ট্রদূত তিস্তা মহাপরিকল্পনাটি সশরীরে পরিদর্শন করতে গেলে ভারতও আড়মোড়া দিয়ে জাগে। চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে একটি পরীক্ষা নিরীক্ষা চালায় এবং একটি রিপোর্ট তৈরি করে। এখন ভারত বলছে এই প্রকল্পে তারাও সহযোগিতা করতে আগ্রহী। অথচ জীবিত তিস্তাকে মেরে ফেলার জন্য দায়ী তারাই। সংবাদ বেরুচ্ছে -China, India in tug of war over Teesta project in Bangladesh. অর্থাৎ তিস্তা নিয়ে চীন-ভারতের টানাটানি! চীন একশো কোটি ডলার ব্যয়ের এই মহাপরিকল্পনার প্রাথমিক সমীক্ষা করেছে। বাংলাদেশ চীনের কাছে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্যও সাহায্যেও চেয়েছে। এমনকি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চীন বলেছিল দ্রুত কাজ শুরু হবে কিন্তু ভারতের বাঁধায় সব আটকে আছে। সরকারও ভা র তকে ক্ষেপাতে চাচ্ছে না। কারণ ক্ষমতার রাজনীতি! কারণ এ অঞ্চলের ভূরাজনীতি! পানি এখন ভারত বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে! বিশেষজ্ঞরা বলছেন-তিস্তার সমাধান না হলে বাংলাদেশ যেন ভারতের সাথে ট্রানজিটের বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করে! 

ভারত কেন চীনের তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিরোধিতা করছে? এর তুমুল বিশ্লেষণ হচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা চীনের এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নীতি। এই প্রকল্পে চীনের আগ্রহের কারণ তাদের মেগা প্রজেক্ট বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ। যা এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকা মহাদেশকে যুক্ত করছে।বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার প্রস্তাবিত এই অর্থনৈতিক করিডরের মাধ্যমে চীন তাদের ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমার, বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিম বঙ্গের সাথে যুক্ত করতে চায়। চীন তার বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এর মাধ্যমে ভারতকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলতে চায়। তিস্তা মহাপরিকল্পনা তাদের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভকেই প্রমোট করে যা কোনোভাবেই ভারত করতে দিতে চায়না। 

চার: তিস্তায় চীনের রাজনীতিটা কী?

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের যুক্ত হওয়ার মানে হচ্ছে চীনের অবস্থান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত স্পর্শ কাতর জায়গা শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেন নেকের খুব কাছাকাছি চলে আসা। শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেন নেকের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উত্তর পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্স রাজ্য গুলোর সাথে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ভারত ও চায়না তার এমন একটি স্পর্শ কাতর জায়গার কাছাকাছি চলে আসুক চীন! তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীন যুক্ত হওয়া মানে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির সাথে তার বন্ধন দৃঢ় হওয়া। তিস্তা মহাপরিকল্পনা যেহেতু ভারতের তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি না করার ফলে হচ্ছে তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীন যুক্ত থাকলে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী চীনপন্থি কমিউনিটি গড়ে উঠতে পারে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা চীনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা আরো চরম পর্যায়ে চলে যেতে পারে। ভারত এই কাজটা হতে দিতে চায় না। ফলে সে নিজেই তিস্তা মহাপরিকল্পনায় যুক্ত হওয়ায় প্রস্তাব নিয়ে আসছে। অর্থাৎ চীনের প্রস্তাব নিজের স্বার্থে ভারত বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, নাগরিক সমাজের এখন উচিত ভারতের ভণ্ডামির মুখোশটা খুলে দেওয়া, প্রশ্ন তোলা যে-ভাই তুমি আমার তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তিটা আগে করে দাও, তিস্তা মহাপরিকল্পনা করতে হবে না! 

পাঁচ: তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশের করণীয়? 

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় ভারতের যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব হাস্যকর। বিষয়টা এমন- একটা নদীকে মেরে পুকুর বানিয়ে দেওয়ার মতো, কাউকে খুন করে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো!জনগণের নির্বাচিত সরকার থাকলে আজ তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে চীন ভারতের সামনে একটা বড় বার্গেনিং টুল হিসাবে ব্যবহার করতে পারতো, দু দেশের কাছ থেকেই বাংলাদেশ বিশেষ সুবিধা আদায় করতে পারতো। কিন্তু এইটা এখন সম্ভব কী? কোনো অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানের যে যে রাজনীতি তাই ভূরাজনীতি। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশকে ভূরাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যাবে। কারণ এই মহাপরিকল্পনায় যুক্ত হওয়া চীন-ভারত উভয়ের জন্যই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই আগামী দিনের আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির কথা মাথায় রেখে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনকে যুক্ত করা উচিৎ। বাংলাদেশে সম্ভাব্য ভারতীয় আগ্রাসন টেকানোর এটা একটা অগ্রিম কৌশল হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ কি তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সে পথে হাঁটবে?

লেখক: সহ-সভাপতি, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ

ট্যাগ: ভারত
‎নিরাপদ খাবার পানি সরবরাহে রিভার্স ওসমোসিস প্লান্ট চালু করল…
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
আগামী সপ্তাহে তিন দিনের ছুটি পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
নওগাঁয় গ্যারেজে থাকা বাসের মধ্যে মিলল হেলপারের মরদেহ
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
স্কুল চলাকালীন যানজট নিরসনের উপায় খুঁজতে বললেন প্রধানমন্ত্রী
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
ভর্তি পরীক্ষা উপলক্ষে ৪ দিনের ছুটিতে ইবি
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
এপ্রিলেই শুরু হচ্ছে মেডিকেল-ডেন্টালের প্রথম বর্ষের ক্লাস
  • ৩১ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence