সাক্ষাৎকার

পরিশ্রম ও প্রার্থনার সমন্বয় থাকলে সফলতা আসবেই—বিজেএস পরীক্ষায় দেশসেরা সিয়াম

আরিফ উল করিম সিয়াম

আরিফ উল করিম সিয়াম © টিডিসি সম্পাদিত

১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরিফ উল করিম সিয়াম। এই মাইলফলক স্পর্শ করার পেছনের গল্প নিয়ে তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসে বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন—মুহম্মদ সজীব প্রধান।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহম্মদ সজীব প্রধান
আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৬ PM

বিজেএস পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পর পৃথিবীটা আপনার কাছে কেমন লাগছে?
আরিফ উল করিম সিয়াম: সত্যি বলতে, পৃথিবীটা খুব একটা বদলে যায়নি, কিন্তু পৃথিবীটাকে দেখার ক্ষেত্রে আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা পরিবর্তন এসেছে। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার জায়গাটা আরো বিস্তৃত হয়েছে। প্রথম হওয়ার আনন্দ অবশ্যই অনেক বড়, কিন্তু এর সঙ্গে দায়িত্ববোধটাও অনেক বেড়ে গেছে। এত মানুষের ভালোবাসা, শুভকামনা ও প্রত্যাশা পাচ্ছি, এটা যেমন আনন্দের, তেমনি আমার জন্য একটা বড় দায়িত্বও। তাই এই মুহূর্তটাকে আমি শুধু অর্জন হিসেবে না দেখে, সামনে আরও ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখছি।

আপনার এই সুদীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার উৎস কী?
আরিফ উল করিম সিয়াম: আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার জায়গা ছিল আমার পরিবার। আমার বাবা-মা আর আমার ছোটবেলার বন্ধু যিনি এখন আমার স্ত্রী, এই তিনজন মানুষের কাছ থেকে যে মানসিক সমর্থন পেয়েছি, সেটা পুরো যাত্রায় আমাকে অনেক শক্তি দিয়েছে। আর আমার সহপাঠী এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা আমার জন্য দোয়া করতেন, ভালো চাইতেন। আমার কিছু বড় ভাই আর বন্ধু বান্ধব আমার এই পুরো জার্নিতে তাদের শ্রম আর সময় দিয়ে আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। তাদের এই দোয়া আমাকে এতদূর আসতে অনুপ্রেরণা দিয়েছে।

BJS শুধু একটি চাকরির পরীক্ষা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নিয়মতান্ত্রিকতার পরীক্ষা। তাই ধারাবাহিক থাকুন, নিজের ওপর এবং আল্লাহর বিশ্বাস রাখুন এবং শেষ পর্যন্ত লেগে থাকুন। হাল ছাড়বেন না। চেষ্টা করার কাজ আপনার, সফল করার দায়িত্ব আল্লাহর।

আপনি কি প্রথম হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন? ফলাফল প্রকাশ হওয়ার ১ মিনিট আগেও কি আপনি ভেবেছিলেন যে, আপনি বিজেএসে প্রথম হবেন?
আরিফ উল করিম সিয়াম:
প্রথম হওয়ার স্বপ্ন অবশ্যই ছিল, কিন্তু প্রস্তুতির সময় আমার মূল লক্ষ্য ছিল নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করে নিজের একটা জায়গা ধরে নেওয়া। আমি মনে করি, পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার লক্ষ্য রাখা যায়, কিন্তু শুধু র‍্যাংককে লক্ষ্য বানালে প্রস্তুতির জায়গায় চাপ তৈরি হতে পারে। আমার লক্ষ্য ছিল প্রতিটি ধাপে নিজের পারফরম্যান্সকে যতটা সম্ভব ভালো করা। আমি ডে বাই ডে নিজের প্রস্তুতি নিয়েছি আর আল্লাহর কাছে চেয়েছি। আর ফলাফল প্রকাশের এক মিনিট আগেও যদি বলেন যে আমি প্রথম হব কিনা! এমন চিন্তাভাবনাই আমার ছিল না। বরং ফলাফল নিয়ে স্বাভাবিক একটা উৎকণ্ঠা ছিল। কারণ রিজিকের ব্যাপারে আল্লাহ ছাড়া কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তাই প্রথম হওয়ার খবরটি যখন নিশ্চিতভাবে জানতে পারলাম, তখন সত্যিই কিছুক্ষণের জন্য বিশ্বাসই হচ্ছিল না।

