জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবন
‘অনলাইন নীলক্ষেত’ © টিডিসি
রাজধানী ঢাকার নীলক্ষেত। শিক্ষার্থীদের কাছে কম দামে বই কেনার পরিচিত ঠিকানা। গায়ে গায়ে লাগোয়া দোকান থেকে দোকানে ঘুরে দরদাম করে পছন্দের বই খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা অনেক সময় হয়ে ওঠে এক ধরনের অভিযান। যানজটের শহরে রোদ, ঝড়, বৃষ্টি পেরিয়ে সেই অভিযানে ভোগান্তিও যোগ হয়। তুবও কাঙ্ক্ষিত বই মিলবে কি না তা নিয়ে নেই নিশ্চয়তা। আবার ঘরে পুরোনো বইয়ের স্তূপ জমা হয়। শহুরে জীবনের ছোট্ট ঘরে বেশ খানিকটা জায়গা দখল করে নেই সেই পুরোনো বইগুলো।
নতুন কিংবা পুরানো বই কেনাবেচার একটি ডিজিটাল বিকল্প তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তিন শিক্ষার্থী। জহিরুল ইসলাম, তানভীর রহমান ও আহসানুল হাবীব নামে এই তিন তরুণের উদ্ভাবনের নাম ‘অনলাইন নীলক্ষেত’। তারা এখনো স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়নরত।
এটি একটি ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নতুন ও পুরোনো বই কেনাবেচার পাশাপাশি পুরোনো বইয়ের মালিক ও সম্ভাব্য ক্রেতাকে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের।
একই সঙ্গে এর মাধ্যমে ঘরে পড়ে থাকা অব্যবহৃত বইয়ের পুনর্ব্যবহার বাড়বে এবং কাগজের অপচয় ও গাছ কাটার প্রয়োজনও কিছুটা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের জন্য নীলক্ষেত বরাবরই তুলনামূলক কম দামে বই পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কিন্তু সেখানে যেতে হলে যানজট পেরিয়ে যেতে হয়, একাধিক দোকান ঘুরতে হয় এবং অনেক সময় পছন্দের বই পাওয়া যায় না। এই সমস্যাটিকেই ডিজিটালভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

ইনোভেশন মেলার স্টল
নীলক্ষেতকে তাঁরা মূলত কম দামে নতুন ও পুরোনো বই কেনাবেচার জায়গা হিসেবে ডিজিটালভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। তাঁদের লক্ষ্য এমন একটি শিক্ষার্থী-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ঘরে বসেই বই খোঁজা ও কেনার সুযোগ থাকবে।
শুধু বই কেনাই নয়, কারও কাছে পড়া শেষ হয়ে যাওয়া বই পড়ে থাকলেও সেটি যাতে অন্যের কাজে লাগে, সেই ব্যবস্থাও রাখতে চেয়েছেন তাঁরা।
উদ্যোক্তা জহিরুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘একজনের কাছে একটি বই পড়ে আছে, আরেকজনের হয়তো সেই বইটি প্রয়োজন। বইটি ঘরে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার পরিবর্তে সেটি বিক্রি করে দেওয়া গেলে বইয়ের ব্যবহার বাড়বে। একই সঙ্গে কাগজের অপচয় এবং নতুন বই ছাপাতে গাছ কাটার প্রয়োজনও কমানো সম্ভব হবে।’
‘অনলাইন নীলক্ষেত’এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এখানে নতুন বইয়ের পাশাপাশি পুরোনো বইও পাওয়া যাবে। কোনো বই বিক্রি করতে চাইলে বিক্রেতা বা ‘মার্চেন্ট’ হিসেবে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। নাম, ই-মেইল, ফোন নম্বর ও পাসওয়ার্ড দিয়ে নিবন্ধনের পর নিজের কাছে থাকা বইগুলো প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা যাবে। এমনকি বইয়ের দাম নির্ধারণ করবেন বিক্রেতা নিজেই। কোনো ক্রেতা নির্দিষ্ট বই খুঁজলে সেটি সার্চ রেজাল্টে দেখাবে।
উদ্যোক্তারা জানান, পুরোনো বইয়ের ক্ষেত্রে শুধু বইটির নাম ও দাম নয়, এর কন্ডিশনও উল্লেখ করার সুযোগ থাকবে। বইটি কতটা ভালো অবস্থায় আছে, কতটা ব্যবহৃত এসব তথ্য দিয়ে ক্রেতাকে বই সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।ফলে ক্রেতা বই কেনার আগে সেটি নতুন না পুরোনো এবং পুরোনো হলে কী অবস্থায় রয়েছে, তা জানতে পারবেন।’

