সংস্কার মানে বিদ্যমান ব্যবস্থাতন্ত্রে কিছু লোকের স্বার্থে আঘাত

২৬ মার্চ ২০২৬, ০১:০৫ AM
ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ

ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ © ফেসবুক থেকে নেওয়া

সংস্কার বড়ো কঠিন বিষয়। সংস্কার মানেই বিদ্যমান ব্যবস্থা তন্ত্রে কিছু লোকের স্বার্থে আঘাত। সংস্কার তাই কেউ ধারণ করে না। আপনি সংস্কার করতে গেলেই ব্যবসায়ী, টেন্ডারবাজ, কনসাল্ট্যান্ট ও তার ভেন্ডর/সাপ্লায়ার, প্রশাসনের কেউ এমনকি সাংবাদিক সবাই আপনার শত্রু হবে। দুর্নীতি, অপব্যবস্থাপনা রোধ করতে সংস্কার করবেন, উল্টা আপনি গালি খাবেন দুর্নীতিবাজ হিসেবে।

ফাওজুল কবির খান স্যার মেয়াদোত্তীর্ণ বাস স্ক্র্যাপ করার উদ্যোগ নিলেন। এক শহর থেকে অন্য শহরে নেয়া না, সরাসরি ডাম্পিং ও স্ক্র্যাপ করা। পরিবেশ উপদেষ্টা, সিটি কর্পোরেশনের কাছে জায়গা চাওয়া হলো। নিজে দুটা আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। মালিক সমিতির শীর্ষ প্রতিনিধি ছিলেন, পরিবহণ শ্রমিক নেতারা ও অনেকের প্রতিনিধি ছিলেন, বহু সচিব ছিলেন, বাংলাদেশ পুলিশ ও ডিএমপি প্রতিনিধিগণ ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিধি, এফআইডি সচিবও। হাই লেভেল রিপ্রেজেন্টেটিভ যাকে বলে।

উদ্দেশ্য, ক্রাইটেরিয়া সেট হবে, তার ভিত্তিতে পুনরায় ফিটনেস আনা যাবে না এমন পুরানো, মেয়াদোত্তীর্ণ বাস স্ক্র্যাপ করা হবে। ক্ষতিপূরণে মালিকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হবে। মালিক সমিতির শীর্ষ নেতৃত্ব হিসেবে শিমুল ভাই সায় দিলেন। কিন্তু অন্যরা তেমন রাজি না। ইনসিওরেন্স ব্যবস্থা মানবে না, (ইনসিওরেন্স কোম্পানিগুলা ক্লেইম সেটেল করে না, সত্য, উনারা ভুক্তভোগী)। কিন্তু দিনশেষে এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে মিটিং হট্টগোল, মিটিং শেষ। মূল বিষয়ে আলোচনা আগালো না। অথচ এত ডাইভার্স স্টেকহোল্ডারদের সবাইকে একত্র করা বিশাল হ্যাপা। অন্যদিনের মিটিং এও অন্য আরেক ইস্যু এনে মূল ইস্যু থেকে সরে যাওয়া হলো।

একদিন, ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়েও হাই প্রোফাইল মিটিং হলো। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান পদ্ধতি ভয়ানক ত্রুটিপূর্ণ, সবাই একমত। হ্যান্ডস ওন প্র্যাকটিস, ড্রাইভিং রুলস, সাইন, হ্যাজার্ড, প্রটেকশন, প্রায়োরিটি, ব্রেক, সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট এগুলো সব কিছুর পরীক্ষা নাই। কয়েকটা সাইন শিখিয়ে, হাত চল্লিশেক লম্বা, ড্রাইভিং ট্র্যাকে টেস্ট দিয়ে লাইসেন্স দিলে, সে রাস্তায় নেমে ৪০ জনকে মারবে এটাই স্বাভাবিক। সবাই মানলো, সেমতে গ্যান্ট চার্ট করা হলো। (ঐ বিভাগে কেউ গ্যান্ট চার্ট আগে করেনি!)। কারিকুলাম ডেভেলপ এই কমিটি হল। আমাকে ইনপুট দিতে বলা হলো, তাৎক্ষণিক রাইট-হ্যান্ড ড্রাইভিং এক্সাম টেস্টের হ্যাজার্ড প্রটেকশন ও প্রায়োরিটির গ্রাফিক্যাল বুক ডাউনলোড করে কর্মকর্তাকে দিলাম। ডকুমেন্টটা বুঝে পাইসে কি পায় নাই, প্রাপ্তি স্বীকার টুকুও করলেন না। বিধিমালা চেঞ্জ করে জেলায় জেলায় ড্রাইভিং স্কুল গুলাকে মানসম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হল। কাজ ভাগ করে দিলো, টিম করে দিলো। কয়েক সপ্তাহ পরে উপদেষ্টা মহোদয় আফসোস করলেন।

