বাংলাদেশে ফোন করাই কাল হলো খুনি মাজেদের

১৫ এপ্রিল ২০২০, ০৬:১৭ AM
বঙ্গবন্ধুর খুনি আব্দুল মাজেদ ও প্রতীকী ফোন কল

বঙ্গবন্ধুর খুনি আব্দুল মাজেদ ও প্রতীকী ফোন কল © ফাইল ফটো

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যায় অংশগ্রহণের দায়ে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু কার্যকর করা খুনি মাজেদ ঢাকায় গ্রেপ্তারের আগে দেড় যুগেরও বেশি সময় বাস করেছেন কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের একটি ভাড়া বাড়িতে।

এমনকি তার চেয়ে বয়সে ৩২ বছরের ছোট এক নারীকে বিয়েও করেছিলেন তিনি। সেই সংসারে রয়েছে এক সন্তানও। ওই এলাকায় তাকে সবাই ইংরেজির মাস্টারমশাই হিসেবে চিনতেন। জানতেন সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে পড়াশুনা করেছেন মাস্টারমশাই।

গত তিন দিন কলকাতার দৈনিক বর্তমান পত্রিকা একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। সুজিত ভৌমিকের ওই প্রতিবেদনটির শেষ পর্ব ছিল আজ। তিন পর্বের ওই প্রতিবেদনটি একসঙ্গে তুলে ধরা হলো।

প্রথম পর্ব: মাস্টারমশাই পরিচয়ে টিউশন করে সংসার চালাতেন খুনি মাজেদ!
মহল্লা তাঁকে কখনও উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখেনি। হিংসা-বিবাদ তো দূর অস্ত! লোকটা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন নিয়ম করে। সেই তাদের মাস্টারমশাই নাকি বঙ্গবন্ধুর খুনি। এখনও ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না লকডাউনের পার্ক স্ট্রিট। এই পার্ক স্ট্রিটের বেডফোর্ড লেনের ভাড়া বাড়িতে থাকতেন বঙ্গবন্ধুর ঘাতক আব্দুল মাজেদ।

গত ৭ এপ্রিল বাংলাদেশের মীরপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি আব্দুল মাজেদ গ্রেপ্তারের পর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দেখে রীতিমতো অবাক পার্ক স্ট্রিটের বেডফোর্ড লেনের বাসিন্দারা।

কিন্তু আব্দুল মাজেদ নয়। পার্ক স্ট্রিট তাঁকে চেনে আলি আহমেদ ওরফে ইংরেজির মাস্টারমশাই হিসেবে। এলাকার লোকে জানত, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে থেকে পাশ করেছেন মাস্টারমশাই। টিউশন পড়িয়ে সংসার চালাতেন তিনি। প্রথমে তালতলার ভাড়া বাড়িতে একাই থাকতেন মাজেদ।

পরে পার্ক স্ট্রিটে চলে আসেন। ২০১১ সালে তাঁর থেকে ৩২ বছরের ছোট উলুবেড়িয়ার সেলিনা বেগমকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের ছ’বছরের এক মেয়ে রয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই বছর বাহাত্তরের মাজেদের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পিজি হাসপাতালে একপ্রস্থ পরীক্ষা নিরীক্ষাও হয়।

দিনটা ছিল গত ২২ ফেব্রুয়ারি। পিজি হাসপাতাল থেকে সেই রিপোর্ট আনতে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। সেটাই শেষ। আর বাড়ি ফেরা হয়নি মাজেদের। স্বভাবতই উদ্বিগ্ন স্ত্রী রাতে পার্ক স্ট্রিট থানায় মিসিং ডায়েরি করেন। তদন্তে শুরু করে পার্ক স্ট্রিট থানা। পিজি হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ তন্নতন্ন করে ঘাঁটলেও হদিস মেলে না মাজেদের।

এরপর পুলিশ মাজেদের ভাড়া বাড়ি থেকে একটি ব্যাগ পায়। সেই ব্যাগে তল্লাশি চালিয়ে সিম কার্ড, আধার কার্ড, ভোটার আইডি, ভারতীয় পাসপোর্ট এবং এক মহিলা সহ তিনজন শিশুর ছবি পাওয়া যায়। স্ত্রী সেলিনা পুলিশকে জানায়, ব্যাগের মতো তাঁর অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিসে কাউকে হাত দিতে দিতেন না মাজেদ।

মহল্লায় খুব একটা মেলামেশা করতেন না তিনি। টিউশনির পাশাপাশি বড়জোর এলাকার এক চায়ের দোকান, রেশন দোকান এবং এক বিল্ডার্সের দোকানে আড্ডা দিতেন মাজেদ। বাড়ির সদর দরজায় সব সময় তালা লাগানো থাকত। বাইরের কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হতো না। এক আধ বছর নয়, এভাবেই আঠারো-উনিশ বছর ডেরা বেঁধে কলকাতায় আত্মগোপন করেছিলেন আব্দুল মাজেদ।

২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা ৪ মিনিটে বেডফোর্ড লেনের বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আব্দুল মাজেদের যাত্রাপথের একাংশের সিসিটিভি ফুটেজ হাতে এসেছে পুলিসের। কী আছে সেই ফুটেজে?

