জার্মানি: স্বপ্ন, শৃঙ্খলা ও সম্ভাবনার এক বাস্তব ঠিকানা

০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১১ PM
মিজানুর রহমান সিনহা ও জার্মানের একটি পর্যটন এলাকা

মিজানুর রহমান সিনহা ও জার্মানের একটি পর্যটন এলাকা © টিডিসি সম্পাদিত

জার্মানি, হাজারো তরুণ-তরুণীর স্বপ্নের দেশ। অনেকের কাছে এটি কেবল একটি উন্নত রাষ্ট্র নয়, বরং সম্ভাবনার এক নতুন দরজা। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অনিশ্চয়তা এবং নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একদিন যখন ভিসা হাতে আসে, তখন সেটি সত্যিই সোনার হরিণ পাওয়ার মতো মনে হয়।

আমার নিজের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে। প্রায় নয়শো চল্লিশ দিন অপেক্ষার প্রহর গুনার পর অবশেষে জার্মানির ভিসা হাতে পাই। করোনার পর থেকে জার্মান দূতাবাসের ভিসা প্রক্রিয়া অনেকটাই ধীর হয়ে গিয়েছিল। ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় অপেক্ষার মধ্যে ছিল। তবে নতুন রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে এবং এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষার্থী জার্মানিতে আসার সুযোগ পাচ্ছে।

আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের তরুণদের জন্য উন্নত কোনো দেশে যাওয়ার পথ খুব বেশি খোলা থাকে না। সাধারণত দুটি পথই বেশি দেখা যায়, একটি উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে, আরেকটি অর্থনৈতিক সামর্থ্যের জোরে। কিন্তু মধ্যবিত্ত বা সাধারণ পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং সম্মানজনক পথ।

এই জায়গায় এসে জার্মানি অনেকের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়। কারণ এখানে তুলনামূলকভাবে খুব কম খরচে বা প্রায় বিনা টিউশন ফিতে বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা অর্জন করা যায়। পাশাপাশি পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার সুযোগও রয়েছে। বিশেষ করে যারা দেশ থেকেই কিছুটা জার্মান ভাষা শিখে আসে, তাদের জন্য কাজ খুঁজে পাওয়া তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়। ফলে একজন শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান গড়ে নিতে পারে।

তবে জার্মানিকে শুধু সুযোগের দেশ বললে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এই দেশের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে এর সামাজিক শৃঙ্খলা এবং আইনের প্রতি মানুষের গভীর শ্রদ্ধার মধ্যে। এখানে প্রতিদিনের জীবনের ছোট ছোট বিষয়েও সেই সচেতনতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

ধরা যাক রাস্তা পারাপারের বিষয়টি। জার্মানির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট সিগন্যাল থাকে। লাল বাতি জ্বললে কেউ রাস্তা পার হয় না, এমনকি রাস্তা সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকলেও না। মানুষ ধৈর্য ধরে সবুজ সংকেতের অপেক্ষা করে। কারণ তারা জানে, নিয়ম মানা মানেই নিজের এবং অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

গণপরিবহনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দায়িত্ববোধ দেখা যায়। বাস, ট্রাম বা ট্রেনে ওঠার আগে যাত্রীদের নিজ দায়িত্বে টিকেট কিনতে হয়। অনেক সময় কোনো চেকিংও থাকে না। তাত্ত্বিকভাবে কেউ চাইলে টিকেট না কেটেও যাতায়াত করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে মানুষ তা করে না। কারণ এখানে নিয়ম ভাঙাকে সামাজিকভাবে অসম্মানজনক মনে করা হয়। মানুষের এই আত্মসচেতনতা এবং দায়িত্ববোধই পুরো ব্যবস্থাকে কার্যকর করে রেখেছে।

জার্মান সমাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী ও পুরুষের সমান অধিকার এবং নিরাপত্তা। এখানে নারী-পুরুষ উভয়েই সমান মর্যাদা ও স্বাধীনতা ভোগ করে। একজন নারী দিন বা রাত-যেকোনো সময় নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারেন। পথে কেউ এসে বিরক্ত করবে বা পথ আটকাবে, এমন আশঙ্কা খুবই কম। 

