টিডিসি সম্পাদিত © সংগৃহীত
সকালে প্রশিক্ষণ, দিনে প্রশিক্ষণ এবং রাতে প্রশিক্ষণ। যেই সরকারই আসুক, শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের শুধু প্রশিক্ষণ দিতে চায়। বড় অ্যামাউন্টের বাজেট বরাদ্দ করা হয়। প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন অসম্ভব, চেয়ারে বসা মাত্রই শিক্ষামন্ত্রণায় সংশ্লিষ্ট সবাই মাথায় এই চিন্তাধারা গেঁথে নেন।
এবারও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীকে এসব বুদ্ধি কে দেয়, তা জানতে মন চায়। তিনি কি এমন সিস্টেম করতে চান, যেন ফিউচারে মেধাবী কেউ শিক্ষকতা পেশায় আসতে না পারে। ফলে প্রতিবছর ধাপে ধাপে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ থাকবে। প্রশিক্ষণ দেওয়া ভালো, তবে শিক্ষার মানোন্নয়নের যেকোনো প্রশ্নেই প্রশিক্ষণ–এই থিয়োরি শিক্ষামন্ত্রীর মাথায় কে দিয়েছে?
শিক্ষকদের ট্যাব দেবেন, এটা ভালো সিদ্ধান্ত। অনেক শিক্ষক কম্পিউটারের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছে, কোনো লাভ হয়নি। কারণ সবার নিজস্ব ল্যাপটপ ছিল না। যা শেখানো হয়েছে, চর্চার অভাবে সবাই তা ভুলে গিয়েছে। বলতে গেলে, সরকারের লস প্রজেক্ট ছিল এইসব প্রশিক্ষণ। তাই ট্যাব দিচ্ছে, এজন্য সরকার ধন্যবাদ পেতে পারে।
শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন করলে, শিক্ষকতাকে আকর্ষণীয় করলে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই পেশায় আসবে, শিক্ষার্থীরা মেধাবী শিক্ষক পাবে। মনে হয়–এই জ্ঞান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই। তারা গাড়িতে তেল দেবে না, তবে হালাকা টাকা দিয়ে মানুষ ভাড়া করে গাড়ি ধাক্কা দিয়ে রাস্তা পার করাতে চায়। তা ছাড়া সিংহ নিয়োগ দেবে না, গাধা নিয়োগ দিয়ে টাকা খরচ করে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে সিংহ বানাতে চায়, খুবই হাস্যকর চিন্তাধারা। ধাক্কা দিয়ে রাস্তা পার করা যাবে কত দূর? আর মাসের পর মাস প্রশিক্ষণ দিলে গাধা কি সিংহ হবে? জাতির দুঃখ আর দূর হবে না।
রাত পোহালে একজন শিক্ষক চিন্তা করে বাজার-সদাই নিয়ে, চিন্তা করে পরিবারের চিকিৎসা খরচ নিয়ে, ঈদ এলে চিন্তা করে নতুন জামাকাপড় নিয়ে, কাউকে ভ্রমণে দেখলে চিন্তা করে নিজের পরিবার কীভাবে ভ্রমণ করবে–এসব চিন্তাধারা থেকেই কোচিং/টিউশনির প্রতি সবাই ঝঁকে পড়ে। আর যাদের টিউশনি করার সুযোগ নেই, তারা ঝুঁকে পড়ে অন্য কোনো পেশায়। ফলে একজন শিক্ষক পেশায় শিক্ষক হলেও নেশা হিসেবে গ্রহণ করে টাকা ইনকাম করার অন্য কোনো সোর্স। একজন শিক্ষক শিক্ষকতা পেশায় সর্বোচ্চ সময় দিতে চায় আর এই ব্যবস্থা কে করবে?
যখন-তখন প্রশিক্ষণ থিওরি অ্যাপ্লাই না করে এমন শিক্ষক নিয়োগ দিন, যেন অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ না দিতে হয়। আর পে স্কেলে শিক্ষকদের নির্দিষ্ট সময়ে অন্তর্ভুক্ত করা এবং নির্দিষ্ট সময়ে বেতন-ভাতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের টাকা শিক্ষকদের ভ্রমণ ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, ঈদ বোনাস ইত্যাদি ক্ষেত্রে এড করে দিন। শিক্ষকদের জীবনমান এমনভাবে নিশ্চিত করুন, যেন তারা শিক্ষকতা ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা না করতে পারে। ফলে যখন-তখন প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে এবং শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা এসে এমনভাবে টিচিং দেবে, নকল করার ভাবনা আর শিক্ষার্থীদের মাথায় আসবে না।
লেখক: শিক্ষক, গীতিকার ও শিক্ষাবিদ