জুলাই গণ-অভ্যুত্থান
জুলাই শহীদ হাসনাইনের স্ত্রী মাইসা আক্তার রুমা বেগম © টিডিসি
ভোলার চরফ্যাশনে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত হাসনাইনের স্ত্রী স্বামীর হত্যার বিচার ও নিজের জন্য একটি সরকারি চাকরি চান। অন্যদিকে হাসনাইনের মা চান ছেলের হত্যায় জড়িতদের দ্রুত বিচার ও শাস্তি। স্বজনদের দাবি, বিচারপ্রক্রিয়া চললেও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও পুনর্বাসনের অপেক্ষায় রয়েছে শহীদ পরিবারগুলো।
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার রসুলপুর ও নজরুলনগর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জুলাই শহীদ হাসনাইনের স্ত্রী মাইসা আক্তার রুমা বেগম জানান, তার স্বামী হাসনাইন ঢাকার রায়েরবাজারে একটি ডিজিটাল কেবল প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল না। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় ১৮ মাস বয়সী মেয়ে রাইসাকে আদর করে বাসা থেকে বের হন তিনি। ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে বেরিয়েছিলেন। পরে মোহাম্মদপুরের সাত মসজিদ রোড এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
স্বামীর মৃত্যুর সময় তাদের সংসরের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। বর্তমানে মেয়ে রাইসাকে নিয়ে ভোলার ইলিশা ইউনিয়নের চরকালফুরা গ্রামে বাবার বাড়িতে থাকেন রুমা। তার ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু সহায়তা পেলেও তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
রুমা বলেন, ‘আমি এসএসসি পাস করেছি। আমার জন্য একটি চাকরি এবং মেয়ের জন্য শিক্ষা ভাতা চাই। চাকরি পেলে মেয়েকে নিয়ে অন্তত ন্যূনতমভাবে জীবন চালাতে পারব। ছোট্ট মেয়েটি প্রতিদিন বাবাকে খুঁজে কাঁদে। কিন্তু সেই শূন্যতা তো আর পূরণ হওয়ার নয়।’
হাসনাইনের মা হাসিনা বেগম জানান, ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করে সংসার চালাতেন তিনি। বড় ছেলে নিহত হওয়ার পর ছোট ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে মানুষের বাসায় কাজ করে কোনোমতে দিন কাটছে। ছেলের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার এবং শহীদ পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তার দাবি জানান তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসনাইনের গ্রামের বাড়ির ভিটাটি এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত। সেখানে হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালন করা হচ্ছে। তার কবরের ফলকেও একটি ভুল তথ্য রয়েছে—শহীদ হওয়ার স্থান মোহাম্মদপুরের সাত মসজিদ রোডের পরিবর্তে সেখানে যাত্রাবাড়ীর নাম লেখা হয়েছে।
১৭ বছরেই ঝরে যায় মনিরের প্রাণ
চরফ্যাশনের রসুলপুর ভাসানচর এলাকার আরেক জুলাই শহীদ বাহাদুর হোসেন মনির। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ভাটারা নতুন বাজারের বাঁশতলা এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মাত্র ১৭ বছর বয়সে নিহত হন তিনি।
মনিরের মামা জানান, আন্দোলনের সময় গুলির মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের চেষ্টা করলেও বুকে গুলি লাগে এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে মরদেহ গ্রামে আনার পর জানাজা ও দাফন নিয়েও তৎকালীন স্থানীয় প্রভাবশালীদের পক্ষ থেকে বাধা, হয়রানি ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
মনিরের বাবা জানান, রিকশা চালিয়ে ছেলেদের মানুষ করেছেন। মনির নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল। ছেলেকে হারানোর পর এখন প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে কষ্টে দিন কাটছে তার। মেয়ের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতা ও পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা চান তিনি।
চরফ্যাশন উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে উপজেলায় মোট ১২ জন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন—হাসনাইন, বাহাদুর হোসেন মনির, মো. মমিন, মো. ফজলু, মো. হাবিব, মো. ওমর ফারুক, মো. সিয়াম, রাকিব মোল্লা, মো. সোহাগ, মো. হোসেন, মো. তারেক ও ফজলে রাব্বি।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ বলেন, জুলাই দিবস উপলক্ষে শহীদ পরিবার ও আহতদের নিয়ে ভোলা শিল্পকলা একাডেমিতে আলোচনা সভা এবং শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের কর্মসূচি পালন করা হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের যাতায়াত ও খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।