বন্ধ্যা নারীরা ভোগেন তীব্র মানসিক ট্রমায়, পুরুষের সংকট যৌন স্বাস্থ্যে: গবেষণা

০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২০ PM
বন্ধ্যত্বের কারণে মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারীর, পুরুষের যৌন স্বাস্থ্য

বন্ধ্যত্বের কারণে মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারীর, পুরুষের যৌন স্বাস্থ্য © এআই নির্মিত

সন্তান না হওয়া বা বন্ধ্যত্বের বেদনা কেবল শারীরিক কোনো জটিলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। গবেষণা বলছে, নীরব এক মনস্তাত্ত্বিক ঝড় হয়ে তা আঘাত হানে দম্পতির দাম্পত্য ও ব্যক্তিগত জীবনে। তবে সেই ঝড়ের রূপ নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে প্রকাশ পায় সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বন্ধ্যত্বের দীর্ঘ ও ক্লান্তিহীন চিকিৎসার ভারী বোঝা বইতে গিয়ে নারীরা যখন চরম হতাশা ও মানসিক ট্রমার শিকার হচ্ছেন, তখন পুরুষদের ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়ছে তাদের যৌন স্বাস্থ্য ও মানসিক ভারসাম্যে। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের বন্ধ্যা নারীদের এই মানসিক ট্রমা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার ছাড়া টানা এক বছর শারীরিক সম্পর্কের পরও সন্তান না হলে সেটিকে বন্ধ্যাত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তথ্য বলছে, বিশ্বব্যাপী ৮ থেকে ১০ শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যাত্ব সমস্যায় ভোগেন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) গবেষকরা এবার গুরুত্ব দিয়েছেন বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ের পর নারী-পুরুষের মানসিক অবস্থা ও দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর। এতদিন মনে করা হত, বন্ধ্যাত্ব সমস্যার পর নারীরাই নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং মানসিক সমস্যায় পতিত হন।

তবে বিএমইউ ও বারডেম—এই দুইটি বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রজনন এনডোক্রাইনোলজি বিভাগে পরিচালিত একটি ক্রস-সেকশনাল জরিপে দেখা গেছে, বন্ধ্যাত্বের কারণে নারীরা তীব্র মানসিক ট্রমা বা মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যান। অন্যদিকে, পুরুষদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি পড়ছে তাদের যৌন স্বাস্থ্যের ওপর।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘সেক্সুয়াল মেডিসিন’ জার্নালে এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। যৌনস্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য এবং দাম্পত্য সম্পর্কবিষয়ক গবেষণার অন্যতম স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী এটি। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটির গাইনি ও ইনফার্টিলিটি বিভাগ এবং বারডেম উইমেন্স অ্যান্ড চিলড্রেন হাসপাতালের ইনফার্টিলিটি বিভাগের ৬৫৮ জন বন্ধ্যাত্বে আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর এই গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন বিএমইউর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান।

ইনফার্টিলিটি তাদের ওপর একটা ভালো চাপ তৈরি করে। আমরা পুরুষদের সাথে নারীদের কম্পেয়ার করেছি। পুরুষদের তুলনায় নারীদের ডিপ্রেশন বেশি, অ্যানজাইটি বেশি, স্ট্রেসও বেশি। এর পরিমাণ পশ্চিমা বিশ্বসহ অন্যান্য দেশের থেকেও অনেক বেশি। এমনকি অন্যান্য ক্রনিক ডিজিজ যেমন ক্যান্সার হলেও তো ডিপ্রেশন হয়, কিন্তু বন্ধ্যত্বের পরের ডিপ্রেশন তার থেকেও বেশি— ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান, গবেষণা দলের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের মধ্যে ৩২০ জন পুরুষ ও ৩৩৮ জন ছিলেন নারী। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ্যত্বের শিকার নারীদের মধ্যে হতাশা বা ডিপ্রেশনের হার ৬৭.২ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৩১.৯ শতাংশ। একইভাবে নারীদের উদ্বেগ বা অ্যানজাইটির হার ৭৫.১ শতাংশ (পুরুষদের ৩২.৮ শতাংশ) এবং মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের হার ৬৯.২ শতাংশ (পুরুষদের ৩৭.৮ শতাংশ), যা পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। পরিসংখ্যানগতভাবে নারী ও পুরুষের এই মনস্তাত্ত্বিক ব্যবধান অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে উল্লেখ করেছেন গবেষকরা।

গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের এই তীব্র মানসিক কষ্টের প্রধান কারণ বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। বারবার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, ধারাবাহিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পাওয়ার দীর্ঘ পথ নারীদের মানসিক স্থিতিস্থাপকতা পুরোপুরি ভেঙে দিচ্ছে।

পুরুষদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। বন্ধ্যত্বের শিকার পুরুষদের ৩৭.৫ শতাংশ কোনো না কোনো যৌন জটিলতায় ভুগছেন, যা নারীদের (১৩.৯ শতাংশ) তুলনায় অনেক বেশি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরুষদের এই যৌন কর্মহীনতাই তাদের মানসিক হতাশা, উদ্বেগ ও চাপের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ, পুরুষদের মানসিক সুস্থতা সরাসরি তাদের যৌন সক্ষমতা এবং পুরুষত্বজনিত আত্মপরিচয়ের সাথে গভীরভাবে জড়িত।

আরও পড়ুন: সন্তান পেতে শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহ তীব্র হয় নারীদের, পুরুষের বাড়ে ‘যৌন সমস্যা’: গবেষণা

এর আগে গত জুনে একই জার্নালে প্রকাশিত অপর এক গবেষণায় এই গবেষকরা নারী-পুরুষের যৌন সমস্যা ও মানসিক সংযোগের চিত্র তুলে ধরেছিলেন। ওই গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বন্ধ্যত্ব নির্ণয়ের পর আক্রান্ত পুরুষদের ৩৭.৫ শতাংশই নানা যৌন সমস্যায় ভোগেন। এর মধ্যে উত্থানজনিত সমস্যা এবং দ্রুত বীর্যপাত সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া দাম্পত্য বোঝাপড়া ও সম্পর্কগত সমস্যার সম্মুখীনও বেশি হন তারা। বিশেষ করে সন্তান ধারণে ব্যর্থতার অনুভূতি তাদের আত্মমর্যাদা, পুরুষত্ববোধ এবং সামাজিক পরিচয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা তাদের যৌন জীবন ও দাম্পত্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অপরদিকে নারীরা সন্তান ধারণের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় আরও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

ইনফার্টিলিটির সময় আমরা শুধু বারবার যে চিকিৎসার চেষ্টা করতে থাকি, সেটা করার সময় তাদের মেন্টাল হেলথ এবং তাদের কাপল ওয়েলবিয়িং—এগুলোও দেখাটা জরুরি। বাংলাদেশে তো আউট অব পকেট চিকিৎসা করে, অনেক খরচ হয়। অনেক ফ্যামিলি এটা বহন করতে পারে না। এটা একটা বড় অসুবিধা। এজন্য ইনফার্টিলিটির চিকিৎসার সাথে সাথে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টাও চিকিৎসার মধ্যে থাকা প্রয়োজন— ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান, গবেষণা দলের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

