ফেল করা ৭ লাখ শিক্ষার্থীর সামনে কী সুযোগ, কীভাবে শিক্ষাজীবনে এগোবে—প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার

১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৯ PM , আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৯ PM
ইমরান হোসেন

ইমরান হোসেন © টিডিসি সম্পাদিত

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। উত্তীর্ণ হতে পারেনি ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এ বছর পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট।

ফল প্রকাশের পর অনেক পরিবারে আনন্দ এসেছে, আবার অনেক শিক্ষার্থী ও পরিবার হতাশ হয়েছে। যারা ভালো ফল করেছে, তাদের অভিনন্দন। যারা প্রত্যাশিত ফল পায়নি, তাদের নিয়েও ভাবতে হবে। প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি। তাদের সামনে কী সুযোগ রয়েছে এবং কীভাবে তারা পরবর্তী শিক্ষাজীবনে এগোবে, এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার।

পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষার্থীর অর্জন পরিমাপ করে। কিন্তু একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক যোগ্যতা বা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না। কোনো বিষয়ে কম নম্বর পাওয়া কিংবা একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া মানেই সম্ভাবনার শেষ নয়। মানুষের আগ্রহ ও দক্ষতা সময়ের সঙ্গে বদলায়। সুযোগ ও পরিশ্রম একজন শিক্ষার্থীর পথও বদলে দিতে পারে।

বিশ্বের সফল মানুষের জীবনেও শিক্ষাজীবনে বাধা এসেছে। চীনের উদ্যোক্তা জ্যাক মা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় গণিতে মাত্র ১ নম্বর পেয়েছিলেন এবং একাধিকবার ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থ হন। পরে তিনি আলিবাবা প্রতিষ্ঠা করেন। অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস কলেজের পড়াশোনা শেষ করেননি। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসও হার্ভার্ডের পড়াশোনা শেষ করেননি।

এসব উদাহরণের অর্থ এই নয় যে পরীক্ষায় খারাপ করাই সাফল্যের পথ। শিক্ষা হলো, একটি ফলাফলকে মানুষের সম্ভাবনার শেষ সীমা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও নতুন করে চেষ্টা করার সুযোগ থাকলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

আমার নিজের অভিজ্ঞতাতেও এর একটি উদাহরণ রয়েছে। ২০০৪ সালে যশোরের আকিজ উদ্দিন হাইস্কুলে দশম শ্রেণির গণিত পরীক্ষায় আমি ৩৬ নম্বর পেয়েছিলাম। ওই ফলের কারণে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়েও সতর্ক করা হয়েছিল। কয়েকজন শিক্ষক তখন পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। 

শেষ পর্যন্ত যশোর শিক্ষা বোর্ডের মানবিক বিভাগে এ প্লাস পাওয়া আটজন শিক্ষার্থীর একজন এবং ওই বিভাগে দেশসেরা ৪৭ জনের একজন হয়েছিলাম। যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের হুমায়ুন নামে পরিচিত এক শিক্ষার্থীও একবার অকৃতকার্য হওয়ার পর পরের বছর বোর্ড স্ট্যান্ড করেছিল। পরে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়াশোনা শেষ করে ব্যাংকিং পেশায় যুক্ত হয়েছে।

ব্যক্তিগত এসব অভিজ্ঞতা একটি বিষয় বোঝায়—একবার পিছিয়ে পড়লে সেখান থেকে ফিরে আসার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। যারা এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তাদের সামনে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার বিভিন্ন পথও তাদের জন্য উন্মুক্ত। কারিগরি ও অন্যান্য শিক্ষাপথ সম্পর্কে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের তথ্য দেওয়া দরকার। 

কোন পথে একজন শিক্ষার্থী এগোবে, তা নির্ধারণে শুধু ফল নয়, তার আগ্রহ ও সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। ফলাফল নিয়ে কোনো শিক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন থাকলে পুনঃপরীক্ষণের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। এসএসসি ও সমমানের ফলাফলে পুনঃপরীক্ষণের জন্য আবেদন করা শিক্ষার্থীদের খাতা যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। 