রাস্তাঘাট, গণপরিবহন কিংবা কর্মক্ষেত্র, সব জায়গায়ই নারীর প্রতি সম্মান এবং নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। একইভাবে চুরি, ছিনতাই বা হয়রানির ঘটনাও তুলনামূলকভাবে খুব কম। মানুষের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করার সংস্কৃতি ছোটবেলা থেকেই গড়ে তোলা হয়।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও জার্মানিতে রয়েছে নানা সুযোগ। জার্মান ভাষায় বি১ (B1) পর্যায়ের সনদ থাকলে অনেকেই আউজবিল্ডুং প্রোগ্রামের মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে জার্মানিতে আসতে পারেন। এটি এমন একটি পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা যেখানে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মাসিক ভাতাও দেওয়া হয়। এছাড়া বর্তমানে অপরচুনিটি কার্ড বা জব সার্চিং ভিসার মাধ্যমেও দক্ষ কর্মীরা জার্মানিতে এসে কাজ খোঁজার সুযোগ পাচ্ছেন।

জার্মানিতে বর্তমানে দক্ষ কর্মীর বড় ধরনের সংকট রয়েছে। অথচ আমাদের দেশের সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এই বিশাল শ্রমবাজারের সুযোগ আমরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছি না। আমাদের শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ এখনো মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। কিন্তু যদি সরকারিভাবে জার্মান ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে এটি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশে ‘শিক্ষিত বেকার’ শব্দটি আজ খুব পরিচিত। অনেক তরুণ মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পরও একটি ছোট চাকরির জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেন। অনেক সময় যে বেতন পাওয়া যায়, তা দিয়ে বর্তমান সময়ে জীবনযাপন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ এই শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে যুক্ত করা গেলে দেশের অর্থনীতি অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারত।

জার্মানিতে পড়তে আসার ক্ষেত্রে যে অর্থের প্রয়োজন হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ হলো ব্লকড অ্যাকাউন্টের টাকা। এই অর্থ মূলত শিক্ষার্থীর জীবনযাপনের খরচের নিশ্চয়তা হিসেবে জমা রাখা হয়। কিন্তু এখানে আসার পর এক বছরের মধ্যেই সেই অর্থ ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারে। পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ থাকায় একজন শিক্ষার্থীর জন্য খুব দ্রুত নিজের অবস্থান গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা অনেক দেশের ক্ষেত্রে প্রতি সেমিস্টারে বিপুল পরিমাণ টিউশন ফি দিতে হয়। সেই অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী কঠিন আর্থিক চাপে পড়ে যায়। কিন্তু জার্মানিতে সেই চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, জার্মানি শুধু একটি উন্নত রাষ্ট্র নয়; এটি এমন একটি সমাজ যেখানে শৃঙ্খলা, আইনমান্যতা, সুযোগ এবং মানবিক মূল্যবোধ একসঙ্গে কাজ করে। আর সেই কারণেই পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে তরুণরা এখানে এসে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখে।

দীর্ঘ অপেক্ষা, নানা বাধা এবং অনিশ্চয়তার পর যখন এখানে এসে দাঁড়ানো যায়, তখন মনে হয় পথটা কঠিন ছিল ঠিকই, কিন্তু অসম্ভব ছিল না। আর সেই অভিজ্ঞতাই নতুন করে বিশ্বাস জাগায়, সুযোগ যদি থাকে, পরিশ্রম এবং ধৈর্য থাকলে পথ একদিন ঠিকই খুলে যায়।

আমি বলাবো না জার্মানি এসেই কেউ রাতারাতি কিছু করতে পারবে, তবে এ টুকু আশ্বাস দিতে পারি যে, ভালো কিছু করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, যেটা দেশে বসে চিন্তাই করা যায়না। আর হ্যাঁ, এদেশে যে খারাপ দিক নাই এমন নয়, আছে, কিন্তু সেটা আমাদের দেশের তুলনায় অনেক কম। এখানে পশু পাখির যে সুরক্ষা,  সেটা পৃথিবীর পিছিয়ে পড়া অনেক দেশের মানুষের চেয়েও অনেক বেশি।

মিজানুর রহমান সিনহা

লেখক ও শিক্ষার্থী, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ ডার্মস্টাড, জার্মান

ট্যাগ: জার্মান
ঘুরতে গিয়ে তীর ধসে নদীগর্ভে ৫ বন্ধু, নিখোঁজ ২
  • ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফেনীতে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে গ্রেপ্তার ২২
  • ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১০ম গ্রেডের চাকরি পিএসসির বদলে নিজস্ব কমিটি দিয়ে নিয়োগের উ…
  • ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১ লাখ ১০ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দিল সরকার
  • ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেঘমল্লার বসুর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে: এনপিএ
  • ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কারিগরি শিক্ষক বদলির সফটওয়্যারের ‘মন্তব্য’ ঘরে দুই শতাধিক অ…
  • ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9