পাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব নতুন আশা, স্বপ্ন আর আনন্দের এক উজ্জ্বল প্রতীক। একসময় গ্রামবাংলার মাঠে-ঘাটে কিংবা শহরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে মেলা, গান, নৃত্য আর পান্তা-ইলিশের আয়োজনে মুখর হয়ে উঠত পুরো দিনটি। উৎসব যেন ছড়িয়ে পড়ত প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। তবে সময়ের পরিক্রমায়, বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এ আয়োজনের জৌলুস কিছুটা ম্লান হয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আগ্রহের ঘাটতি এর পেছনে প্রভাব ফেলছে। তবুও নববর্ষ তার চিরায়ত আবেদন হারায়নি। নতুন প্রজন্ম, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টায় উৎসবটি এখনও প্রাণবন্ত ও আশাব্যঞ্জক।
বাংলা নববর্ষ আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ যা আমাদের শেকড়ের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তাই এ ঐতিহ্যকে লালন করা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে তা সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া আমাদের সকলের দায়িত্ব। এবারের নববর্ষকে ঘিরে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষার্থীদের ভাবনা, প্রত্যাশা ও অনুভূতির কথা জানিয়েছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. অলিভ বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে আনন্দ, ঐতিহ্য ও নতুন সূচনার প্রতীক। এ দিনে মানুষ পুরনো কষ্ট ভুলে নতুন আশায় এগিয়ে যায় এবং গ্রাম-শহরে উৎসব, মেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে উদযাপন করে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ দিনটি হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত—শোভাযাত্রা, গান, নাচ, মুখোশ, মেলা ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় সম্প্রীতি, ঐক্য ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক অনন্য।
ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক এন্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী কামিল আহমেদ বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের কাছে শুধু উৎসব নয়, নতুন করে শুরু করার প্রেরণা। নবান্নের মতোই এটি নতুনত্বের বার্তা বহন করে, যেখানে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী, সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত, যে সংস্কৃতির সঙ্গে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষও নিজেদের সম্পৃক্ত মনে করে। একজন পাবিপ্রবি শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রত্যাশা, এই বর্ষবরণ আমাদের ভেতরে সুনাগরিক হওয়ার দায়বদ্ধতা জাগিয়ে তুলবে, যাতে আমরা দেশটিকে আগামী প্রজন্মের জন্য আরও সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করে গড়ে তুলতে পারি। একই সঙ্গে সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতি যেন মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে দাঁড়াতে পারে, এই হোক নতুন বছরের অঙ্গীকার।
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ইনজামামুল হক বলেন, বর্ষবরণ আমার কাছে শুধুই একটি দিনের উৎসব নয়; এটি আমাদের বাঙালি পরিচয়, আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এ দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কারা, আমাদের শেকড় কোথায়। তবে আমি বিশ্বাস করি, এই চেতনাটা শুধু একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বাঙালি সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ুক সার্বজনীনভাবে দেশের প্রতিটি প্রান্তে, প্রতিটি মানুষের মাঝে। আমরা যেন শুধু পহেলা বৈশাখেই নয়, বরং সারা বছরজুড়ে আমাদের সংস্কৃতিকে ধারণ করি আমাদের কথা, কাজ ও জীবনযাপনের মাধ্যমে।
গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী রাইসা আমিন বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতির এক প্রাণের উৎসব; যেখানে ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলিত হয় নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আনন্দে। পহেলা বৈশাখ এই উৎসব আমাদের ইতিহাস, শেকড় ও বাঙালিয়ানাকে নতুন করে সকলের মাঝে জীবন্ত করে তোলে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ উৎসব মহাসমারোহে উদযাপিত হলেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তা এখনও কাঙ্ক্ষিত পূর্ণতায় পৌঁছাতে পারেনি। গত বছর স্বল্প সময়ের প্রস্তুতিতে সীমিত পরিসরে আয়োজন করা হলেও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা একটি সুশৃঙ্খল ও নান্দনিক বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় আকারের আয়োজন তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় এমন একটি বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হতে পারে সবার জন্য আনন্দ, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক অনন্য উপলক্ষ যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সবাই একসঙ্গে বাংলা নববর্ষকে আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্তরিক সহযোগিতা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এমন একটি আয়োজন বাস্তবায়ন করা নিঃসন্দেহে সম্ভব।
স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী আবিদ আজাদ বলেন, বাংলা সংস্কৃতির অংশ হিসেবে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মত না হোক কিছুটা হলেও উদযাপন করা। যেখানে প্রত্যেকটা বিভাগের স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ থাকবে। কেন্দ্রীয় ভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালিত হবে, সকল সংগঠন গুলোর স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণ থাকবে।
নবীন শিক্ষার্থী কণিকা দেবনাথ বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান উৎসব, যা নতুন বছরের সূচনা ও আনন্দের বার্তা বহন করে। এ দিনটি আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও নিজস্ব পরিচয়কে আরও দৃঢ় করে তোলে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ উৎসব উদযাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন গড়ে তোলে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান, নৃত্য ও মেলার মাধ্যমে সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি, নতুন প্রজন্মের মাঝে বাঙালিত্বের চেতনা জাগিয়ে তুলতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে পারি, যা আমাদের সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করে।