ইসলামে মুমিনের ভালো মৃত্যুর বেশ কিছু আলামত রয়েছে © এআই সৃষ্ট ছবি
ভালো মৃত্যু মানে মৃত্যুর পূর্বে আল্লাহ রাগান্বিত হন এমন গুনাহ হতে বিরত থাকতে পারা, পাপ হতে তওবা করতে পারা, নেকীর কাজ ও ভালো কাজ বেশি বেশি করতে পারা। এ অবস্থায় মৃত্যু হওয়াকেই ভালো মৃত্যু বলে।
আনাস বিন মালিক (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- আল্লাহ যদি কোন বান্দার কল্যাণ চান তখন তাকে (ভালো) কাজে লাগান। সাহাবায়ে কেরাম বললেন: কিভাবে আল্লাহ বান্দাকে (ভাল) কাজে লাগান? তিনি বলেন, মৃত্যুর পূর্বে তাকে ভাল কাজ করার তাওফিক দেন। [মুসনাদে আহমাদ (১১৬২৫), তিরমিযি (২১৪২)]।
ভালো মৃত্যুর বেশ কিছু আলামত আছে। মৃত্যুকালে বান্দার নিকট তার ভালো মৃত্যুর যে আলামত প্রকাশ পায় সেটা হচ্ছে- বান্দাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ লাভের সুসংবাদ দেয়া হয়। ভালো মৃত্যুর আলামত অনেক। আলেমগণ কুরআন-হাদিস খুঁজে এ আলামতগুলো বের করার চেষ্টা করেছেন। আলামতগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. মৃত্যুর সময় ‘কালেমা’ পাঠ করতে পারা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তির সর্বশেষ কথা হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন। (সুনানে আবু দাউদ, ৩১১৬), সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে (২৬৭৩) আলবানি এই হাদিসকে সহিহ বলেছেন।
২. মৃত্যুর সময় কপালে ঘাম বের হওয়া
বুরাইদা বিন হাছিব (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘মুমিন কপালের ঘাম নিয়ে মৃত্যুবরণ করে।’ [মুসনাদে আহমাদ (২২৫১৩)]।
৩. জুমার রাতে বা দিনে মৃত্যুবরণ করা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে বা রাতে মৃত্যুবরণ করেন আল্লাহ তাকে কবরের আযাব থেকে নাজাত দেন।’ [মুসনাদে আহমাদ (৬৫৪৬), জামে তিরমিযি (১০৭৪)]।
৪. আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা আল্লাহর রাহে নিহত হয়, তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত। আল্লাহ নিজের অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তার প্রেক্ষিতে তারা আনন্দ উদযাপন করছে। আর যারা এখনও তাদের কাছে এসে পৌঁছেনি তাদের পেছনে তাদের জন্যে আনন্দ প্রকাশ করে। কারণ, তাদের কোন ভয় ভীতিও নেই এবং কোন চিন্তা ভাবনাও নেই। আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্যে তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং তা এভাবে যে, আল্লাহ, ঈমানদারদের শ্রমফল বিনষ্ট করেন না।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৯-১৭১)
৫. রোগে মারা যাওয়া
নবী আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘প্লেগ রোগে মৃত্যু প্রত্যেক ঈমানদারের জন্য শাহাদাত।’ [সহিহ বুখারী (২৮৩০) ও সহিহ মুসলিম (১৯১৬)]।
৬. পেটের পীড়াতে মৃত্যুবরণ করা
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি পেটের পীড়াতে মৃত্যুবরণ করবে, সে শহীদ। [সহিহ মুসলিম (১৯১৫)]
৭. কোনও কিছু ধ্বসে পড়ে অথবা পানিতে ডুবে মৃত্যু
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী, পাঁচ ধরনের মৃত্যু শাহাদাত হিসেবে গণ্য। প্লেগ রোগে মৃত্যু, পেটের পীড়ায় মৃত্যু, পানি ডুবে মৃত্যু, কোন কিছু ধ্বসে পড়ে মৃত্যু এবং আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হওয়া। [সহিহ বুখারি (২৮২৯) ও সহিহ মুসলিম (১৯১৫)]।
৮. গর্ভবতী অবস্থায় নারীর মৃত্যু
এর দলিল হচ্ছে আবু দাউদ (৩১১১) কর্তৃক বর্ণিত হাদিস; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে নারী জুমা (বাচ্চা) নিয়ে মারা যায় তিনি শহীদ।’ যে নারী তার গর্ভস্থিত সন্তানের কারণে মারা যায় তিনি শহীদ। সে নারীকে তার সন্তান সুরার (নাভিরজ্জু) ধরে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে।
৯. আগুনে পুড়ে, প্লুরিসি এবং যক্ষ্মা রোগে মৃত্যু
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর রাহে নিহত হওয়া শাহাদাত, প্লেগ রোগে মারা যাওয়া শাহাদাত, পানি ডুবে মারা যাওয়া শাহাদাত, পেটের পীড়ায় মারা যাওয়া শাহাদাত, সন্তান প্রবসের পর মারা গেলে নবজাতক তার মাকে নাভিরজ্জু ধরে টেনে জান্নাতে নিয়ে যাবে। (সংকলক বলেন, এই হাদিসের জনৈক বর্ণনাকারী বায়তুল মোকাদ্দাসের খাদেম আবুল আওয়াম হাদিসটির অংশ হিসেবে আগুনে পুড়ে মৃত্যু ও যক্ষ্মা রোগের কথাও বর্ণনা করেছেন।)
আরও পড়ুন: জুমার দিনের সুন্নত ও আদব, যেসব আমলে বাড়ে মর্যাদা
১০. নিজের ধর্ম, সম্পদ ও জীবন রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যু
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি তার সম্পদ রক্ষা গিয়ে মারা যায় সে শহিদ। যে ব্যক্তি তার ধর্ম (ইসলাম) রক্ষা করতে গিয়ে মারা যায় সে শহিদ। যে ব্যক্তি তার জীবন রক্ষা করতে গিয়ে মারা যায় সে শহিদ। [জামে তিরমিযি (১৪২১)]
১১. আল্লাহর রাস্তায় প্রহরীর দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যু
সহিহ মুসলিমের ১৯১৩ নম্বর হাদিসে সালমান আলফারেসি (রা.) হতে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, একদিন, একরাত পাহারা দেয়া একমাস দিনে রোজা রাখা ও রাতে নামায পড়ার চেয়ে উত্তম। আর যদি পাহারারত অবস্থায় সে ব্যক্তি মারা যায়, তাহলে তার জীবদ্দশায় সে যে আমলগুলো করত সেগুলোর সওয়াব তার জন্য চলমান থাকবে, তার রিযিকও চলমান থাকবে এবং কবরের ফিতনা থেকে সে মুক্ত থাকবে।
১২. নেক আমলরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলল এবং এ অবস্থায় তার মৃত্যু হলো সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে ব্যক্তি কোন একটি সদকা করল এবং এ অবস্থায় তার মৃত্যু হলো সেও জান্নাতে প্রবেশ করবে। [মুসনাদে আহমাদ (২২৮১৩)।
এ আলামতগুলো ব্যক্তির ভারো মৃত্যুর সুসংবাদ দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা নির্দিষ্টভাবে কোন ব্যক্তির ব্যাপারে এ নিশ্চয়তা দেব না যে, তিনি জান্নাতি। শুধু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের ব্যাপারে নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন তারা ছাড়া। (সূত্র: ইসলাম কিউএন্ডএ)