আপনার প্রস্তুতি কত মাস কিংবা কত বছরের? বিজেএসের একটা ভালো প্রস্তুতির জন্য টাইম ফ্রেমটা কেমন হওয়া উচিত?
আরিফ উল করিম সিয়াম: এটা অনেক লম্বা একটা জার্নি। প্রস্তুতিটাকে শুধু কয়েক মাসের হিসেবে দেখাটা আমার ক্ষেত্রে ভুল হবে। আইন বিভাগে পড়ার সময় থেকেই বিভিন্ন মূল আইন, মামলা ও একাডেমিক পড়াশোনার মাধ্যমে একটা ভিত্তি তৈরি করার চেষ্টা করেছিলাম। এরপর BJS-কে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত ও নিবিড় প্রস্তুতি নিয়েছি। সবার জন্য আবার একই টাইম ফ্রেম প্রযোজ্যও নয়। একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক ভিত্তি, পড়ার গতি এবং দৈনিক সময় দেওয়ার সক্ষমতার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে। তবে আমার মনে হয়, নির্দিষ্ট কয়েক মাসের একটা পরিকল্পিত প্রস্তুতি অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। তবে তার আগে আইনের মৌলিক বিষয়গুলো ভালোভাবে আয়ত্তে থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সময় যতই থাকুক, শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকতা, পরিকল্পিত রিভিশন এবং দৈনন্দিন ছোট ছোট পরীক্ষা দেয়ার মাধ্যমে নিজেকে যাচাই করাটা অনেক বড় বিষয়।

একটা ব্যাপারে উপলব্ধি হয়েছিল যে শুধু অনেক বেশি পড়লেই হবে না। কীভাবে পড়ছি, কীভাবে মনে রাখছি আর পরীক্ষার খাতায় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কিভাবে সেই জ্ঞানকে কাজে লাগাচ্ছি এটাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আপনি এর আগে কোনো বিজেএস দিয়েছিলেন কিনা? দিয়ে থাকলে সেগুলোতে কৃতকার্জ না হওয়ার পিছনে কোন কোন দুর্বলতা আপনি আবিস্কার করেছেন?
আরিফ উল করিম সিয়াম: আমি এর আগে একটাই BJS দিয়েছিলাম। দূর্ভাগ্যবশত সেই ১৭ তম BJS পরীক্ষায় প্রিলিতেই বাদ পড়ে যাই। তারপর আবার নতুন উদ্যমে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে পথচলা শুরু করেছিলাম। একটা ব্যাপারে উপলব্ধি হয়েছিল যে শুধু অনেক বেশি পড়লেই হবে না। কীভাবে পড়ছি, কীভাবে মনে রাখছি আর পরীক্ষার খাতায় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কিভাবে সেই জ্ঞানকে কাজে লাগাচ্ছি এটাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুরুতেই প্রিলি পরীক্ষার বাধাটা অতিক্রম করার প্রচেষ্টা আমার সবচাইতে বেশি ছিল।

ডি জুরি সহ আরো অনেক কোচিং আপনাকে তাদের শিক্ষার্থী দাবি করছে। আপনি প্রকৃত অর্থে কোনো কোচিং এ যুক্ত ছিলেন কিনা? বিজেএস প্রস্তুতি কোচিংয়ের গুরুত্ব কতখানি বলে আপনি মনে করেন?
আরিফ উল করিম সিয়াম: অন্যান্য প্লাটফর্মের পাশাপাশি আমি ডি জুরির এক্সাম ব্যাচেও ভর্তি ছিলাম। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমার সম্মান আছে। তবে আমার BJS প্রস্তুতিকে কোনো একটি কোচিংয়ের ওপর আমি একান্ত নির্ভরশীল ছিলাম এভাবে বললে অন্যদের প্রতি একটা অবিচার করা হবে। আমি অনলাইনে বিভিন্ন প্লাটফর্মে যেখানে আইন শিক্ষার ব্যাপারে আলোচনা করা হয় সেখানে থাকতাম। ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্যান্য যেকোনো সোশ্যাল মিডিয়ার যেখানে যা পেতাম; সেখান থেকেই শেখার চেষ্টা করতাম। তাই আমি যেসব জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় একাডেমিক সহায়তা, গাইডলাইন বা পরীক্ষা-সংক্রান্ত সহযোগিতা পেয়েছি, সেই কোচিংগুলোর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমার কাছে কোচিংয়ের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো একটি সুপরিকল্পিত পরিবেশ পাওয়া, সিলেবাস সম্পর্কে ধারণা, পরীক্ষা দেওয়া, মূল্যায়ন পাওয়া এবং নিজের অবস্থান যাচাই করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মূল কাজটা পরীক্ষার্থীকে নিজেকেই করতে হয়। আইন বুঝে পড়া, মূল আইন পড়া, নিয়মিত রিভিশন দেয়া, এবং প্রতিদিন আগের দিনের চাইতে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কাজটা নিজের চেষ্টাতেই করতে হবে।