দ্বিতীয় পর্ব: উধাও হওয়ার দিন মাজেদের পিছু নেওয়া ওরা কারা?
এক ঝলক দেখলে যে কেউ ভুল করে তাঁদের কাবুলিওয়ালা ভাববেন। ষণ্ডামার্কা চেহারা। গালে ঘন কালো চাপ দাড়ি। ব্যাক ব্রাশ করা চুল। একজনের পরনে ডেনিম জিন্স আর নীল ফুল হাতা টি-শার্ট। অন্যজনের গায়ে বড় চেক শার্ট। দু’জনের হাতেই মোবাইল ফোন।

সিসিটিভি’র ফুটেজ ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা ৪ মিনিটে বেডফোর্ড লেনের ভাড়া বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর একটি ওষুধের দোকানে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনি আব্দুল মাজেদ। সেখানে মিনিট আটেক কাটানোর পর ঠিক ১০টা ১২ মিনিটে যখন রিপন স্ট্রিটের দিকে মুখ করে ফের পথ চলতে শুরু করেন, তখন থেকেই তাঁকে অনুসরণ করা শুরু করে ওই দুই ব্যক্তি। পরে তাঁদের সঙ্গে আরও দু’জন যোগ দেন। মোট চারজন সেদিন পিছু নিয়েছিলেন মাজেদের। সিসিটিভি’র ফুটেজে সবার ছবিই ধরা আছে। তদন্তে নেমে পুলিশ ও এসটিএফ-এর অফিসাররা পিছু নেওয়া ওই ষণ্ডামার্কাদের কাবুলিওয়ালা ভেবে প্রথমে ভুল করেছিল। উল্লেখ্য, মাজেদ ছোটখাট সুদের কারবারও চালাতেন।

আলিমুদ্দিন স্ট্রিট ধরে এসে রাস্তা পার হয়ে এজেসি বোস রোডে আসেন মাজেদ। উদ্দেশ্য, বাস ধরা। গন্তব্য পিজি হাসপাতাল। এর পরের ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, ওই চারজন মাজেদের সঙ্গে কথা বলছে। তবে ক্যামেরা উন্নত না হওয়ায় কী কথা হয়েছিল, তা শোনার উপায় নেই। ঠিক তখনই মৌলালির দিক থেকে আসা একটি সল্টলেক-সাঁতরাগাছি রুটের বাসে উঠতে দেখা যায় মাজেদকে। যথারীতি সেই বাসে চাপেন ওই চারজনও। এরপর আর কোনও ফুটেজ নেই।

তদন্তে নেমে পুলিশ এজেসি বোস রোডের প্রতিটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখেছে। না, আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের বাস স্টপ থেকে পিজি হাসপাতাল পর্যন্ত কোথাও বাস থেকে নামতে দেখা যায়নি আব্দুল মাজেদকে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক সূত্র জানিয়েছে, মাজেদের মোবাইলের সর্বশেষ টাওয়ার লোকেশন ছিল মালদহ। যা থেকে গোয়েন্দাদের অনুমান, মাজেদকে ঘুরপথে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল হাওড়া স্টেশনে। সেখান থেকে ট্রেনে প্রথমে গুয়াহাটি। পরে শিলং হয়ে ডাওকি সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ যান তিনি। তবে তিনি স্বেচ্ছায় গিয়েছিলেন, নাকি বাধ্য করা হয়েছিল, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। মনে করা হচ্ছে, ট্রেন মালদহ স্টেশনের আশপাশে থাকাকালীন তিনি তাঁর মোবাইলটি একবার অন করেছিলেন।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়া ওই চারজন কারা? তাঁরা কি বাংলাদেশের কোনও গোয়েন্দা এজেন্সির অফিসার? সত্যিই এনিয়ে তদন্ত হাওয়া দরকার, বলছেন পার্ক স্ট্রিটের বাসিন্দারা।
কলকাতা পুলিশের অজান্তে কে বা কারা তুলে নিয়ে গেল মাজেদকে? কেননা, আইনত কোনও বিদেশি গোয়েন্দা এজেন্সি বিনা অনুমতিতে অন্য দেশে ঢুকে অভিযান চালাতে পারে না।

বাংলাদেশ সরকারিভাবে ৭ এপ্রিল জানিয়েছে, করোনার ভয়েই মার্চ মাসের শেষদিকে ভারত থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনি। বাংলাদেশের কাউন্টার টেররিজমের গোয়েন্দারা তাঁকে মিরপুর থেকে গ্রেপ্তার করেন।

এই যুক্তি অবশ্য ধোপে টিকছে না। কারণ ভারতে প্রথম করোনা আক্রান্তের খোঁজ মেলে ৩০ জানুয়ারি। তাও আবার দক্ষিণ ভারতের রাজ্য কেরলে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর খুনি লুকিয়ে ছিলেন কলকাতায়। এখানে করোনা ধরা পড়ে ১৮ মার্চ। ফলে ২২ ফেব্রুয়ারি মাজেদ কলকাতা থেকে বাংলাদেশে যাবেন কেন?
আব্দুল মাজেদের নিখোঁজ হওয়া থেকে বাংলাদেশে তাঁকে গ্রেপ্তার—গোটা পর্বই রহস্যে ঘেরা। সেই রহস্যের কি আদৌ কোনওদিন কিনারা হবে?