মোটরগাড়ির ফিটনেস যাচাই ব্যবস্থা ঠিক নাই, বক্তব্য তোলার পরে সবাই মোটামুটি এগ্রি করলো। ফিটনেস ও ইন্সপেকশন ক্রাইটেরিয়া ঠিক হবে। সেমতে প্রতি উপজেলাতে প্রাইভেট সেক্টরে এক বা একাধিক মোটরভেহিকল ইন্সপেকশন সেন্টার হবে, তাদের সুনির্দিষ্ট যন্ত্রপাতি থাকবে, সুনির্দিষ্ট টেস্ট ও ইন্সপেকশন করবেন, বিআরটিএ তাদের তদারকি ও রেগুলেট করবে, দরকারে জরিমানা করবে। সবাই একে অপরের মুখ দেখাদেখি করে। বেসরকারি খাতে ছাড়তে কেউই রাজি না।

বিআরটিএ-তে ড্রাইভিং লাইসেন্সের কার্ড প্রিন্ট হয় না। উপদেষ্টা মহোদয় আবারও কল করলেন, জরুরি ভিত্তিতে যাওয়া লাগবে। এক্সপার্ট টিম পাঠালাম। গিয়ে দেখা গেল, দেশি বিদেশি তিন কোম্পানির মারামারি। ২ কোম্পানির প্রিন্টার, কোনটাই কাজ করে না, ডেটাবেজ থেকে এপিআই কল ইন্ডিয়া যায়, সেখানে কমান্ড পাঠিয়ে প্রিন্ট হবার কথা! কী নিদারুণ ব্যবস্থা! সফ্‌টওয়্যার সাব সিস্টেম ইচ্ছা করে ইন্টেগ্রশনে ঝামেলা করে রেখে পরস্পর পরস্পরকে অভিযুক্ত করছে। সপ্তাহখানেক কাজ করে সব আপ এন্ড রানিং করা হইল। ২০ লাখের কাছাকাছি কার্ড প্রিন্টিং আবেদন পেন্ডিং, কার্ড প্রিন্টারের সক্ষমতা, দরকার দিনে ২০ হাজার, আমরা সিস্টেম ঠিকঠাক করার পরে দেখলাম, প্রিন্ট করে মাত্র ১৫০টা। পরে বললো, প্লাস্টিক কার্ড নাই, নতুন কার্ড কিনতে টেন্ডার দিতে হবে, ৬ মাসের মামলা। কিছুদিন পরে দেখি ব্ল্যাকে কার্ড প্রিন্ট হচ্ছে, ঘুষ দিলে প্লাস্টিক কার্ড বের হয়। এর পরে দেখলাম আরও তেলেসমাতি। ভুয়া চিপ কার্ড দিয়ে সম্পূর্ণ ফেইক ড্রাইভিং লাইসেন্সও প্রিন্ট হচ্ছে, এর সাথে ডেটাবেজের কোনো সমন্বয় নাই। লাখ লাখ বিদেশগামীর সেবাটা দরকার, এটাকে মিলকিং কাউ বানাইসে ভিতর ও বাইরের দুর্বৃত্ত চক্র।

ঢাকায় বাসের টিকেটিং ব্যবস্থা আধুনিক করবে। হাতিরঝিলে পাইলট করে দেখিয়ে দিলাম, ডিভাইস লক সিস্টেম দরকার নাই, মোবাইল এপ দিয়েই হয়। কিন্তু না তারা এই যুগে ক্যাশ ভিত্তিক ডিভাইস নির্ভর সিস্টেম করবে। বললাম মোবাইল ব্যাংকিং, এনপিএসবি, ওয়ালেট, ডেবিট কার্ড, কন্টাক্লেস চিপ, এনএফসি সহ, ভিসা, মাস্টারকার্ড সহ সব পেমেন্ট মেথড এড করে রোডম্যাপ করে নিয়ে আসেন। প্রথমে বল্লো ৩ মাস, পরে বল্লো ৬ মাস লাগবে, ৬ মাসে ফেব্রুয়ারি পার হয়। কারণ বিশেষ ব্যাংকের সাথে ক্লোজ লুপ পেমেন্ট সিস্টেম ভাংতে চায় না।

