বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল © টিডিসি ছবি
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) লাল ফিতার দৌরাত্মে স্থবির সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল স্বাধীনভাবে পরিচালনার জন্য নতুন আইন পাসের ৩ মাসেও প্রতিষ্ঠানটি চালুর দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এখনও আলোচনার টেবিলেই আটকে আছে সব ধরনের কার্যক্রম। অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি প্রস্তুত থাকলেও মূলত জনবল কাঠামো প্রস্তুত না হওয়ায় সেবা মিলছে না প্রতিষ্ঠানটির। এমনকি কোম্পানি আইনে প্রতিষ্ঠান চললে পুরোনো জনবলের কী হবে—এই প্রশ্নেরও কোনো সমাধান মেলেনি। এ অবস্থায় কবে নাগাদ হাসপাতালটি চালু হচ্ছে, তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না কেউ।
এ ছাড়া হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মাণে ত্রুটির কথাও বলছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পুরোদমে চালুর আগে সংস্কারের প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন তারা। এ ছাড়া হাসপাতাল পরিচালনার জন্য ১০০ কোটি টাকার একটি ফান্ড নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে। সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় চাচ্ছে এই অর্থ সরকারের কাছ থেকে আদায় করতে, যদিও সরকারের আগ্রহ—এ অর্থ বহন করবে বিশ্ববিদ্যালয়।
এদিকে চূড়ান্ত না হলেও হাসপাতালের বিদ্যমান জনবলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালের একটি সূত্র। চলতি মাসের শেষ অথবা আগামী মাসের শুরুতে ধাপে ধাপে এসব জনবলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত নেওয়া হতে পারে বলে দাবি তাদের। তবে চূড়ান্ত জনবল নিয়োগের আগে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে হাসপাতালটি পুনরায় অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অত্যাধুনিক চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে ২০১৮ সালে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। সম্পূর্ণ প্রস্তুত হওয়ার আগেই ২০২২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (জুলাই গণহত্যার মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামী) শেখ হাসিনা হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন। প্রকল্পের সর্বশেষ সংশোধিত হিসাব ও বাজেট অনুযায়ী এই আধুনিক হাসপাতালটি নির্মাণে সর্বমোট ১ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
হাসপাতালটির ডিজাইন এবং নির্মাণে বেশ কিছু ত্রুটি আছে। নির্মাণের খুবই বাজে অবস্থা। সিলিং খসে খসে পড়ছে। এমনকি শিশুদের জন্য যে ওয়ার্ড বানানো হয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত স্পেস নেই। এমন বিভিন্ন সমস্যা আমরা চিহ্নিত করেছি। অনেক কিছুই সংস্কার করতে হবে। আশা করছি, সব জটিলতা কাটিয়ে খুব দ্রুত হাসপাতালটি চালু করতে পারব— অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
তবে উদ্বোধনের ৪ বছরেও হাসপাতালটির সেবা মেলেনি। আংশিক সেবা চালু হলেও তা যৎসামান্য। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ চালু করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালনা সহজ করা এবং চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে চলতি বছরের ২৩ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়। বিএমইউ ও হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, এই আইনের অধীনে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯০ শতাংশ এবং সরকারের ১০ শতাংশ শেয়ার থাকবে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই এই কর্পোরেট মডেল প্রয়োজন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, এর ফলে ভালো বেতন দিয়ে যোগ্য ও দক্ষ চিকিৎসকদের নিয়োগ দেওয়া সহজ হবে।
কেমন হবে জনবল কাঠামো
বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল পরিচালনার জন্য দ্রুত আলাদা পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন বিএমইউ উপাচার্য এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে একজন উপ-উপাচার্যকে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি কর্পোরেট হাসপাতাল পরিচালনায় অভিজ্ঞ একজনকে বাইরে থেকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া বিএমইউর বর্তমান চিকিৎসক ও নার্সরা এখানে কাজ করবেন না। একই সাথে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মী প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না—এমন পরিকল্পনাও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। এর বিনিময়ে হাসপাতাল থেকেই তাদের ভালো বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে।