আমার কাছে কোচিংয়ের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো একটি সুপরিকল্পিত পরিবেশ পাওয়া, সিলেবাস সম্পর্কে ধারণা, পরীক্ষা দেওয়া, মূল্যায়ন পাওয়া এবং নিজের অবস্থান যাচাই করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মূল কাজটা পরীক্ষার্থীকে নিজেকেই করতে হয়।

যারা জাজ হয় তাদের প্রত্যেকেরই এক বা একাধিক স্ট্রং জোন থাকে আপনার প্রস্তুতির সবচেয়ে স্ট্রং পয়েন্ট কী ছিলো?
আরিফ উল করিম সিয়াম: আমার প্রস্তুতির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা ছিল আইনকে শুধু মুখস্থ না করে conceptually বুঝে পড়ার চেষ্টা করা। কোনো একটি section পড়ার সময় আমি চেষ্টা করতাম এর উদ্দেশ্য কী, এর সঙ্গে অন্য provision এর সম্পর্ক কী, আদালত এটাকে কীভাবে interpret করেছে এবং বাস্তব ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ কী, চেষ্টা করতাম এসব বোঝার। এর সঙ্গে নিয়মিত রিভিশন দিতাম। বিশেষ করে একটা বিষয় আমি গুরুত্ব দিয়েছি, প্রশ্ন যেভাবেই আসুক, যেন মূল legal principle-টা বুঝে নিজের ভাষায় উত্তর দিতে পারি। আর কোনো আইন বা কোন বিষয়কেই কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করি নাই। চেষ্টা করেছি সব মিলিয়ে একটা গোছানো প্রস্তুতি নিতে।

ভবিষ্যতে যারা পরীক্ষা দিবে তাদের জন্য আপনার এক্সক্লুসিভ ৫টি পরামর্শ কী থাকবে?
আরিফ উল করিম সিয়াম: ভবিষ্যৎ BJS পরীক্ষার্থীদের জন্য আমার পাঁচটি পরামর্শ থাকবে।

প্রথমত— Concept clear করুন। শুধু section মুখস্থ না করে আইনের মূলনীতি এবং provision-এর rationale বোঝার চেষ্টা করুন।

দ্বিতীয়ত— Bare Act-কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন। গাইড বা নোট সহায়ক হতে পারে, কিন্তু আইনের মূল উৎসের বিকল্প নয়।

তৃতীয়ত— Revision-এর কোনো বিকল্প নেই। নতুন নতুন বই পড়ার চেয়ে পড়া বিষয়গুলো বারবার revise করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই বই সীমিত করুন। একই বই আয়ত্তে আনুন।

চতুর্থত— নিজের প্রস্তুতিকে নিজের সঙ্গে তুলনা করুন। অন্য কে কত ঘণ্টা পড়ছে, কে কোন কোচিং করছে বা কে কতদূর এগিয়েছে, এসব নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে প্রতিদিন নিজের দুর্বলতা একটু একটু করে কমানোর চেষ্টা করুন।

পঞ্চমত— এটা সবার শুরুতে বলা উচিত ছিল। আল্লাহ না চাইলে যতই চেষ্টা করেন, পারবেন না। আল্লাহ (যার যার ধর্মমত অনুযায়ী নিজ নিজ সৃষ্টিকর্তা) কে ডাকুন। মন খুলে চাইতে থাকেন। এতটাই চাইতে থাকেন যেন রিজিকের যিনি মালিক উনি খুশি হয়ে আপনাকে সফলতা দান করেন।

সবশেষে একটা কথা বলব—BJS শুধু একটি চাকরির পরীক্ষা নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নিয়মতান্ত্রিকতার পরীক্ষা। তাই ধারাবাহিক থাকুন, নিজের ওপর এবং আল্লাহর বিশ্বাস রাখুন এবং শেষ পর্যন্ত লেগে থাকুন। হাল ছাড়বেন না। চেষ্টা করার কাজ আপনার, সফল করার দায়িত্ব আল্লাহর। মনে রাখবেন, পরিশ্রম ও প্রার্থনার সমন্বয় থাকলে সফলতা আসবেই।

‘মামলা নেই, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নেই, সার্টিফিকেশনেও সমস্যা …
  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কিশোর গ্যাং: সামাজিক সংকটের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও প্রতিকার
  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
‘বৃদ্ধ বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই জজ হয়েছি’— বিজেএসে ৬ষ্ঠ ঢাবি…
  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিক্ষা খাতে আরও অর্থায়ন চাইলেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ
  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন ২২ …
  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
লাশ উত্তোলনের ৮ মাসেও ফরেনসিক প্রতিবেদন না পাওয়ার অভিযোগ
  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