তৃতীয় ও শেষ পর্ব: বাংলাদেশে ফোন করাই কাল হলো মাজেদের
দুটি নম্বরে প্রতিদিন নিয়মিত ফোন করে বাংলাদেশে কথা বলতেন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী আব্দুল মাজেদ। নম্বর দুটি হল +৮৮০১৫৫২৩৮৭৯১৩ এবং +৮৮০১৭১১১৮৬২৩৯। সম্ভবত এই ফোনালাপই কাল হয়ে দাঁড়াল তাঁর জীবনে!

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের ধারণা, বাংলাদেশে মাজেদের পরিবারের সদস্যদের ফোনে নিয়মিত আড়ি পাততো সে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা। ফলে মাজেদ কোথায় লুকিয়ে রয়েছেন, সেই তথ্য সহজেই জেনে যায় তারা। এরপরই মাজেদকে গ্রেপ্তারের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়। তবে কলকাতা শহরে মাজেদের অবস্থান জানতে খুব সম্ভবত ভারতের কোনও গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্য নিয়েছিলেন বাংলাদেশের গোয়েন্দারা।

যদিও এ নিয়ে কোনও সরকারই মুখ খোলেনি। তদন্তে জানা গিয়েছে, কলকাতায় মাজেদ যে দুটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন, তার একটিও নিজের নামে ছিল না। তিনি স্ত্রীর নামে সিম কার্ড কিনেছিলেন।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন হওয়ার পর রাতারাতি দেশ ছেড়েছিলেন মাজেদ। সেই সময় ভারত হয়ে লিবিয়া ও পাকিস্তানে যান তিনি। কিন্তু সুবিধা করতে না পারায় সেখান থেকে কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় কি কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির সাহায্য পেয়েছিলেন মাজেদ? সঙ্গত কারণেই এই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে গোয়েন্দাদের মনে। তাঁর পার্ক স্ট্রিটের ভাড়া বাড়ি থেকে ভারতীয় পাসপোর্ট পাওয়া গেছে।

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক সূত্র জানিয়েছে, ২০১৭ সালে ওই পাসপোর্ট বানানো হয়েছে। নিয়ম মেনে পার্ক স্ট্রিট থানা পুলিস ভেরিফিকেশন করার পর পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে। পাসপোর্টে জন্মস্থান হিসেবে হাওড়া উল্লেখ করা হয়েছে। সত্যি কথা বলতে কী, ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের সব কাগজপত্রই ছিল মাজেদের। আধার কার্ডও বানিয়েছেন অনায়াসে। তাঁর আধার কার্ড নম্বর হল ৭৯৪১ ৯৫৯১ ২৮৬৪। এছাড়াও ২০১২ সালে মাজেদ সচিত্র ভোটার কার্ড বানিয়েছিলেন।

মাজেদের স্ত্রী সেলিনা ওরফে জরিনা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে চলতেন মাজেদ। এমনকি খেতে দিতে সামান্য দেরি হলে রেগে আগুন হয়ে যেতেন তিনি।

মাজেদ নিখোঁজ রহস্যের তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা সিসিটিভির ফুটেজ খতিয়ে দেখে নিশ্চিত হয়েছেন যে, বেডফোর্ড লেনের বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তাঁকে কেউ জোর করে অপহরণ করেনি। তেমন হলে চিৎকার কিংবা ধস্তাধস্তির প্রমাণ থাকত। তাছাড়া একজন হলেও প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যেত। এর মানে মাজেদ স্বেচ্ছাতেই ওই চার ষণ্ডামার্কা লোকের সঙ্গে গিয়েছিলেন। তবে কি সেদিন মাজেদের পরিচিত কাউকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন গোয়েন্দারা?

গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন, এমনিতে সুদের কারবার ও টিউশনির টাকায় সংসার চললেও সম্প্রতি তালতলা এলাকায় ২৫ লাখ টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট বুক করেছিলেন মাজেদ। গোয়েন্দারা মনে করছেন, সম্ভবত বাংলাদেশ থেকে টাকা আসত মাজেদের কাছে। কিন্তু সেই ফ্ল্যাটে আর পা দেওয়া হল না তাঁর। তার আগেই ফাঁসিকাঠে নিথর হলেন তিনি। (শেষ)- বর্তমান

ঈদযাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন হাসনাত আবদুল্লাহ
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ভোলার ইলিশা ঘাটে চরম পরিবহন সংকট, ভাড়া গুণতে হচ্ছে ৫-৬ গুণ
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ভোলায় সিএনজি-পিকআপ সংঘর্ষে প্রাণ গেল চালকের, আহত ৫
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বাড়তি ভাড়ায় ভোগান্তি যাত্রীদের
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভাবির দায়ের কোপে দেবর নিহত
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ঈদের আনন্দ এবং আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence