মোস্তাফিজুর রহমান, মো. রোকন ইরফান, হাছিব আহম্মেদ ও নয়ন চন্দ্র শীল © টিডিসি ফটো
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চার বন্ধু একই বাসায় থেকে বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছেন। একে অপরের সঙ্গে পড়াশোনা ভাগাভাগি, দুর্বলতা চিহ্নিত করা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছেন লক্ষ্যের দিকে। অবশেষে ৪৫তম বিসিএসে চারজনই প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তারা হলেন মোস্তাফিজুর রহমান, মো. রোকন ইরফান, হাছিব আহম্মেদ ও নয়ন চন্দ্র শীল। মেধাতালিকায় তাদের অবস্থান যথাক্রমে ৩০তম, ৬৪তম, ৭৩তম ও ৯৮তম।
বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করে ২০২২ সালের জুনে চার বন্ধু বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন। ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের একটি ফ্ল্যাটে একসঙ্গে থেকে নিয়মিত পড়াশোনা, মডেল টেস্ট ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে প্রস্তুতি এগিয়ে নেন তারা। কোনো বিষয়ে দুর্বলতা থাকলে একে অপরকে সহযোগিতা করতেন। তারা জানান, পড়াশোনা ভাগাভাগি ও পারস্পরিক সহযোগিতা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিসিএসের প্রস্তুতির অভিজ্ঞতা, সাফল্যের গল্প এবং বিসিএসপ্রত্যাশীদের জন্য পরামর্শ নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন চার বন্ধু।
মোস্তাফিজুর রহমান
৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে ৩০তম মেধাক্রম অর্জন করেছেন বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর চার বন্ধুর একসঙ্গে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়াকে জীবনের বিশেষ অর্জন হিসেবে দেখছেন তিনি।
বিসিএসের প্রস্তুতি সম্পর্কে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুরুতে বিশাল সিলেবাস দেখে হতাশ হলেও পরে কৌশলীভাবে পড়াশোনা ও নিয়মিত পুনরাবৃত্তির ওপর জোর দেন। দীর্ঘ সময় পড়ার চেয়ে প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনা করাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তার মতে, সব বিষয় সমানভাবে মনে রাখা সম্ভব নয়। তাই কোন বিষয়গুলো থেকে তুলনামূলক সহজে বেশি নম্বর পাওয়া যায়, তা চিহ্নিত করে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

প্রস্তুতির সময় ফেসবুককেও পড়াশোনার কাজে লাগিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। বিসিএস ও চাকরির প্রস্তুতিসংক্রান্ত বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপ অনুসরণ করে সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করতেন। তিনি বলেন, বিসিএসে সফল হতে ধৈর্য, নিয়মিত অধ্যয়ন, নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং কৌশল অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি বিসিএসকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য না বানিয়ে বিকল্প ক্যারিয়ার পরিকল্পনাও রাখা উচিত।
মোস্তাফিজুর রহমানের বাবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মারা যান। তার মা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা এবং ছোট বোন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। ক্যাডার পছন্দক্রমে প্রশাসনকে প্রথমে রাখার কারণ হিসেবে কাজের বৈচিত্র্য, মানুষের কাছাকাছি থেকে সেবা দেওয়ার সুযোগ এবং পরিবারের পাশে থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। ভবিষ্যতে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চান এই নবীন কর্মকর্তা।
হাছিব আহম্মেদ
৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে ৭৩তম মেধাক্রম অর্জন করেছেন হাছিব আহম্মেদ। তার বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মিকশিমিল গ্রামে। তার বাবা আব্দুল আজিজ সরদার এবং মা সালমা বেগম।
নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানিয়ে হাছিব আহম্মেদ বলেন, ৪৫তম বিসিএস ছিল তার জীবনের প্রথম চাকরির পরীক্ষা। প্রথম চাকরির পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে সহকারী কমিশনার পদে নিয়োগের সুপারিশ পাওয়াকে তিনি মহান আল্লাহর রহমত হিসেবে দেখছেন। এ সাফল্যে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত।

হাছিব আহম্মেদ বলেন, বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করে ২০২২ সালের জুনে চার বন্ধু একসঙ্গে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন। একসঙ্গে প্রস্তুতি নেওয়ায় তাদের জন্য পড়াশোনা তুলনামূলক সহজ হয়েছিল। প্রতিদিন কী শিখেছেন, তা বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতেন। কোনো বিষয়ে দুর্বলতা থাকলে একে অপরকে তা বুঝিয়ে দিতেন এবং সেই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতা করতেন।
তিনি বলেন, একে অপরের পাশে থাকার মানসিকতা ও সহযোগিতার পরিবেশ চার বন্ধুর বিসিএস যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও নিয়মিত প্রস্তুতির মাধ্যমে তারা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পেরেছেন।
নয়ন চন্দ্র শীল
৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে ৯৮তম মেধাক্রম অর্জন করেছেন নয়ন চন্দ্র শীল। তিনি বর্তমানে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
নয়ন চন্দ্র শীল বলেন, বুয়েটের নৌযান ও নৌযন্ত্রকৌশল বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে পাঁচ বন্ধু ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের একটি ফ্ল্যাটে একসঙ্গে থাকা শুরু করেন। তাদের সামনে ছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, আর মনে ছিল স্বপ্ন পূরণের আকাঙ্ক্ষা। তার জীবনের প্রথম বিসিএস ৪৫তম বিসিএসকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় নতুন সংগ্রাম।