কোনো ভুল বা ত্রুটি ধরা পড়লে তা সংশোধনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। ভালো পরীক্ষা দেওয়ার পরও কোনো কোনো শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল নাও পেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তাই ফলাফল নিয়ে সংশয় থাকলে নিয়ম মেনে পুনঃপরীক্ষণের সুযোগ শিক্ষার্থীদের আস্থা বাড়াতে পারে।

একই সঙ্গে ‘ফেল’ শব্দটিকে শিক্ষার্থীর পরিচয় বানানো ঠিক নয়। একজন শিক্ষার্থী পরেরবার পরীক্ষায় ভালো করতে পারে। কেউ আবার নিজের আগ্রহ ও সক্ষমতা অনুযায়ী অন্য শিক্ষাপথ বেছে নিতে পারে। ফল প্রকাশের পর তাই শিক্ষার্থীকে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে জানানো জরুরি।

ফল প্রকাশের সময় পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যাশিত ফল না পেলে একজন শিক্ষার্থী হতাশ হতে পারে। তখন অন্যের সঙ্গে তুলনা বা অপমান না করে কোথায় ঘাটতি হয়েছে এবং কীভাবে তা পূরণ করা যায়, তা নিয়ে কথা বলা উচিত।

আরও খবর: এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ, পাসের হার কমেছে ৬.২ শতাংশ

২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার কয়েকটি ঘটনা আলোচনায় এসেছিল। এসব ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তবে ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত চাপ ও ব্যর্থতার ভয় কোনো কোনো শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই ফল প্রকাশের সময় শিক্ষার্থীদের পাশে থাকা প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার জন্য সব বিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ করা সম্ভব না হলেও উপজেলা পর্যায়ে বা কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিয়ে ক্লাস্টারভিত্তিক কাউন্সেলিং সেবা চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিত করার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু এ প্লাসের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীর উন্নতি, ঝরে পড়া রোধ এবং শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত শিক্ষাপথে পৌঁছে দেওয়াও সাফল্যের অংশ। প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি। তাদের প্রত্যেকের পরিস্থিতি আলাদা। কেউ পুনরায় পরীক্ষা দেবে, কেউ দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার পথে যাবে। তাই সবার জন্য একই সমাধান নয়; প্রয়োজন পরিস্থিতি অনুযায়ী তথ্য, পরামর্শ ও সুযোগ।

ফলাফল একটি মাপকাঠি, পরিচয় নয়। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের সামনে যেমন নতুন দায়িত্ব, তেমনি প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদেরও নতুন করে চেষ্টা করার সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব শুধু ফল প্রকাশ করা নয়; ফলের পর শিক্ষার্থী কীভাবে এগোবে, সেই পথও দেখানো। একটি পরীক্ষার ফল একজন শিক্ষার্থীর বর্তমান অবস্থান জানাতে পারে, তার পুরো ভবিষ্যৎ নয়। তাই ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর সামনে পরবর্তী পথ খোলা রাখতে হবে। একটি ফলাফল কখনোই একটি জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।

লেখক: সিনিয়র সহকারী পরিচালক
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)

এসএসসিতে উত্তীর্ণদের অভিনন্দন, অনুত্তীর্ণদের প্রতি সহমর্মিত…
  • ১০ আগস্ট ২০২৬
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন ভারতের হাইকমিশনার…
  • ১০ আগস্ট ২০২৬
গোপালগঞ্জে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ গেল পথচারীর
  • ১০ আগস্ট ২০২৬
মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতনের ফাইল চূড়ান্ত, পাবেন যেদিন
  • ১০ আগস্ট ২০২৬
সর্বোচ্চ বহিষ্কার মাদ্রাসায়, সর্বনিম্ন কোন বোর্ডে
  • ১০ আগস্ট ২০২৬
এসএসসির ফল নেওয়া হলো না প্রদীপের
  • ১০ আগস্ট ২০২৬