বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারে পুরস্কারপ্রাপ্ত পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ সফলভাবে উদ্ভাবনী প্রকল্প উপস্থাপনের জন্য তিনটি পাবলিক ও দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ স্বীকৃতি (অ্যাওয়ার্ড) দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো,গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় , খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি এবং আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিজয় সরণির নোভো থিয়েটারে তিন দিনব্যাপী বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সেরা উদ্ভাবনগুলোর জন্য নির্বাচিত দলগুলোর হাতে অর্থ ও সনদ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন।
মেলায় ৭৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক স্টল ছিল। এসব স্টলে শিক্ষার্থী, গবেষক ও উদ্ভাবকেরা তাঁদের উদ্ভাবন প্রদর্শন করেন। তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনে প্রায় ২০টি একাডেমিক, মিডিয়া ও নীতি-সংক্রান্ত সেশন, সেমিনার ও প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
এবারের মেলায় প্রোটোটাইপ ও গবেষণার পর্যায়ে থাকা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশলভিত্তিক উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকীকরণের দিকে এগিয়ে নিতে আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৬৭১টি আবেদনের মধ্য থেকে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মূল্যায়ন ও বাছাইয়ের মাধ্যমে ৫০টি উদ্ভাবনী দলকে মেলায় অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচন করা হয়। পরে বিচারকদের একটি প্যানেল এসব উদ্ভাবনের মধ্য থেকে সেরা ১০টি উদ্ভাবন নির্বাচন করে।
সেরা ১০ উদ্ভাবনের প্রত্যেকটিকে এক লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা এবং সনদ দেওয়া হয়। নির্বাচিত উদ্ভাবনগুলোকে পরবর্তী সময়ে আরও উন্নত করে বাজারজাতযোগ্য পণ্য ও সেবায় রূপ দেওয়াই এ আর্থিক সহায়তার মূল লক্ষ্য।
উদ্ভাবনী ধারণা বাস্তবায়ন এবং তরুণদের প্রতিভা বিকাশে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিবছর নিয়মিতভাবে ইনোভেশন ফেয়ার আয়োজনের মাধ্যমে দেশে নতুন উদ্ভাবন বিকাশ এবং তরুণদের প্রতিভা লালনের সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত ও সামাজিক উদ্ভাবনের ধারণাগুলোকে গবেষণার মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার পথ তৈরি করা হচ্ছে।
সচিব বলেন, মেলায় শিক্ষার্থীদের উপস্থাপিত উদ্ভাবনগুলো শুধু প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এরই মধ্যে কয়েকটি উদ্ভাবন বাজারে বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। পাশাপাশি ওমানসহ বিভিন্ন দেশে এসব উদ্ভাবন রপ্তানির নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, তিন দিনব্যাপী মেলায় উদ্ভাবন, গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট নীতিগত বিষয় নিয়ে ২০টি একাডেমিক, মিডিয়া ও নীতি-সংক্রান্ত সেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সেশনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্ভাবনের সম্ভাবনা, গবেষণা এবং নীতিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়।
সেরা ১০ উদ্ভাবন
মেলায় নির্বাচিত সেরা ১০ উদ্ভাবনের মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিবন্ধী সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সাইবার নিরাপত্তা, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও শিল্প নিরাপত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি।
হোমপিটাল নেক্সাস (Homepital Nexus): দূরবর্তী বায়োমেট্রিক ও টেলিমেডিসিন ডিভাইসের একটি নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন সুবিধা বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
স্মার্ট হুইলচেয়ার (SMART Wheelchair): আইওটি-ভিত্তিক একটি চলাচল সহায়ক ব্যবস্থা। শারীরিক প্রতিবন্ধিতা ও স্নায়বিক সমস্যায় থাকা ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের সংকেত ও চোখের অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে চলাচলে সহায়তা করার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে।
ফায়ারফ্লাই (Firefly): ইনফ্রারেড প্রযুক্তির একটি রোবট, যাতে তাপ ও গ্যাস শনাক্তকারী সেন্সর রয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচল এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে।
ভয়েস অ্যাসিস্ট ডিভাইস (Voice Assist Device): অফলাইনেও কাজ করতে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভাষা অনুবাদ ডিভাইস। দৃষ্টি ও বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে এটি তৈরি করা হয়েছে।
বিডি সাইবার হেল্প (BD Cyber Help): সাইবার হামলা ও অনলাইন হয়রানি শনাক্ত এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তৈরি একটি সমন্বিত স্বয়ংক্রিয় পোর্টাল। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
ওয়াটার রিপেলেন্ট জুট ফ্যাব্রিক (Water Repellent Jute Fabric): পানিনিরোধী ন্যানো-কোটিংযুক্ত পরিবেশবান্ধব পাটের কাপড়। পরিবেশবান্ধব উপকরণের সঙ্গে আধুনিক টেক্সটাইল প্রযুক্তির সমন্বয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে।
ন্যাচারাল ফাইবার পিসিবি (Natural Fibre PCB): পাট ও উদ্ভিদভিত্তিক বায়োকম্পোজিট দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড (পিসিবি)। ই-বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ কমানোই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
অ্যান্টেনা ফর ন্যানোস্যাট (Antenna for NanoSat): উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির সংকেত গ্রহণকারী একটি অ্যান্টেনা। ছোট ন্যানোস্যাটেলাইটের সঙ্গে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য আদান-প্রদানে এটি ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
লিকুইড ট্রি (Liquid Tree): মাইক্রোঅ্যালজি-ভিত্তিক ফটোবায়োরিঅ্যাক্টর প্রযুক্তি। কম জায়গায় শহুরে পরিবেশে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং অক্সিজেন উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে এ প্রযুক্তির।
সেলফ কনট্যাক্টর (Self Contactor): উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্মার্ট সুইচ। শিল্পকারখানার বৈদ্যুতিক সার্কিট সুরক্ষার পাশাপাশি শর্ট সার্কিট হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে এটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রোটোটাইপ ও গবেষণার পর্যায়ে থাকা উদ্ভাবনগুলোকে প্রদর্শনী প্ল্যাটফর্মের বাইরে নিয়ে বাস্তব প্রয়োগ ও উদ্যোক্তা তৈরির পর্যায়ে নিতে এ মেলায় বাণিজ্যিকীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তরুণ উদ্ভাবকদের প্রযুক্তিগত ও সামাজিক উদ্ভাবনকে গবেষণার মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে পণ্য ও সেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার পথ তৈরি করা হচ্ছে।