সূত্র বলছে, হাসপাতালের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য সহায়ক সেবা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে দক্ষ প্রতিষ্ঠানের কাছে আউটসোর্স করা হবে। চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য জনবল বাইরে থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। সব জনবলই নিয়োগ পাবেন চুক্তিভিত্তিক।
এদিকে পুরো হাসপাতালের জনবল চুক্তিভিত্তিক হলে পুরোনো জনবলের কী হবে—এমন প্রশ্নের কোনো মীমাংসা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জনবল নিয়োগসহ সব ধরনের জটিলতা নিরসন এবং হাসপাতালটি পুরোদমে চালু করার লক্ষ্যে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন বিএমইউর উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ এবং সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার বৈঠকে বসেছে এই কমিটি। যদিও এখনও কোনো সমাধানে আসতে পারেননি তারা।
এ অবস্থায় সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের জনবল হিসেবে নিয়োগ পাওয়া প্রায় ৩০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ-পদবী ও কর্মস্থল ঝুলে আছে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত না হলেও হাসপাতালের বিদ্যমান জনবলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সিইওসহ জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আমরা শীঘ্রই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া শুরু করব। হাসপাতালটি সম্পূর্ণ চুক্তিভিত্তিক জনবল দিয়ে চলবে। আর বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী। তবে তাদের কোথায় রাখা হবে এটা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আরও আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে— অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি সভা হয়েছে। এসব সভায় হাসপাতাল পরিচালনার জন্য সম্পূর্ণ নতুন জনবল নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনার সার হচ্ছে—শুধুমাত্র চুক্তিভিত্তিক জনবল দিয়ে হাসপাতালটি পরিচালনা করা হবে।
তিনি বলেন, বিএমইউর চিকিৎসক-নার্সদের বাদ দিয়ে উচ্চমূল্যে চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য জনবলেও বেতনকাঠামোও বাড়বে। ফলে বিএমইউর অধীনে নিয়োগ পাওয়া বিদ্যমান জনবলের সঙ্গে বেতন-বৈষম্য তৈরি হবে। এ অবস্থায় এসব জনবলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত নেওয়া ছাড়া কার্যত কোনো উপায় নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বর্তমান জনবল নিয়োগের সময় ভালো বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিয়োগের পর বিশ্ববিদ্যালয় তা কার্যকর করেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য জনবলের মতোই বেতন নির্ধারণ করেছে। তবুও এখন যদি চুক্তিভিত্তিক জনবল দিয়ে হাসপাতাল পরিচালনা করা হয়, তাহলে বর্তমান জনবলকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
তিনি আরও বলেন, তবে স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিকল্প উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। কারণ এসব কর্মী দীর্ঘদিন এই প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থাকায় এটি পরিচালনায় তাদের একটি অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় যদি চায় তাহলে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে লিয়েনে এখানে রাখতে পারে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই বেতন সামঞ্জস্যতার বিষয়টি নজরে রাখতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে হাসপাতাল পরিচালক এবং জটিলতা নিরসন ও হাসপাতালটি পুরোদমে চালু করার লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সীর সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী মন্তব্য করতে রাজি হননি। উপাচার্যের কার্যালয় জানিয়েছে, শীঘ্রই প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সিইওসহ জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আমরা শীঘ্রই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া শুরু করব।
তিনি বলেন, হাসপাতালটি সম্পূর্ণ চুক্তিভিত্তিক জনবল দিয়ে চলবে। আর বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী। তবে তাদের কোথায় রাখা হবে এটা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আরও আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
হাসপাতালটি কবে নাগাদ চালু হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে কোনো সদুত্তর দেননি উপ-উপাচার্য। তিনি বলেন, হাসপাতালটির ডিজাইন এবং নির্মাণে বেশ কিছু ত্রুটি আছে। নির্মাণের খুবই বাজে অবস্থা। সিলিং খসে খসে পড়ছে। এমনকি শিশুদের জন্য যে ওয়ার্ড বানানো হয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত স্পেস নেই। এমন বিভিন্ন সমস্যা আমরা চিহ্নিত করেছি। অনেক কিছুই সংস্কার করতে হবে। আশা করছি, সব জটিলতা কাটিয়ে খুব দ্রুত হাসপাতালটি চালু করতে পারব।