তিনি বলেন, চার বন্ধুর মধ্যে সহযোগিতা ও সুস্থ প্রতিযোগিতার সমন্বয় ছিল। একে অপরের সাফল্য তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হয়ে উঠত। তাদের আরেক বন্ধু পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। বাকি চারজন বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে যান। ফল প্রকাশের পর তারা জানতে পারেন, চারজনই প্রশাসন ক্যাডারে মেধাতালিকার প্রথম ১০০ জনের মধ্যে স্থান পেয়েছেন।
নয়ন চন্দ্র শীলের বলেন, ‘যে বন্ধুদের সঙ্গে একই ছাদের নিচে বসে স্বপ্ন দেখেছি, দুশ্চিন্তা ভাগ করেছি, নিজেদের প্রস্তুতিকে শাণিত করেছি, তাদের সঙ্গে একই সাফল্যের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অনুভূতি ছিল সত্যিই অতুলনীয়।’
তিনি আরও বলেন, এই সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের ত্যাগ ও ভালোবাসা, ভাই ও পরিবারের সহযোগিতা, শিক্ষক-গুরুজনদের দিকনির্দেশনা এবং অসংখ্য মানুষের শুভকামনা রয়েছে। সর্বোপরি, ঈশ্বরের আশীর্বাদ ছাড়া এই অর্জন সম্ভব হতো না বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
নয়ন চন্দ্র শীলের সঙ্গে মো. রোকন ইরফানের বন্ধুত্বের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। একই কলেজ থেকে পড়াশোনা করে তারা বুয়েটের একই বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর একসঙ্গে ক্লাস ও ল্যাব করেছেন, একসঙ্গে থেকেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষে তারা একসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চাকরিতে যোগ দেন। সেখানে প্রায় আড়াই বছর একসঙ্গে কাজ করার পর এখন প্রশাসন ক্যাডারে একই বিভাগে একসঙ্গে পদায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন।
আরও পড়ুন: ‘বিসিএসের প্রস্তুতিতে বেশি পড়ার চেয়ে কৌশলী হওয়া জরুরি’
নয়ন চন্দ্র শীল বলেন, প্রশাসন ক্যাডারে স্থান পাওয়া তার কাছে শুধু স্বপ্নপূরণ নয়, মানুষের সেবা করার নতুন অঙ্গীকার। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, স্বপ্ন দেখতে হবে, পরিশ্রম করতে হবে, বন্ধুত্বকে শক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে হবে এবং অন্যের সাফল্য থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে।
মো. রোকন ইরফান
৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে ৬৪তম মেধাক্রম অর্জন করেছেন মো. রোকন ইরফান। তিনি বুয়েটের নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিসিএসের প্রস্তুতির সময় একই বাসায় থাকা তিন বন্ধুকে নিজের সাফল্যের যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী হিসেবে দেখছেন তিনি।
রোকন ইরফান বলেন, মহান আল্লাহর রহমতে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এ অর্জনের জন্য তিনি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষে তিন সহপাঠীর সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে থাকার সিদ্ধান্ত তার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। একসঙ্গে থাকার কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়েও একে অপরের সহযোগিতা পেয়েছেন।

তিনি বলেন, বিসিএস সম্পর্কে তার খুব বেশি ধারণা ছিল না। কোন ক্যাডার কোন পছন্দক্রমে রাখা উচিত, তা বন্ধুরা তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে ৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার আগে ইউসিবি ব্যাংকে তার প্রথম চাকরি হয়। সেখানে যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন তিনি।
এ সময় বন্ধুরা তাকে পরামর্শ দেন, যেহেতু তারা তখনই বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেছেন, তাই চাকরিতে যোগ দিলে প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। মোস্তাফিজুর রহমান বিশেষভাবে তাকে অন্তত একটি বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার আগে চাকরিতে যোগ না দেওয়ার পরামর্শ দেন। বন্ধুদের সেই পরামর্শে ব্যাংকের চাকরিতে যোগ না দিয়ে পুরোপুরি প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেন রোকন ইরফান। শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করায় বন্ধুদের সহযোগিতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
আরও পড়ুন: জেলের সন্তানের পুলিশ হওয়া হলো না, বিসিএস গেজেটে নেই ঢাবির চিন্ময় বর্মণও
প্রসঙ্গত, ৩২২ দিনের অপেক্ষার পর বুধবার (১৪ অক্টোবর) ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করে সরকার। এতে তালিকা থেকে বাদ পড়েন ১০৫ জন। ২ হাজার ৩০৯টি শূন্য পদের বিপরীতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
সে সময় চলমান জটের কারণে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক এই তিন ধাপের পরীক্ষা শেষ হতে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সময় লাগে। পরে গত বছরের ৬ নভেম্বর ক্যাডার পদে মোট ১ হাজার ৮০৭ জনকে সাময়িকভাবে সুপারিশ করে ফল প্রকাশ করে পিএসসি। তাদের মধ্যে বুধবার ১ হাজার ৭০২ জনের গেজেট প্রকাশ করে সরকার।