ঢাবির সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের তৃতীয় সেমিস্টারের মিডটার্ম পরীক্ষার ‘আইসিটি’ কোর্সের প্রশ্ন © টিডিসি সম্পাদিত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক পরীক্ষার প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তুমুল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্নটির মান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘এটি মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রশ্ন যেন। কোনোভাবেই তা স্নাতক পর্যায়ের নয়।’ এ ছাড়াও অনেকে গুরুতর অভিযোগ করেছেন, সাংবাদিকতা বিভাগ যেন কপি–পেস্ট শেখাচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নটি সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের তৃতীয় সেমিস্টারের মিডটার্ম পরীক্ষার ‘আইসিটি’ কোর্সের প্রশ্ন। সেখানে নানা শিশুসুলভ প্রশ্ন ছিল, যা শিক্ষার্থীদের হাস্যরসের জোগান দিয়েছে। পরে সেটি নেটিজেনদের মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) ঢাবি–কেন্দ্রিক বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে প্রশ্নটি ভাইরাল হয়। সমালোচকরা বলেন, স্নাতক পর্যায়ের এ প্রশ্নে কোনো জটিল তত্ত্ব বা ব্যবহারিক জ্ঞান যাচাইয়ের উপাদান নেই, বরং এটি মাধ্যমিক স্তরের সাধারণ প্রশ্নের মতো।
সমালোচকরা বলেন, স্নাতক পর্যায়ের এই প্রশ্নে আইসিটি নিয়ে জটিল, তাত্ত্বিক কিংবা প্রায়োগিক কোনো প্রশ্ন নেই। শুধু বেসিক কিছু প্রশ্ন রাখা হয়েছে, যে প্রশ্নগুলো সাধারণত মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এম আয়াতুল্লাহ বেহেস্তি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ বিভাগের সিলেবাসই সেকেলে আর বিরক্তিকর। প্রশাসনের অবশ্যই এই সিলেবাস নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। এখন ১৯৮০–৯০ চলছে না, এটা ২০২৫। শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও সময়োপযোগী করতে হবে।
আরও পড়ুন: ৭.৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি, নভেম্বর থেকে কার কত টাকা বাড়বে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, প্রতিদিন দীর্ঘ জার্নি করে ক্যাম্পাসে আসি। দিন শেষে দেখি ভার্সিটি আমাকে কপি–পেস্ট করা শিখাচ্ছে। প্রতি বছর ঢাবি শত কোটি টাকার ফান্ড পায়, টাকা কই যায়? আবাসন ঠিক নাই, খাবার ঠিক নাই, ফ্যাকাল্টি ঠিক নাই। অফিসিয়াল ছুটির বাইরেও শিক্ষকরা বিদেশে গিয়ে বসে থাকেন। অধিকাংশ শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে আসেন না।
ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, এ শিক্ষকদের অনেকেই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নেন। সেখানে এমন যদি তারা করতেন, তাহলে বিল্ডিং থেকে ছুড়ে মারা হতো তাদের।
প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এত বাজেট কই যায়? আমরা কেন একটা ভালো পরিবেশ, একটা ভালো মানসম্মত সেমিস্টার পাব না? যোগ্যতা কম আমাদের? নাকি পাবলিকে পড়ি বলে সস্তা হয়ে গেছি?
একই ব্যাচের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমার ক্লাসের ষষ্ঠ শ্রেণির স্টুডেন্টকে যা পড়িয়েছি, আইসিটি তাই আসছে আমার পরীক্ষায়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, এই কোর্সটি প্র্যাকটিক্যাল কোর্স। কোর্স শিক্ষক হিসেবে সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল হককে রাখা হয়েছে। তবে তিনি কেবল থিওরিটিক্যাল বিষয়গুলো পড়ান। সেমিস্টার শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি কোনো ক্লাস নেননি। প্র্যাকটিক্যাল বিষয়গুলো ল্যাব সহকারীরা দেখেন। এ প্রশ্নটা সম্ভবত তারাই করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল হক বলেন, এ কোর্স আমি পড়াই না। এটি একটি আইসিটি স্কিল কোর্স, যা ল্যাব ইনস্ট্রাক্টররা পরিচালনা করেন। এই কোর্সে মূলত মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, পাওয়ারপয়েন্ট, এক্সেল ইত্যাদি সফটওয়্যারের বেসিক হাতেখড়ি দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, কোর্সটি চালু করার মূল কারণ হলো, আমরা দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা আসে। আমরা সাধারণত ধরে নিই, সবাই কম্পিউটার লিটারেট, কিন্তু বাস্তবতা একদমই ভিন্ন। গত বছর আমরা দেখেছি, অনেক ছাত্রছাত্রী ফাইল খুঁজে পেতে বা ফাইল ট্রান্সফার করতে পর্যন্ত পারছিল না।
তিনি আরও বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থী অত্যন্ত কষ্ট করে আসে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষার্থী স্কুল–কলেজ পর্যায়ে আইসিটি শেখার সুযোগ পায় না, কিংবা তাদের জন্য সে সুযোগ সৃষ্টি করা হয় না।
তিনি আরও বলেন, এই কোর্সের প্রধান উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীরা যেন কম্পিউটারের বেসিক বিষয়গুলো শিখতে পারে। এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা, যেখানে শুধু শহুরে নয়, বরং বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও অংশ নেয়, যাদের অনেকেই কম্পিউটারের প্রাথমিক ধারণা জানে না।
ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, এটি মূলত প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কোর্স, যেখানে বেসিক বিষয় শেখানো হয়, যাতে তারা পরবর্তী একাডেমিক জীবনে প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
তিনি আরও বলেন, আমরা জানি, মাইক্রোসফট সফটওয়্যারে অসংখ্য ফিচার ও কাজ রয়েছে, যেগুলো সবাই জানে না। এই কোর্সের প্রকৃতিটাই এমন, শিক্ষার্থীরা যেন এসব বেসিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে।