আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টার উদ্বোধন অনুষ্ঠান © সংগৃহীত
দেশে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা এইচপিভিজনিত রোগ প্রতিরোধ, জরায়ুমুখ ক্যান্সার নির্মূল এবং এই সংক্রান্ত গবেষণাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলো ‘আন্তর্জাতিক প্যাপিলোমাভাইরাস সোসাইটি (আইপিভিএস) বাংলাদেশ চ্যাপ্টার’। আজ সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে রাজধানী শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘানা, নাইজেরিয়া ও নেপালের পর বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে এই চ্যাপ্টারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক, ভাইরোলজিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জরায়ুমুখ ক্যান্সারের উচ্চ মৃত্যুহারের ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই মরণব্যাধি রুখতে শতভাগ টিকাদান ও নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের কোনো বিকল্প নেই; আর এই লক্ষ্য অর্জনে বিজ্ঞানী, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক সেতু হিসেবে কাজ করবে নবগঠিত এই চ্যাপ্টার।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) ডা. সৈয়দা নওশীন পারভীন, বিএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতারসহ আরো অনেকে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের লিড অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেসা ও অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ আন্তর্জাতিক প্যাপিলোমাভাইরাস সোসাইটি (আইপিবিএস) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাফল্য কামনা করেন। তিনি বলেন, জরায়ুমুখ ক্যান্সারে মৃত্যুহার অনেক বেশি। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস এইচপিভি ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে ভ্যাক্সিনেশনের কোনো বিকল্প নাই। মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য এইচপিভি সমস্যা এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক প্যাপিলোমাভাইরাস সোসাইটি (আইপিবিএস) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মিশন বাস্তবায়ন করা সহজ কাজ নয়, এটা বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দৃঢ় প্রত্যয়ের।
কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) সম্পর্কিত রোগ প্রতিরোধ করতে হলে প্রাথমিক প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম, স্ক্রিনিং, ভ্যাক্সিনেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে প্যাথলজিস্ট, ভাইরোলজিস্ট, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠান, গবেষকসহ সংশ্লিষ্ট সকলে ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিতভাবে নিরন্তর কাজ করে যেতে হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সমন্বয়ক ডা. লুৎফা বেগম লিপি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এই চ্যাপ্টারের প্রতিষ্ঠা এইচপিভি সংক্রমণ প্রতিরোধ, জরায়ুমুখ ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের ভূমিকা ও উদ্দেশ্য নিয়ে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক আশরাফুন্নেসা। তিনি বলেন, আইপিভিএসে বাংলাদেশের সদস্যসংখ্যা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ঘানা, নাইজেরিয়া ও নেপালের পর বাংলাদেশ চ্যাপ্টার গঠনের অনুমোদন লাভ করে।
অধ্যাপক ডা. কামরুন নাহার বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের আগামী এক বছরের প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন এবং চ্যাপ্টারের সদস্য হওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতার, আইসিডিডিআর,বির এমেরিটাস বিজ্ঞানী ডা. ফিরদৌসী কাদরী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি. গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের ডিন ডা. লরা রাইখেনবাখ, জিওএসবি সভাপতি প্রফেসর সাবেরা খাতুন, বিডিএস সি সিপির সভাপতি প্রফেসর শিরিন আক্তার বেগম এবং ইন্টারন্যাশনাল প্যাপিলোমাভাইরাস সোসাইটির (আইপিবিএস) ইমিডিয়েট পাস্ট প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক সুজান গারল্যান্ডসহ দেশের বিশিষ্ট চিকিৎসক, গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বক্তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যান্সার নির্মূল কর্মসূচির লক্ষ্য অর্জনে এইচপিভি টিকাদান, এইচপিভি-ভিত্তিক স্ক্রিনিং, গবেষণা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁরা আশা প্রকাশ করেন যে, আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টার দেশের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলবে এবং এইচপিভি-সম্পর্কিত রোগ প্রতিরোধে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
অনুষ্ঠানে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয় যে, আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টার ভবিষ্যতে গবেষণা সহযোগিতা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বিনিময়, প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সকলের বক্তব্য শেষে কেক কেটে এবং বেলুন উড়িয়ে আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শেষে উপস্থিত অতিথিরা জরায়ুমুখ ক্যান্সার নির্মূলে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং বাংলাদেশে এইচপিভি প্রতিরোধ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেন।