জুলাই গণঅভ্যুত্থান © সংগৃহীত
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। ছাত্র-জনতার তীব্র গণপ্রতিরোধ ও দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে সেদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। এর মধ্য দিয়ে প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। একই সাথে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেদিন চূড়ান্ত রূপ নেয়। কারফিউ, গুলি ও কঠোর নিরাপত্তা উপেক্ষা করে লাখো মানুষ ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসেন।
দুপুরের দিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপর রাজধানীজুড়ে উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে। হাজারো মানুষ গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় প্রবেশ করে বিজয় উদযাপন করেন। শিশু, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, নারী ও প্রবীণ—সব শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন।
তবে দিনটি শুধু বিজয়ের ছিল না, ছিল রক্তাক্তও। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে আরও অনেকে নিহত ও আহত হন। এর আগে জুলাইজুড়ে আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীদের হামলায় শত শত মানুষ প্রাণ হারান এবং অসংখ্য মানুষ আহত হন।
শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা পালায় না’। ২০২৪ সালের ২২ জুলাই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকেও তিনি একই কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেই বক্তব্যের দুই সপ্তাহের মধ্যেই গণআন্দোলনের মুখে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে ভারতে চলে যান।
৫ আগস্ট ভোর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ও আশপাশের জেলা থেকে মানুষ শাহবাগ অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। ঢাকার বাইরে থেকেও হাজারো মানুষ পুলিশের বাধা অতিক্রম করে রাজধানীতে প্রবেশের চেষ্টা করেন। বিভিন্ন প্রবেশপথে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। অনেক জায়গায় গুলির ঘটনাও ঘটে। সেদিন রাজধানীর রাজপথ কার্যত আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান দ্রুত ভেঙে পড়ে। গণভবনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জনতার ঢল নামে।
এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে। ২০১৮ সালে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিল করলেও ২০২৪ সালের জুনে হাইকোর্ট সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করে কোটা পুনর্বহালের রায় দেন। এরপর আবারও আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি ছিল মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা।
শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমন করতে সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মাঠে নামায়। আন্দোলন দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
সরেজমিনের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট সকাল থেকেই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে হাজার হাজার মানুষ শাহবাগে জড়ো হতে থাকেন। কারফিউ ও ব্যারিকেড অতিক্রম করে রাজধানীতে প্রবেশের সময় বিভিন্ন স্থানে গুলির ঘটনা ঘটে। এতে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ে।
প্রথমে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে ৩ ও ৪ আগস্ট আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় যথাক্রমে অন্তত ৯৩ ও ৬৬ জন নিহত হওয়ার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করেন।
আন্দোলনের একপর্যায়ে সমন্বয়কদের কয়েকজনকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আটকে রাখা হয়। তারা ছিলেন নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, নুসরাত তাবাসসুম ও আবু বাকের মজুমদার। বাইরে থাকা সমন্বয়কেরা তখন ৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে আন্দোলন চালিয়ে যান।
পরে মুক্তি পাওয়ার পর ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে নাহিদ ইসলাম শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেন। এরপর আন্দোলন আরও বেগবান হয়। আন্দোলনকারীরা ৫ আগস্টের কর্মসূচিকে ‘৩৬ জুলাই’ নামে অভিহিত করেন। শেখ হাসিনার পতনের আগ পর্যন্ত ‘জুলাই শেষ হবে না’।
২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর থেকেই শেখ হাসিনা তার এই ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতা’ ধরে রাখতে চেয়েছেন। এ লক্ষ্যে তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণসহ শাসনব্যবস্থায় নানা অনিয়ম ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি সমালোচনাকেও সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করে তার অধীনে একের পর এক বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন করে ক্ষমতা ধরে রাখেন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের বর্জনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ১৫৩ জন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, যা ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টি করে।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোটের পাশাপাশি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটও অংশ নিয়েছিল। শেখ হাসিনা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ্বাস দিলেও নির্বাচনের আগের দিন রাতেই সারা দেশের সব ব্যালট বাক্স ভর্তি করে নির্বাচন শেষ করা হয়।
ওই নির্বাচনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কর্মীরা মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে। ইতিহাসে ওই নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপিকে মাত্র ৬টি আসনে বিজয়ী দেখানো হয়।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইতিহাসে ‘আমি-ডামি’নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ওই নির্বাচন আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের কর্মী এবং কতিপয় দোসরদের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপির সব শীর্ষ নেতৃত্বসহ জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে কারাবন্দি করে রাখা হয়।
হাসিনা তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অসংখ্য গুম, খুন ও ভয়াবহ কারা নির্যাতনের অসংখ্য নজির স্থাপন করেছেন। আয়নাঘরে আটক রেখে অবর্ণনীয় নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ হলে মানুষ আতঙ্কে শিহরিত হয়ে ওঠে। বর্বর এসব ঘটনা পৃথিবীর সব নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়। গুমের শিকার শত শত মানুষের সন্ধান এখনো মেলেনি।
হাসিনার শাসনামলে বিএনপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বিঘ্নে কোনো সমাবেশ করতে পারেনি। বিভিন্ন রকম বাধার পাশাপাশি গণগ্রেপ্তার এবং সাজানো মিথ্যা মামলা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
চব্বিশের দুনিয়া কাঁপানো ৩৬ জুলাইয়ের (১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট) আন্দোলনেও একই ঘটনা ঘটায় হাসিনা সরকার। বিএনপি-জামায়াতসহ গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দলসমূহের অধিকাংশ শীর্ষ নেতৃত্বকেই কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। চব্বিশের জুলাইয়ের টানা আন্দোলন আগস্টের ৫ আগস্ট সফলতা পায়, এটিই ৩৬ জুলাই আন্দোলন হিসেবে জনগণের কাছ থেকে স্বীকৃতি পায়।
সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি হাসিনার উদাসীনতা এবং দমনমূলক আচরণই শেষ পর্যন্ত এ আন্দোলনকে সফল গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষ আহত হন। এই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে তার সরকারের অবসান ঘটে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। তথ্যসূত্র: বাসস