প্রধান গবেষক বিএমইউর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এটি মূলত একটি গবেষণারই দুটি অংশ। আমরা এখানে তিনটি জিনিস দেখেছি। প্রথমটি হচ্ছে— বন্ধ্যত্ব নির্ণয়ের পর রোগীদের দাম্পত্য সমন্বয়ে কাদের বেশি সমস্যা হয়। দেখা গেছে, পুরুষদের ম্যারিটাল অ্যাডজাস্টমেন্ট ইনফার্টিলিটির পরে অত বেশি আক্রান্ত হয় না, কিন্তু তাদের তুলনায় নারীদের অনেক বেশি সমস্যা হয়—এটি আগের স্টাডিতে ছিল। আর আগের স্টাডিতে আরেকটি বিষয় ছিল, তা হচ্ছে সেক্সুয়াল ডিসফাংশন বা যৌন সমস্যা। এটি বেশি পুরুষদের, নারীদের কম। বিপরীতে নারীদের সেক্সুয়াল ফ্রিকোয়েন্সি বেড়ে যায়, তার মানে সন্তান নেওয়ার ব্যাপারে বেশি উদগ্রীব থাকে তারা।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা দেখেছি— ডিপ্রেশন, অ্যানজাইটি, স্ট্রেস কাদের বেশি থাকে? দেখা গেছে যে, ডিপ্রেশন, অ্যানজাইটি, স্ট্রেস এটা সাধারণ মানুষদের থেকে তো অবশ্যই বেশি, আক্রান্ত পুরুষদের তুলনায়ও নারীদের অনেক অনেক বেশি। অর্থাৎ ইনফার্টিলিটি তাদের ওপর একটা ভালো চাপ তৈরি করে। আমরা পুরুষদের সাথে নারীদের কম্পেয়ার করেছি। পুরুষদের তুলনায় নারীদের ডিপ্রেশন বেশি, অ্যানজাইটি বেশি, স্ট্রেসও বেশি। এর পরিমাণ পশ্চিমা বিশ্বসহ অন্যান্য দেশের থেকেও অনেক বেশি। এমনকি অন্যান্য ক্রনিক ডিজিজ যেমন ক্যান্সার হলেও তো ডিপ্রেশন হয়, কিন্তু বন্ধ্যত্বের পরের ডিপ্রেশন তার থেকেও বেশি।

গবেষণায় বন্ধ্যত্ব নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে বহুমুখী সমন্বিত চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র বায়োমেডিকেল ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বন্ধ্যত্বের শিকার দম্পতিদের সার্বিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও যৌন চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

ডা. শামসুল আহসান বলেন, ইনফার্টিলিটির সময় আমরা শুধু বারবার যে চিকিৎসার চেষ্টা করতে থাকি, সেটা করার সময় তাদের মেন্টাল হেলথ এবং তাদের কাপল ওয়েলবিয়িং—এগুলোও দেখাটা জরুরি। বাংলাদেশে তো আউট অব পকেট চিকিৎসা করে, অনেক খরচ হয়। অনেক ফ্যামিলি এটা বহন করতে পারে না। এটা একটা বড় অসুবিধা। এজন্য ইনফার্টিলিটির চিকিৎসার সাথে সাথে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টাও চিকিৎসার মধ্যে থাকা প্রয়োজন। তাদের কাউন্সিলিং করা জরুরি। কারণ ইনফার্টিলিটির সাথে যদি মেন্টাল হেলথকে আমরা এড্রেস করি, তাহলে ফার্টিলিটির রেটটা এত খারাপ হবে না।

উল্লেখ্য, এই গবেষণার সহ-গবেষক ছিলেন বিএমইউর গাইনি ও ইনফার্টিলিটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা দীবা, বারডেম উইমেন্স অ্যান্ড চিলড্রেন হাসপাতালের ইনফার্টিলিটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নুসরাত মাহমুদ, বিএমইউর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের ডা. লিউজা মুবাসসারা, ডা. সামিনা আক্তার, ডা. মো. আল-আমিন খান, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ডা. আহসান আজিজ সরকার এবং ইতালির ইউনিভার্সিটি অব রোম টর ভার্গাটার বন্ধ্যাত্ব গবেষক ড. আন্দ্রেয়া সানসোনে।

শরণার্থী আইন ও সুরক্ষা নিয়ে এসইউবিতে দিনব্যাপী বুটক্যাম্প অ…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
নতুন তিন সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
রাজুকে ব্লেম দিয়ে অপদস্থ করা হয়েছে, আমরা তার সাথে আছি: রাশে…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
দুই দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির আভাস দিল আবহাওয়া অধিদ…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
কাশিমপুর কারাগারে হত্যা মামলার হাজতির আত্মহত্যা
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
৯-১০ জনকে নিয়ে হোটেলে ফারজানা, জ্ঞান ফেরার পর রনি জানলেন— ‘…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950