এইসব গল্পের কারিগরি দিক নিয়ে পরে সময় করে বিস্তারিত বলবো। শুধু এটা বলি, মেজাজ ধরে রেখে কোনও পদ্ধতিগত, প্রক্রিয়াগত এবং সিস্টেমগত সংস্কারে আগানো যায় না। এত ঝামেলা, এত জঞ্জাল, এত বাধা। আর পদে পদে শত্রুতা। আপনাকে ল্যাং মারতে আসা। ভালো কিছু করতে যাবেন, আপনি শুধুমাত্র না সাংবাদিক লাগিয়ে আপনার চৌদ্দগুষ্ঠির পিন্ডি চটকাবে। ডিফেমেশনের এই রুপ যে বা যারা দেখে নাই, তারা এসব বিশ্বাস করবেন না। এই নিয়ে বাংলাদেশ। তাও সংস্কারের স্বপ্ন দেখা সাহসী মানুষ দরকার।

৪০টা জীবন্ত মানুষ চোখের সামনে পানির তলে হারিয়ে সাক্ষাৎ মৃত্যুর করুণতম স্বাদ নিতে যাচ্ছে। কলিজাটা শূন্য হয়ে যায় এই দৃশ্য দেখলে। বুক ভরা হাহাকার সারাদেশে। কিন্তু এটা থামাতে তো যৌক্তিক সংস্কারগুলা দরকার, কে করবে? কে শুরু করলে কে এগিয়ে নিবে, কে ওউন করবে, কেউ নাই। অথচ সিস্টেম গুলায় বড়ো বড়ো পরিবর্তন দরকার।

- নিয়মিতভাবে স্থায়ীভাবে আনফিট বাস রাস্তা থেকে সরিয়ে স্ক্র্যাপ করা। 
- মোটর ভেহিক্যাল ইন্সপেকশন পদ্ধতির স্থায়ী পরিবর্তন করা।
- ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা ঠিক করা। 
- প্রাতিষ্ঠানিক ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল করা।
- ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্টিং, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মোটর ভেহিকল ডেটাবেজ ঠিক করা, 
- ঘুষ দুর্নীতি মুক্ত লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা অটোমেট করা।

সারা দুনিয়া করে ফেলেছে। বাংলাদেশে এখনও চাকার গ্রিপ টেস্ট-এর ব্যবস্থা নাই, স্টিয়ারিং স্ট্যাবিলিটি চেকের ব্যবস্থা নাই, লুজ বা ডেমেজ হওয়া স্টিয়ারিং/সাসপেনশন চেক নাই, ব্রেক প্যাড, ব্রেক ডিস্ক, হ্যান্ড ব্রেক কাজ করে কিনা চেক নাই, সেফটি এবং ইমিশন চেক নাই, ইঞ্জিনের লিক বা ওয়ার্নিং লাইট দেখা নাই। অ্যালার্ম ক্লিয়ার করে রেজিস্ট্রেশন ডকুমেন্ট আর চেসিস নাম্বার দেখে কাজ শেষে। পরিণতি আমরা জানি।

মূল লক্ষ্য যে প্রাণের নিরাপত্তা, পরিবেশ, বৈধতা যাচাই এগুলির বোধ নাই, অনেকেই বিষয়গুলো জানেন, কিন্তু তারা অসহায়। ফলে গভর্নেন্স টেম্পার করে স্পিড লিমিট বাড়িয়ে, গ্রিপ হীন চাকায় চালিয়ে, ব্রেক ও সাস্পেনশন ঠিক না রেখে- এক একটি গাড়িকে করা হয় সাক্ষাৎ মৃত্যু যান।

যৌক্তিক সংস্কারের মাধ্যমে নতুন কিছু, ভালো কিছু চালু করা ও মেনে নেয়ার কথা বললেই যেন আমাদের বহুভাগে বিভক্ত ভিতর-বাইরের স্টেকহোল্ডারদের উপর ঠাডা পড়ে। আল্লাহ্‌ আমাদের হেফাজত করুন।

লেখক: টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী।

রাস্তার মাঝে পিকআপ নষ্ট হতেই ছিনতাই, ৮ ঘণ্টার মধ্যে ৯ লাখ ট…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘খারাপ শিক্ষক’ নিয়োগ দিলে তার উল্টো ইমপ্যাক্…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
এশিয়ান ইউনিভার্সিটির বাসের ধাক্কায় ঝরল ৪ প্রাণ
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
রাজধানীতে সকালেই একসঙ্গে প্রাণ হারালেন ৪ জন
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কার মুখে ট্রাম্পের দল, এগিয়ে ডেম…
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
কিশোরীকে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণের অভিযোগে কবিরাজ গ্রেপ্তার
  • ০৪ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950