নরোদ নদী © টিডিসি ফটো
কখনো যে খাতে নদী বয়ে যেত, সেখানে এখন ফাটল ধরা শুষ্ক মাটি। রাজশাহীর পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত নরোদ নদীর বুকজুড়ে আজ এ দৃশ্যই বিরাজমান। কেউ জানে না—এই নদী একসময় ছিল জীবনের প্রতীক। মৌসুমি বৃষ্টিতে কোথাও কোথাও অল্প পানি জমলেও বছরের বেশিরভাগ সময়ই নদীটি মৃতপ্রায়।
নরোদ নদী পদ্মার একটি শাখা। এর উৎপত্তি রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্বে শাহপুর গ্রামের কাছে কাটাখালী দেওয়ানপাড়া ক্রসিং পার হয়ে। কিন্তু এখন পলি জমে ও মানবসৃষ্ট বাধায় নদীর প্রবাহ থেমে গেছে। অনেক জায়গায় নদীর জমি দখল করে তৈরি হয়েছে পুকুর, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আমবাগান।
নদী গবেষক ও “নরোদ নদী” গ্রন্থের লেখক অধ্যাপক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, “বর্ষাকালে নদীর কিছু অংশে সামান্য প্রাণ ফেরে, কিন্তু তা নদীটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। স্রোত না থাকায় পলি দ্রুত জমে যাচ্ছে। আমরা ধীরগতিতে একটি নদীর মৃত্যু প্রত্যক্ষ করছি।”
একসময় নরোদ নদী শাহপুর, পীরগাছা ও পাইকপাড়া হয়ে রাজশাহীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রবাহিত হতো। দিনে শতাধিক ডিঙি ও পান্থি নৌকা চলাচল করত। কৃষি, বাণিজ্য ও জীবনযাত্রার মূল ভিত্তিই ছিল এই নদী।
আরও পড়ুন: ঢাকার বাতাস আজ মাঝারি মানের, বিশ্বে অবস্থান ২১
অধ্যাপক মাহবুব বলেন, প্রাকৃতিক ও ভূতাত্ত্বিক কারণে নদীর অবনতি শুরু হয়েছিল বহু আগেই। ১৮২৩ সালের একটি ভয়াবহ বন্যা এবং ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের ফলে নদীর মুখে ব্যাপক পলি জমে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। তখন থেকেই নরোদের মৃত্যুর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সময়ের সঙ্গে নদীটি খণ্ডিত হয়ে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিরলদহা এলাকায় প্রায় ৩–৪ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন করা হলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান আনেনি।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন অবহেলার ফলে নদীর পাশের সরকারি জমি পলিতে ঢেকে আশপাশের জমির সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে। এতে বছরের পর বছর দখলদারদের হাত থেকে নদীর জমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
নরোদ পুনরুদ্ধারে প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ আছে কিনা জানতে চাইলে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূর হোসাইন নীরঝর বলেন, “নদীর অবস্থা সম্পর্কে আমরা অবগত এবং সম্ভাব্য পদক্ষেপ পর্যালোচনা করছি। তবে জমি দখল ও দূষণ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।”
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর জানান, “আমরা নরোদ নদীর কোনো খননকাজ করিনি। এটি বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) দায়িত্বে ছিল, যা ২০১৬ সালের দিকে পরিচালিত হয়।”
এ বিষয়ে বিএমডিএ’র নির্বাহী পরিচালক মো. তারিকুল আলম বলেন, “হ্যাঁ, কিছু অংশে ড্রেজিং করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্বল পরিকল্পনা ও পরবর্তী নজরদারির অভাবে খননের কয়েক মাসের মধ্যেই নদী আবার পলিতে ভরে যায়।”
নদী পরিবেশ গবেষক ড. আমিরুল ইসলাম বলেন, “নরোদ একা নয়—বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী আজ অস্তিত্ব হারানোর পথে। স্রোত না থাকলে নদী ড্রেনে পরিণত হয়। একটি নদী মারা গেলে সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয় এর জীববৈচিত্র্য, সংস্কৃতি ও স্থানীয় মানুষের জীবিকা।”
তিনি আরও বলেন, “নরোদের মতো নদীগুলোর শুকিয়ে যাওয়া কেবল পরিবেশগত সংকট নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়ও। নদীর তলদেশ শুকিয়ে যাচ্ছে, জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে, আর এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে হাজার বছরের সমাজ-সংস্কৃতি।”
নরোদকে বাঁচাতে চাইলে শুধু পলি খনন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ আইন বাস্তবায়ন এবং নদীকে তার স্বাভাবিক প্রবাহে ফিরিয়ে দেওয়ার বাস্তব উদ্যোগ। গবেষকদের ভাষায়, “আমাদের নদীগুলোকে আবার নদী হতে দিতে হবে।”