মাভাবিপ্রবি © সংগৃহীত
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) ফজিলাতুন্নেছা জোহা ছাত্রী আবাসিক হলে তল্লাশি চালিয়েছে হল প্রশাসন। এ সময় শিক্ষার্থীদের রান্নার কাজে ব্যবহৃত ব্যক্তিগত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। বিনা নোটিশে এই অভিযানে পুরুষ হাউস টিউটরের অবস্থানকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ জন্ম দেখা গেছে।
আজ রবিবার (১৯ এপ্রিল) দুপুর ১২ টার দিকে ফজিলাতুন্নেছা জোহা হলের ৮ম, ৯ম ও ১০ম তলায় তল্লাশি চালায় হল প্রশাসন। এ সময় শিক্ষার্থীদের কক্ষ থেকে ইন্ডাকশান, রাইসকুকার, হিটার ইত্যাদি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম জব্দ করে হলের অফিস কক্ষে নিয়ে আসা হয়।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হলের খাবারের মান খুবই খারাপ। এই খাবার খেয়ে একজন প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর পুষ্টির চাহিদা মেটানো সম্ভব না। এতে একরকম বাধ্য হয়েই তাদের বাড়তি খাবার রান্না করে খেতে হয়। আবার বিনা নোটিশে পুরুষ হাউস টিউটরের প্রবেশের বিষয়েও তারা অভিযোগ করেন। তবে হল প্রশাসন বলছে, নোটিশ দিলে শিক্ষার্থীরা আগেই এসব জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলত। তাই বিনা নোটিশে তল্লাশি চালানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে দুর্ঘটনা এড়াতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানান হল প্রাধ্যক্ষ।
এ বিষয়ে ফজিলাতুন্নেছা জোহা হলে একজন আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের আগে থেকে কিছু ইনফর্ম করা হয়নি, কিছুই বলা হয়নি হুট করে এসে নিয়ে গেল সব। হলের খাবারে দুই দিন আগেও কাচাঁ মাছ পাওয়া গেছে, প্রত্যেক দিন একটা মানুষের খাবারের চাহিদা যতটুকু তার ১০ শতাংশও হলের খাবার খেয়ে পূরণ হয় না। হল কর্তৃপক্ষকে কতদিন ধরে বলা হচ্ছে হলে গ্যাস সংযোগ দেবার জন্য, উনারা পানির ব্যবস্থা-ই ঠিক করতে পারেন না আবার গ্যাস আনবেন সেটা তো ভাবাই বিলাসিতা। তাই রুমে টুকটাক ডিম, দুধ এনে খাই সেটাও বন্ধ করাতে চাচ্ছে। পড়াশোনা করতে গিয়ে যে একটা টাইমে না খেয়ে মরতে হবে সেটা কখনো ভাবতে পারিনি। এটাতো আসলে অমানবিকতা ছাড়া আর কিছুই না।
হলের একজন অসুস্থ শিক্ষার্থী তার ভোগান্তির বিষয়টি সামনে এনে বলেন, আমরা রুমের সবাই রুমে বিশ্রামরত ছিলাম। হঠাৎ দরজায় জোরে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। দরজা খুলে দেখি প্রভোস্ট, হাউস টিউটর স্যার, সহকারী রেজিস্ট্রার ও আনসার সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তখন অগোছালো অবস্থায় ছিলাম। প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগও পাইনি। তারা সরাসরি রুমে ঢুকে এসে খাটের নিচ থেকে একটি কুকার নিয়ে চলে যান। যদিও সেটি ব্যবহার করা হচ্ছিল না এবং মাল্টিপ্লাগও সংযুক্ত ছিল না।
এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, আমার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। প্রায় তিন মাস ধরে অসুস্থ, ডান পাশে ঠিকমতো অনুভূতি নেই। চিকিৎসক বলেছেন সুস্থ হতে অন্তত এক বছর সময় লাগবে। আমি এখন রান্না করতে পারি না, তবুও চিকিৎসার প্রয়োজনে প্রতিদিন ডিম সিদ্ধ খেতে হয়। কুকারটি নিয়ে যাওয়ায় আমি সেই প্রয়োজনটুকুও পূরণ করতে পারিনি।
হলের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, পুরুষ হাউস টিউটরের উপস্থিতির কারণে আমরা বেশ বিব্রত বোধ করেছি। মেয়েদের হলের হাউস টিউটর কেন একজন পুরুষ হবেন? আর হলেও তিনি কেন এভাবে বিনা নোটিশে আসবেন?
এছাড়া, হলের মিলের খাবারের মান অত্যন্ত খারাপ এবং গ্যাস সংযোগ না থাকায় আমরা বাধ্য হয়ে ইলেকট্রিক সরঞ্জাম ব্যবহার করি। যদি হলে গ্যাসের ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে এসবের সরঞ্জামের প্রয়োজন হতো না। অনেকেই তখন রুমে ছিলেন না, এমনকি কেউ কেউ হলেই উপস্থিত ছিলেন না। তবুও তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র জব্দ করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক। যেই মানুষটি রুমে নেই তার অবর্তমানে তার জিনিস জব্দ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?
খাবারের মান নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হলের ছাত্রীরা। তাদের ভাষ্য, গত কয়েকদিনের মিলের তরকারিতে বেগুনের পোকা, তরকারির মাছে রক্ত পাওয়া গেছে। তরকারিতে ঝোল শেষ হলে পানিও ঢেলে দেয় এমন অবস্থা। আর ইদানীং সবজি বাদে শুধু আলুর তরকারি দেওয়া হচ্ছে। দুই দিন আগে কাঁচা মাছও পরিবেশন করা হয়েছে। খাবারের মান এতটাই খারাপ যে অনেকেই মিল থেকে খাবার নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
এ বিষয়ে ফজিলাতুন্নেছা জোহা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোছা. চাঁদ সুলতানা খাতুন বলেন, আমাদের কাছে তথ্য ছিল কিছু কিছু কক্ষে বৈদ্যুতিক হিটার ব্যবহার করা হচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিটার থেকে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে যার ফলে ছাত্রীদের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। ইন্ডাকশান, কুকার সেগুলো নাহয় মানা গেল কিন্তু হিটার ব্যবহার করা কতটা বিপজ্জনক সেটি একজন শিক্ষার্থীর বোঝা উচিত। এছাড়াও সকল কক্ষের বারান্দায় কাপড় শুকানোর হুক লাগানোর পরেও ইমার্জেন্সি এক্সিট সিঁড়ির সামনে কিছু শিক্ষার্থীরা রশি টেনে কাপড় শুকাতে দেয়। যার ফলে সিঁড়ি থেকে উঠানামা করা এবং সিঁড়ি পরিস্কার করাতে সমস্যা হয়। আর ইমার্জেন্সি এক্সিট তো থাকা উচিত সম্পূর্ণ খোলামেলা। ওই স্থানটি তো কাপড় শুকানোর জন্য নয়। এসব বিষয়ের জন্য মূলত আমি এবং হাউজ টিউটর স্যার/ ম্যাডাম গিয়েছিলাম। এরপর তল্লাসি কার্যক্রম চালিয়ে ইন্ডাকশান, রাইসকুকার, হিটার অফিস কক্ষে নিয়ে আসা হয়েছে। তবে সেটা শুধুমাত্র মেয়েদের সতর্ক করার উদ্দেশ্যে।
তিনি বলেন, বিনা নোটিশে না গেলে শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই সচেতন হয়ে সরঞ্জাম লুকিয়ে ফেলত। আর পুরুষ হাউস টিউটর প্রথমে দশতলা অবধি গিয়ে লিফটের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন এরপর আনসাররা প্রতি ফ্লোরের শিক্ষার্থীদের জানান পুরুষ হাউস টিউটরের ফ্লোরে প্রবেশ সম্পর্কে।
শিক্ষার্থীদের হলের খাবারের মান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মূলত এই বিষয়টিকেই কেন্দ্র করেই আজ হলে যাওয়া হয় এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে হলের বাবুর্চিসহ খাবার তৈরি বিষয়ের সাথে যারা যুক্ত আছেন সকলকেই সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়াও হলের শিক্ষার্থীদের গ্যাসের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণেও নানাভাবে চেষ্টা চলমান রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।