রবিবার মিল্টন হলে এই গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় © সংগৃহীত
ক্যান্সার শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসায় সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এ আহ্বান জানান বিশেষজ্ঞরা। অনুষ্ঠানে ক্যান্সার প্রতিরোধ, আধুনিক চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ, গবেষণা ও জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধন কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আজ রবিবার (১৮ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মিল্টন হলে ‘অ্যাডভান্সিং ক্যান্সার এডুকেশন, রিসার্চ অ্যান্ড কেয়ার: বিএমইউ’স ভিশন অ্যান্ড লিডারশিপ’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ এবং বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ) যৌথভাবে এই বৈঠকের আয়োজন করে। ২১ বছর আগে ২০০৫ সালে ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের যাত্রা শুরু হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী ক্যান্সার শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসাসেবায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ক্যান্সার চিকিৎসার উন্নয়নে শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো সম্প্রসারণই যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, দক্ষ জনবল তৈরি, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
উপাচার্য বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ ধরনের ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্সার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ এবং সহযোগী বিশেষায়িত বিভাগগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা, স্নাতকোত্তর শিক্ষা, গবেষণা, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

গোলটেবিল বৈঠকে বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনায় ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে ক্যান্সার চিকিৎসা, স্নাতকোত্তর শিক্ষা, গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা, অর্জন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন। তিনি ক্যান্সার চিকিৎসায় ক্লিনিক্যাল অনকোলজি, মেডিকেল অনকোলজি, সার্জিক্যাল অনকোলজি, প্যাথলজি, রেডিওলজি, নিউক্লিয়ার মেডিসিন, মেডিকেল ফিজিকস এবং অন্যান্য সহযোগী বিশেষায়িত বিভাগগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তার উপস্থাপনায় মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ড, গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা, আধুনিক রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক উঠে আসে। আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা এবং উচ্চ উদ্ধৃতিসম্পন্ন গবেষণাপত্রের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক একাডেমিক মর্যাদা ও বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে অবদান রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে ক্যান্সার চিকিৎসার উন্নয়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষায়িত ক্যান্সার চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। আধুনিক যন্ত্রপাতির পাশাপাশি প্রশিক্ষিত ক্লিনিক্যাল অনকোলজিস্ট, মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট, দক্ষ নার্সিং জনবল, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশে ক্যান্সারের প্রকৃত পরিস্থিতি নিরূপণ, কার্যকর জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ এবং গবেষণা জোরদারের লক্ষ্যে একটি জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। আলোচনায় তামাক নিয়ন্ত্রণ, এইচপিভি টিকাদান, জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সারের স্ক্রিনিং, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের অন্যান্য চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়।
এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্যান্সার গবেষণা, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল ফিজিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নতুন চিকিৎসাপ্রযুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ওষুধশিল্প ও রেডিওথেরাপি প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তি, গবেষণা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে সম্ভাব্য সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তোলা গেলে দেশে ক্যান্সার শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসার মান আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে সাবেক উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টাল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া এতে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সভাপতি প্রতীক এজাজ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। তারা দেশের ক্যান্সার পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা, আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার অগ্রগতি গণমাধ্যমে যথাযথভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বক্তারা বলেন, ক্যান্সার সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা, চিকিৎসা গ্রহণে বিলম্ব কমানো এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০০৫ সালের ১৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ গত ২১ বছর ধরে ক্যান্সার চিকিৎসা, স্নাতকোত্তর শিক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি এবং গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিভাগটির প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন।
বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিভাগটিতে বর্তমানে রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপিসহ বিভিন্ন আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্নাতকোত্তর চিকিৎসা শিক্ষা, নিয়মিত মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ড, আধুনিক চিকিৎসা পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিভাগটির দীর্ঘ ২১ বছরের অগ্রযাত্রাকে আরও এগিয়ে নিতে আধুনিক অবকাঠামো, গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ বিশেষজ্ঞ জনবল তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।