ইনোভেশন ফেয়ার
বই না থাকলেও দেওয়া যাবে চাহিদার তথ্য
প্ল্যাটফর্মটির আরেকটি ধারণা হলো ক্রেতার বইয়ের চাহিদা জানানো। কোনো শিক্ষার্থী একটি নির্দিষ্ট বই খুঁজছেন, কিন্তু সেটি প্ল্যাটফর্মে নেই এমন পরিস্থিতিতে তিনি বইটির জন্য রিকোয়েস্ট দিতে পারবেন। পরে কোনো বিক্রেতার কাছে সেই বই থাকলে এবং তিনি সেটি বিক্রি করতে আগ্রহী হলে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী বইটি সরবরাহ করতে পারবেন।
উদ্যোক্তা তানভীর রহমান বলেন, ‘এভাবে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে। কারণ প্ল্যাটফর্মটি শুধু বইয়ের তালিকা দেখানোর জায়গা হিসেবেই তৈরি করা হয়নি বরং বইয়ের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সংযোগ তৈরির একটি মাধ্যম হিসেবেও যাতে কাজ করে সেই চেষ্টা করা হয়েছে।’
উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনায় ‘অনলাইন নীলক্ষেত’ মূলত ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে একটি ডিজিটাল সেতু হিসেবে কাজ করবে। এজন্য প্ল্যাটফর্মে দুটি আলাদা অংশ রাখা হয়েছে। একটি অংশ হলো কাস্টমারের এবং অন্যটি মার্চেন্টের।
উদ্যোক্তারা জানান, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলে সহজেই সেখানে তাঁর বইয়ের তালিকা, দাম ও অন্যান্য তথ্য যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে যারা কিনতে চান তারা বই সার্চ করে পছন্দের বই নির্বাচনও করতে পারবেন।
তারা আরও জানান, বিক্রেতার জন্য আলাদা ড্যাশবোর্ডও তৈরি করা হয়েছে। সেখানে মোট কতটি বই রয়েছে, কতটি বই সক্রিয়ভাবে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে, মাসে কত টাকা আয় হয়েছে এবং কোনো বইয়ের স্টক শেষ হয়ে গেলে তার সতর্কতাসহ বিভিন্ন তথ্য দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
এখনো এটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম নয়। উদ্যোক্তারা বলছেন, বড় পরিসরে চালাতে হলে প্রয়োজন হবে বড় সার্ভার, পর্যাপ্ত ডাটা ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগ।

অনলাইন নীলক্ষেত
অনলাইনে বইয়ের অর্ডার দেওয়ার পর সেটি কীভাবে ক্রেতার হাতে পৌঁছাবে সেটিও ভেবেছেন উদ্যোক্তারা। অর্ডারের মাধ্যমে ক্রেতার প্রয়োজনীয় তথ্য বিক্রেতার কাছে পৌঁছে যাবে।পরে কুরিয়ারের মাধ্যমে বই পাঠাতে পারবেন বিক্রেতা। তবে ক্রেতা ও বিক্রেতা কাছাকাছি অবস্থান করলে সরাসরি যোগাযোগ করে বই সংগ্রহের সুযোগও রাখা হচ্ছে। এতে কুরিয়ার খরচ বাঁচানোর উপায় হিসেবে সুযোগটি রেখেছেন তারা।
তানভীর রহমান বলেন, ‘কোনো ক্রেতা ও বিক্রেতা একই এলাকার হলে তাঁরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে বই সরাসরি সংগ্রহ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কুরিয়ার চার্জের প্রয়োজন হবে না।’
উদ্যোক্তাদের চোখে এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঘরে পড়ে থাকা বইয়ের পুনর্ব্যবহার।কারণ অনেক শিক্ষার্থী একটি কোর্স বা পরীক্ষার জন্য বই কেনেন। পড়াশোনা শেষ হয়ে গেলে সেই বই বছরের পর বছর ঘরে পড়ে থাকে। পরে হয়তো বইটি আর ব্যবহারই করা হয় না। ‘অনলাইন নীলক্ষেত’-এর মাধ্যমে সেই বইটি অন্য শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে চান উদ্যোক্তারা। একজনের অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাওয়া বই অন্যজনের প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে এই ধারণাকেই প্ল্যাটফর্মটির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা।
উদ্যোক্তারা জানান, ‘এতে একদিকে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক কম দামে বই পেতে পারেন, অন্যদিকে অব্যবহৃত বইয়ের ব্যবহার বাড়বে।’
এখনো প্রোটোটাইপ, দরকার বিনিয়োগ
‘অনলাইন নীলক্ষেত’ বর্তমানে একটি প্রোটোটাইপ বা নতুন সফটওয়্যারের নমুনা পর্যায়ে রয়েছে। উদ্যোক্তারা ওয়েবভিত্তিক প্ল্যাটফর্মটির প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করেছেন। তাদের পরিকল্পনায় ওয়েবসাইটটি মোবাইল ও ল্যাপটপ দুই ধরনের ডিভাইসের জন্য ব্যবহার উপযোগী করা হবে।
জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে ‘অনলাইন নীলক্ষেত’ নামে ডোমেইন নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু সেটি ব্যয়বহুল। তাই এখনো সেটি নেওয়া সম্ভব হয়নি। আপাতত ‘provesh.online’ ডোমেইনে প্রোটোটাইপটি রাখা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘নীলক্ষেতের অভিজ্ঞতা কেবল বই কেনার সঙ্গে সম্পর্কিত এমন নয়। বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার্থীদের সময়, অর্থ ও যাতায়াতের বিষয়ও। তাই আমরা সেই পরিচিত নীলক্ষেতের ধারণাটিকেই অনলাইনে আনতে চেয়েছি। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে একজন শিক্ষার্থী ঘরে বসেই বইয়ের দাম দেখতে পারবেন, নতুন ও পুরোনো বইয়ের মধ্যে পছন্দ করতে পারবেন, বইয়ের অবস্থা জানতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে সরাসরি বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। এছাড়া কারও ঘরে পড়ে থাকা বইও আর শুধু পুরোনো কাগজের স্তূপ হয়ে থাকবে না। সেটিও হয়ে উঠতে পারে অন্য একজন শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় বই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন যদি বিনিয়োগ পাই আমরা তাহলে প্রয়োজনীয় ডোমেইন, সার্ভার ও ডাটা ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো তৈরি করে প্ল্যাটফর্মটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে।’