সরকারি কলেজে হ-য-ব-র-ল পদায়ন, নষ্ট হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ

২৫ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৪৪ PM

অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার জটলা বেঁধে আছে দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজের পদায়ন নিয়ে। এক বিভাগে পদায়ন ভাগাচ্ছেন অন্য বিভাগের শিক্ষক। এতে অনেকে আবার রাজনৈতিক ও অন্য প্রভাব থাকায় সুবিধাজনক প্রতিষ্ঠানে পদায়ন পাচ্ছেন। এ কারণে সাধারণ শিক্ষকরা আবেদন করলেও পছন্দের স্থানে পদায়ন পাচ্ছেন না। পদোন্নতি পেয়ে পদায়ন না পেয়ে শিক্ষকরা মন্ত্রণালয়ের দ্বাড়ে দ্বাড়ে ঘুরছেন।

এসব অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে একাডেমিক কার্যক্রমেও স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাঠদান, প্রশাসনিক ও পরীক্ষা কার্যক্রম। নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষক বদলির কাজ মাউশির অধীনে হওয়ার কথা। কিন্তু এ কাজ এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাতে।

জানা গেছে, শিক্ষা প্রশাসন গত এক বছরেও এই সমস্যা নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) ২-৩ মাস আগে সারাদেশের কলেজের শূন্যপদের তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিলেও পদায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা অনৈতিক পন্থায় শিক্ষক পদায়নে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কার্যক্রমে বহিরাগত একাধিক ব্যক্তির প্রভাবও রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কোন কর্মকর্তাই এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করছেন না। পদায়ন না পাওয়ায় কলেজগুলোতে শিক্ষকদের মধ্যে গ্রুপিং, বিরোধ তুঙ্গে।

গত ২০ নভেম্বর মাউশি মহাপরিচালকের কাছে এক চিঠিতে ফেনীর পরশুরাম সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবু কাওছার হারেছ বলেন, ‘এই কলেজে বর্তমানে এক হাজার ৫০০ জনের অধিক ছাত্রছাত্রী অধ্যায়নরত। কলেজে মোট ২৩ জন শিক্ষকের মধ্যে মানবিক বিভাগে মাত্র তিনজন ও ব্যবসায় শিক্ষায় একজন শিক্ষক কর্মরত আছেন শূন্য পদের নিরিখে। দিন দিন শিক্ষক স্বল্পতার কারণে পাঠদান সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞান শাখায় কোন শিক্ষকই নেই। তারপরও বিভিন্ন আদেশে (বিভাগে মাত্র একজন শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও) শিক্ষকের বদলি স্ট্যান্ড রিলিজ আদেশে এমন এক পর্যায়ে এসেছে, যে কোন সময় শ্রেণী কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৯টি সরকারি কলেজে ‘ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং’ বিষয়ের পদে দীর্ঘদিন ধরে পদায়ন রয়েছেন অন্য বিষয়ের শিক্ষক। বিশেষ করে হিসাব বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষকদের দখলে রয়েছে ‘ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং’ বিষয়ের পদগুলো।

এতে ওইসব কলেজের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার পদ অন্য বিভাগের দখলে থাকায় ‘ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং’ বিষয়ের শিক্ষকরাও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জানা গেছে, রাজধানীর দুটিসহ মোট ৯টি সরকারি কলেজে ‘ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং’ বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। কলেজগুলো হলো- ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজ ও সরকারি ইডেন মহিলা কলেজ, খুলনার আযম খান সরকারি কমার্স কলেজ, টাঙ্গাইলের সরকারি সাদাত কলেজ, বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ, খুলনার সরকারি বিএল কলেজ, বরিশালের সরকারি বিএম কলেজ, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ এবং ময়মনসিংহের সরকারি আনন্দমোহন কলেজ।

এই ৯টি সরকারি কলেজে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে শিক্ষকের মোট পদ ৩১টি। এর মধ্যে প্রভাষক পদের সংখ্যা ১৩টি, সহকারী অধ্যাপক পদের সংখ্যা ১১টি, সহযোগী অধ্যাপক পদের সংখ্যা ছয়টি এবং অধ্যাপক পদের সংখ্যা একটি। এসব পদের অধিকাংশেই হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ের শিক্ষকরা পদায়ন আছেন।

পদগুলো অন্য বিভাগের শিক্ষকদের দখলে থাকায় ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ের শিক্ষকরা পদায়ন ও পদোন্নতি বঞ্চিত হচ্ছেন; যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পাঠদানে।

এ ব্যাপারে মাউশি পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) প্রফেসর শাহেদুল খবির চৌধুরী বলেন, ‘কয়েকটি কলেজে এই সমস্যা রয়েছে। শিগগিরই বিষয়টি সমাধান হবে। পদ স্বল্পতার কারণেই কয়েকটি কলেজে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে অন্য বিষয়ের শিক্ষক পদায়ন দেয়া হয়েছিল। তবে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ের শিক্ষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। বিষয়টি মাথায় নিয়ে এবার পদোন্নতির কার্যক্রম চলছে।’

এ ছাড়া সরকারি সাদাত কলেজে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে সহকারী অধ্যাপকের একমাত্র পদে পদায়ন আছেন ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ মেজবাউল হক, বরিশালের সরকারি বিএম কলেজে সহকারী অধ্যাপকের একমাত্র পদে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মতিউর রহমান, সরকারি আজিজুল হক কলেজে সহকারী অধ্যাপকের একমাত্র পদে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান, খুলনার সরকারি বিএল কলেজে সহকারী অধ্যাপকের একমাত্র পদে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেখ মামুনুর রহমান পদায়ন রয়েছেন।

এভাবে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে এমন কলেজগুলোতে সহযোগী অধ্যাপকের বিপরীতে তিনজন এবং সহকারী অধ্যাপকের বিপরীতে পাঁচজন শিক্ষক নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে কোন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে পদে পদায়ন নিয়েছেন।

ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়টি বড় শহরগুলোর বড় কলেজগুলোতে থাকার কারণে এসব শিক্ষক পদের বিপরীতে পদায়নের সুযোগ নিয়েছেন। এর ফলে মূল বিষয়ের শিক্ষকরা বড় কলেজগুলোতে পদায়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন; এমনকি ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ের মূল শিক্ষকরা তাদের কারণে পদোন্নতি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

নির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকদের পাঠদান শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারছেন না বলে জানিয়েছে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ের দু’জন শিক্ষার্থী। তারা আরও জানান, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ের বিভিন্ন কোর্সের ধারণাগুলো তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। কারণ তাদের যারা পড়ান তারা হিসাববিজ্ঞান এবং ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক।

শিক্ষকরা ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে ভালোভাবে পাঠদান করতে পারছেন না। এর ফলে পাঠ গ্রহণে আগ্রহ হারাচ্ছে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ের শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি তিতুমীর কলেজে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে সহযোগী অধ্যাপকের একটি পদে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রওশন আরা বেগম পদায়নরত আছেন। এভাবে সরকারি ইডেন মহিলা কলেজ ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে সহযোগী অধ্যাপকের দুটি পদের একটিতে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খায়রুল বাশার খান এবং সহকারী অধ্যাপকের দুটি পদের একটিতে ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আমিনুর রহমান খান ইনসিটু অবস্থায় এবং অন্যটিতে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাউছার আক্তার, আযম খান সরকারি কমার্স কলেজে সহযোগী অধ্যাপকের একমাত্র পদেই ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কল্লোল কুমার রক্ষিত পদায়ন আছেন।

২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত বিভিন্ন বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপকের পদোন্নতির গেজেটে দেখা যায়, জ্যেষ্ঠতা তালিকায় ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে পদোন্নতিযোগ্য শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও তাদের পদোন্নতি দেয়া হযনি। কলেজগুলো থেকে শিক্ষকদের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ের যে শূন্য পদের তালিকা মাউশিতে প্রেরণ করে তাতে পদের বিপরীতে কর্মরত অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা পদায়নরত থাকায় ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ের পদগুলো শূন্য দেখানো হয় না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সাবেক সভাপতি প্রফেসর আইকে সেলিম উল্লাহ খন্দকার বলেন, ‘পদায়ন কেন যে হচ্ছে না, বুঝতে পারছি না। শিক্ষকরা পদোন্নতি পেয়েছেন বহু আগে; শূন্য পদও আছে।’

পদায়নের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নীতিমালা না থাকায় জুনিয়র অনেক কর্মকর্তা বড় পদে পদায়ন নিচ্ছেন, আবার সিনিয়র অনেক কর্মকর্তা পদায়ন না পেয়ে অবসরে যাচ্ছেন। এতে কিছু সমস্যা তো হচ্ছেই।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পদোন্নতি পাওয়া প্রায় এক হাজার ৬৮৬ শিক্ষক এখনও ইনসিটু হিসেবে নিচের পদে চাকরি করছেন। এর মধ্যে অধ্যাপক ৩১৪ জন, সহযোগী অধ্যাপক ৭১২ জন এবং সহকারী অধ্যাপক ৬৪০ জন।

তাদের মধ্যে সম্প্রতি বেঁছে বেঁছে ৩০/৪০ জন শিক্ষককে পছন্দের স্থানে পদায়ন করেছে মন্ত্রণালয়। পদোন্নতি পাওয়া শিক্ষকদের পদায়ন না হওয়ায় শিক্ষকদের পদোন্নতিও ঝুঁলে রয়েছে। এতে শিক্ষা ক্যাডারে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।

মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শীর্ষ ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কাজে যথাযথ সময় দিতে না পারার কারণে পদোন্নতি পাওয়া শিক্ষকদের পদায়ন ঝুঁলে রয়েছে। তবে যাদের তদবিরের যোগ্যতা ও প্রভাব রয়েছে যেসব শিক্ষক পছন্দের পদে পদায়ন পাচ্ছেন। শিগগিরই পদোন্নতির কার্যক্রম শুরু হবেও ওই কর্মকর্তা জানান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) ও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সদস্য সচিব প্রফেসর শাহেদুল খবির চৌধুরী বলেন, ‘পদায়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তারা নীতিমালার আলোকেই সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে পদায়ন করেন।’

তিনি জানান, ‘খুব শিগগিরই শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতির কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এ সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম গুছিয়ে রাখা হয়েছে।’

ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের দু’জন শিক্ষক বলেন, ‘অতিসত্বর ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ের বিপরীতে পদায়নরত বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষককে তাদের মূল পদে পদায়ন করতে হবে। অন্যথায় আবারও মূল বিষয়ের শিক্ষকরা পদোন্নতি বঞ্চিত হবেন।’

সরকারি প্রজ্ঞাপনে নিজের নাম বসিয়ে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতা…
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলে আহত ৬ হাজার
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি বিষয়ভিত্তিক র‍্যাঙ্কিংয়ে এনএসইউ…
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
পুলিশের হাতে রাহুলের পানিতে ডোবার ফুটেজ, যা বলছেন এসপি
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
মাঠ চাইলেন সাবিনা, প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘অলমোস্ট ডান’
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
৯ এপ্রিল তিন উপজেলায় সাধারণ ছুটি
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence