ঋত্বিক ঘটক
অসংখ্য কালজয়ী বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন ঋত্বিক ঘটক © সংগৃহিত
‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, সুবর্ণরেখা-এর মতো কালজয়ী সব চলচ্চিত্রের নাম শুনলে মাত্রই নড়েচড়ে বসেন সিনেমাপ্রেমীরা। জীবনছোঁয়া এসব চলচ্চিত্র বার বার দেললেও যেন মন ভরে না। এসব চলচ্চিত্রের শ্রষ্টা একজনই, তিনি ঋত্বিক ঘটক। পুরো নাম ঋত্বিক কুমার ঘটক হলেও ঋত্বিক ঘটক নামেই সুপরিচিত তিনি। অসংখ্য ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্রের এ নির্মাতা তার সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের জীবন যন্ত্রণা আর মানবিক সঙ্কট সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছিলেন। সীমাহীন শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন নিজের সৃষ্টকর্মকে।
সবমিলিয়ে নিজের নির্মিত চলচ্চিত্রকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাই এখনো ঋত্বিক ঘটক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সাথে স্বরণীয় একটি নাম। একজন চলচ্চিত্রকার, পরিচালক ও অভিনেতা হিসেবে খরা, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, শরণার্থী জীবনের দুঃখগাথা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তিনি। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সত্যজিৎ রায়ের মতো নামের সাথে তার নামও তাই সমানে উচ্চারিত হয়।
ঋত্বিক কুমার ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকা জেলার ঋষিকেশ দাশ লেনে জন্মগ্রহণ করে। বাবা ছিলেন তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুরেশচন্দ্র ঘটক, তিনি ছিলেন কবি ও নাট্যকারও। মা ইন্দুবালা দেবী গৃহিণী, বড় ভাই অধ্যাপক ও লেখক মণিষ ঘটক। তখনকার সময়ে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং আরো অন্যান্য কারণে তাঁর পরিবারকে বড় একটা সময় কলকাতায় অবস্থান করতে হয়েছিলো। ঋত্বিক ঘটকের ছেলে রীতা বানও একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা।
বাবার চাকরির সুবাদে বিভিন্ন স্থানে ঘোরার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি। তাদের দুঃখ, দুর্দশা দাগ কেটে গিয়েছিলো তার মনে। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, শরণার্থী হয়ে পড়ার কারণে। জন্মস্থান ছেড়ে কলকাতায় শরণার্থী হওয়ার বেদনা তিনি অনুভব করেছিলেন ব্যাপকভাবে। এসব বিষয়গুলোই ঋত্বিক ঘটক বিভিন্ন সময়ে তার লেখা ও অন্যান্য সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন। এভাবে কালজয়ী সব চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন তিনি।
ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম
ঋত্বিক ঘটকের শিক্ষাজীবন মনসিংহের মিশন স্কুলে শুরু হলেও পরে কলকাতার বালিগঞ্জ স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৮ সালে বাহরামপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ ভর্তি হন। তবে তিনি এ কোর্স সম্পন্ন না করে লেখক হওয়াটাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী স্বল্প সময়েল মধ্যেই দেশ, শনিবারের চিঠি, অগ্রণীর মতো বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা শুরু করেন। এটির মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই লেখক হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন তিনি।
পত্রিকার পাশাপাশি মঞ্চ নাটককে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিয়ে ১৯৪৮ সালে ‘কালো সায়র’ নাটক লেখেন ঋত্বিক ঘটক। ১৯৫১ সালে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগ দেওয়ার পর আরও অনেক নাটক রচনা করেছেন তিনি, করেছিলেন অভিনয়ও। এছাড়া নবান্ন নাটকের মাধ্যমে খ্যাতি অর্জণ করেন তিনি। নাগিনী কন্যার কাহিনী উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৫১ সালে বেদিনী ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন ঋত্বিক ঘটক। একই বছর তিনি ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনে যোগদান করেন। পরের বছর নির্মাণ করে নাগরিক। এছাড়া ১৯৫২ সালে দলিল নাটক নির্মাণ করে ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন এক্সিবিটিশন -এ প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৫৫ সালে ‘গ্রুপ থিয়েটার’ নাকে নাট্যদল গঠন করে তাঁর সাঁকো নাটকটি মঞ্চস্থ করেন।
ঋত্বিক ঘটকের প্রথশ ব্যবসা সফল ছবি অযান্ত্রিক (১৯৫৮) ছিলো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নিয়ে নির্মিত। এ চলচ্চিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। এছাড়া তাঁর সবচেয়ে ব্যবসা সফল হিন্দি ছবি ১৯৫৮ সালে নির্মিত মধুমতি। এটি ফিল্মফেয়ারে সেরা গল্পের পুরস্কার পায়। ঋত্বিক ঘটক মোট আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন, যার মধ্যে মেঘে ঢাকা তারায় (১৯৬০) একটি শরণার্থী পরিবারের সংগ্রামী জীবন তুলে ধরা হয়েছিলো। এছাড়া বাড়ি থেকে পালিয়ে (১৯৫৮), ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিচ্ছবি নিয়ে কমলগান্ধার (১৯৬১) নির্মাণ করে। তাঁর কালজয়ী সিনেমা তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩) ২০১০ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট কর্তৃক শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে ১০ম স্থান অধিকার করে। ঋত্বিক ঘটকের শেষ চলচ্চিত্র ছিলো নিজের আত্মজীবনীমূলক যুক্তি তক্ক আর গল্প (১৯৭৪)।
ঋত্বিক ঘটকের নির্মিত অসংখ্য স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও প্রামান্যচিত্রের মধ্যে রয়েছে, আদিবাসী (১৯৫৪), আমার লেনিন (১৯৭০), পুরুলিয়ার ছৌ (১৯৭০), ইন্দিরা গান্ধি, দূর্বার ঘাটি পদ্মা (১৯৭১)। এছাড়া অভিনীত নাটক ও চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে, চন্দ্রগুপ্ত, অচলায়তন, কালো সায়ার, দলিল, কত ধানে কত চাল (১৯৫২), বিসর্জন (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর), নীলদর্পন (দীনবন্ধু মিত্র), হ য ব র ল (সকুুমার রায়) ইত্যাদি।
এক সাক্ষাতকারে ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন, ‘মানুষের অবক্ষয় আমাকে আকর্ষণ করে। তার কারণ এর মধ্য দিয়ে আমি দেখি জীবনের গতিকে, স্বাস্থ্যকে। আমার ছবির চরিত্ররা চিৎকার করে বলে আমাকে বাঁচতে দাও।’ দেশভাগও মেনে নিতে পারেননি তিনি। যে কারণে সীমাহীন যন্ত্রণা থেকে তিনটি চলচ্চিত্র নির্মান করেছেন তিনি। এছাড়া রবীন্দ্র সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন ঋত্বিক ঘটক। ১৯৬৫ সালে স্বল্প সময়ের জন্য পুনেতে বসবাস করেন তিনি। সেসময় পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দু’বছর কাজ করেন এবং অল্পসময় উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অবশ্য তার কিছু কাজের মাধ্যমে সমালোচিতও হয়েছিলেন তিনি।
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নির্মাতা, লেখক, পরিচালক ঋত্বিক ঘটক ১৯৭৬ সালের আজকের এই দিনে ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় পরলোক গমন করেন। মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি জানায় গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টকর্মের মাধ্যমে তিনি চিরদিন বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে।