বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তথ্য বিকৃতি, মিসকোটিং-এর মহামারি চলছে

১০ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:০১ PM , আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:০৭ PM
শফিকুল আলম

শফিকুল আলম © সংগৃহীত

বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে মিসকোট করার প্রবণতা এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুতর অপরাধ। এমন এক অপরাধ যার কারণে সম্প্রতি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের প্রধান এবং এর শীর্ষ সাংবাদিকের একজনকে চাকরি হারাতে হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এমনকি সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় নামগুলিও এই অপরাধে দোষী। 

কয়েকদিন আগে, দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিক এক পাবলিক ইভেন্টে দেওয়া আমার বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অংশ মিসকোট করেছে। প্রতিবেদনটি পড়তে গিয়ে আমার মনে হলো, প্রতিবেদক সম্ভবত আমার বক্তব্যের অডিও কোনো এআই ট্রান্সক্রিপশন টুলের মাধ্যমে লিখিত আকারে প্রকাশ করেছেন। এর ফলে যা বেরিয়েছে তা ছিল একগাদা যান্ত্রিকভাবে লেখা আজগুবি বাক্য। এর কিছু অংশ মজার মনে হলেও সামগ্রিকভাবে ভীষণ হতাশাজনক। যেমন- আমি যখন ‘Touch’ শব্দটি বলছিলাম, সফটওয়্যারটি সম্ভবত শুনেছিল “Kaaz” (কাজ)। ফলে, ওই প্রতিবেদনে ছাপা হয়েছে ‘কাজ’।

সমস্যাটা এখানেই শেষ হয়নি। ওই প্রতিবেদন কপি-পেস্ট করে বেশ কিছু অনলাইন পোর্টাল একই ভুল অক্ষরে অক্ষরে পুনরুত্পাদন করেছে। আমার ক্ষেত্রে এমন ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটে। নতুন চাকরির প্রথম কয়েক মাসে আমি সম্পাদক ও প্রতিবেদকদের ফোন করে সংশোধনের দাবি জানাতাম। এখন আর সে চেষ্টা করি না। সত্যি বলতে, আমার সেই সময় নাই।

বর্তমানে সবচেয়ে বড় হুমকি হলো ফটোকার্ড। প্রতিদিনই সংবাদপত্রগুলো- বিশেষ করে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন এবং বিএনপিপন্থী সাংবাদিকদের দ্বারা প্রভাবিত কালের কণ্ঠ, টিভি স্টেশন এবং ওয়েবসাইটগুলো বিতর্কিত বিশ্লেষক বা পাবলিক ফিগারদের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে এই গ্রাফিক স্নিপেট তৈরি করছে।
তারা বক্তব্য থেকে এক-দুই লাইন চেরি পিক করে, তারপর প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে তাদের বেছে নেয়া এক-দুই লাইনকেই চমকপ্রদ শিরোনামে পরিণত করে। সম্প্রতি আমি সিরডাপে ২৭ মিনিটের একটি বক্তৃতা দিয়েছিলাম। সেখান থেকে মাত্র একটি লাইন তুলে নিয়ে তারা প্রতিবেদন বানিয়েছে—যার ফলে আমার বক্তব্যের আসল বার্তাটাই বিকৃত হয়ে গেছে।

টেলিভিশন বিশ্লেষক ও ইউটিউবারদের অবস্থা আরও করুণ। তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ প্রতিবেদন পড়েন না, পুরো বক্তব্যও শোনেন না। বরং আগে থেকে তৈরি নিজস্ব ধ্যান-ধারণার সঙ্গে কিছু সত্য আর অসংখ্য মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে মানুষের কাছে উপস্থাপন করেন। প্রতিদিনই কিছু ইউটিউবার দীর্ঘ মনোলগ আকারে ভুল তথ্যভরা ভিডিও প্রকাশ করছে। তাদের যথাযথ গবেষণা নেই, এমনকি প্রশিক্ষিত ফ্যাক্ট-চেকার বা গবেষকদের সাহায্যও তারা নেন না। এর ফলাফল হলো- অবিরাম মিথ্যা তথ্যের বিস্তার।

তাদের কিছু দাবি আবার আশ্চর্যজনকভাবে সাহসী। এক নারী ইউটিউবার দাবি করেছিলেন, প্রফেসর ইউনুস ও তাঁর কন্যার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়ার ছবিটি নাকি ‘ম্যানিপুলেটেড’ (নকল)। অথচ ছবিটি হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশ করা হয়েছিল।

তিনি যখন এই দাবি করেছিলেন তখনও আমরা নিউইয়র্কে ছিলাম। তিনি মূলত বাংলাদেশের সরকার প্রধানের সঙ্গে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউসের একটি অফিসিয়াল ছবি বিকৃত করার অভিযোগ এনেছিলেন। কী হাস্যকর! আমি এ বিষয়ে ফেসবুকে মন্তব্য করলে তার স্বামী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক, তার পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হাসিনার আমলে ওর কোনো ছবি নিয়ে এই দম্পতি এমন কিছু করার কথা ভাবতে পারতেন!

কয়েকদিন আগে, নিজেকে ‘স্পষ্টভাষী’ সাংবাদিক বলে পরিচয় দেওয়া আনিস আলমগীর দাবি করেছেন যে, জুলাই আন্দোলনের সময় প্রফেসর ইউনুস বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করার জন্য পিআর এজেন্সিগুলোকে ‘কোটি টাকার’ও বেশি অর্থ দিয়েছেন। তিনি সম্ভবত দাবি করছেন যে, শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ইমেইল সাক্ষাৎকারগুলো, যার সত্যতা নিয়ে এখনো সন্দেহ আছে, স্বতঃস্ফূর্ত এবং আনপেইড ছিল। একজন গণহত্যাকারী কোনো পিআর প্রতিষ্ঠানের সাহায্য ছাড়াই এরকম ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকার আয়োজন করছে এই দাবি হাস্যকর।

স্পষ্টভাবে বলে রাখি, প্রফেসর ইউনুস কখনো এক পয়সাও কোনো পিআর এজেন্সিতে দিয়ে কোনো ধরনের সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করেননি। যদি আনিস আলমগীরের কাছে এই বক্তব্যের কোনো প্রমাণ থাকে, তার উচিত সেটা উপস্থাপন করা। কয়েক মাস আগে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক একটি জামায়াত কর্মীও একই অভিযোগ করেছিলেন। আমি তাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। তিনি রিজয়েন্ডার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা এখনো আসেনি।

আজকের কাগজ থেকে উঠে আসা আনিস আলমগীর, এমন এক প্রজন্মের সাংবাদিকদের অংশ যাদের কখনো যথাযথ সূত্র বা রেফারেন্সের প্রতি বেশি যত্ন ছিল না। তার সবচেয়ে স্মরণীয় কাজ বাগদাদের একটি হোটেল রুম থেকে ইরাক যুদ্ধের ‘কভার’ করা, হোটেল থেকে বের না হয়েই যুদ্ধ নিয়ে রূপকথার গল্প লেখা।

গতকাল বিবিসির শীর্ষ সম্পাদক ও একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য মিসকোট করার জন্য পদত্যাগ করলে এটি বিশ্বব্যাপী শিরোনামে আসে। বাংলাদেশে পাবলিক ফিগারদের মিসকোট করা অথবা প্রেক্ষাপটের বাইরে বক্তব্যের এক-দুই লাইনকে হাইলাইট করা নিত্যদিনের ঘটনা। আর আপনি যদি এর প্রতিবাদ করেন, তাহলে তারা “সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার” দোহাই দিয়ে কেটে পড়বে। তারা উল্টো অভিযোগ করবে যে, আপনি তাদের ভয় দেখাচ্ছেন, আপনি অসহিষ্ণু এবং আপনাকে আওয়ামী লীগের রাস্তার গুন্ডাদের সাথে তুলনা করবে।

এই হলো আমাদের গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা—দায়িত্বহীন, জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে এবং সত্য থেকে বহু দূরে।

লেখক:
শফিকুল আলম,
প্রেস সচিব।

বাসিজ কমান্ডার সোলাইমানিকে হত্যার খবর নিশ্চিত করল ইরান
  • ১৮ মার্চ ২০২৬
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে ‘মানহানিকর’ পোস্ট শেয়ার, বিশ্ববিদ্…
  • ১৮ মার্চ ২০২৬
‎বাহুবলে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর
  • ১৮ মার্চ ২০২৬
দেশের উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি—নুরুল হক নুর
  • ১৮ মার্চ ২০২৬
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের ৫ম মৃত্যুবার্ষিকীতে আলোচনা ও দোয়া
  • ১৮ মার্চ ২০২৬
চাঁদপুর-৩ আসনের সাবেক এক এমপি মারা গেছেন
  • ১৮ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence