প্রতীকী ছবি © টিডিসি ফটো
পবিত্র রমজান মাস মুসলমানদের জন্য সংযম, আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতের এক অনন্য সময়। সাধারণভাবে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকাকেই রোজা বলা হয়। তবে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে-রোজা রাখলে কি শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং কাজের সক্ষমতা কমে যায়?
এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। একদল মনে করেন দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে ক্লান্তি বাড়ে এবং কাজের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিষয়টি আসলে তেমন নয়। বরং নির্দিষ্ট সময়ের উপবাস শরীরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটায়, যা অনেক ক্ষেত্রে মনোযোগ ও মানসিক সক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে।
রোজা ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা: মস্তিষ্ক ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মে বদরুদ্দিনের মতে, রোজা মস্তিষ্কের জন্য উপকারী হতে পারে। কারণ উপবাসের সময় শরীর শক্তির উৎস হিসেবে কার্বোহাইড্রেটের বদলে চর্বি ব্যবহার শুরু করে। এ প্রক্রিয়ায় শরীরে কিটোন নামে একটি উপাদান তৈরি হয়, যা মস্তিষ্কের জন্য শক্তির বিকল্প উৎস হিসেবে কাজ করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় কিটোজেনিক অবস্থা।
গবেষণায় দেখা গেছে, কিটোনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লে মস্তিষ্কের মনোযোগ ও কার্যক্ষমতা উন্নত হতে পারে। এছাড়া এটি স্নায়ু কোষকে সুরক্ষা দিতে এবং কিছু স্নায়ুজনিত রোগের ঝুঁকি কমাতেও সহায়ক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোজা মস্তিষ্কে নতুন স্নায়ু কোষ তৈরিতে সহায়ক কিছু উপাদানও বাড়িয়ে দেয়। যেমন নিউরো গ্রোথ ফ্যাক্টর, যা মস্তিষ্কে নিউরনের বৃদ্ধি ও পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে।
২০১৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব নিউরোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, রোজার সময় মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নামের রাসায়নিকের মাত্রা বাড়তে পারে। সেরোটোনিন মেজাজ নিয়ন্ত্রণ, স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা এবং মস্তিষ্কের কোষের সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কেন কমে যেতে পারে কর্মক্ষমতা?
তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই রমজান মাসে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার অভিযোগ শোনা যায়। পাকিস্তানের এক কারখানার মালিক রায়েদ খালিদের মতে, রমজান মাসে অনেক কর্মীর উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং অনুপস্থিতির হারও বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে মূল কারণ সব সময় রোজা নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও বড় ভূমিকা রাখে।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব: পুষ্টিবিদ ফাতিন আল-নাশাশের মতে, রোজা শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করতে এবং কোষ পুনর্গঠনে সহায়তা করতে পারে। তবে অনেক মানুষ রমজানে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতিতে ভোগেন। বিশেষ করে ইফতারে একসাথে অতিরিক্ত খাবার খাওয়া, চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার বেশি গ্রহণ করা এবং অনিয়মিত সময়সূচি এসব কারণে শরীরে শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
সেহরি না খাওয়ার ভুল: রমজানে অনেকেই সেহরি বাদ দেন বা অনেক আগে খেয়ে ফেলেন। কিন্তু পুষ্টিবিদদের মতে, সেহরি হলো সারাদিনের শক্তির প্রধান উৎস। তাই ফজরের সময়ের কাছাকাছি সময়ে সেহরি খাওয়া শরীরকে দীর্ঘ সময় সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।
পানিশূন্যতা ও ঘুমের প্রভাব: রমজানে পর্যাপ্ত পানি না খাওয়াও ক্লান্তির একটি বড় কারণ। অনেকেই পানির বদলে জুস বা চিনিযুক্ত পানীয় পান করেন, যা শরীরের জন্য তেমন উপকারী নয়।
এছাড়া রমজানে ঘুমের রুটিন বদলে যাওয়ায় অনেকের পর্যাপ্ত ঘুম হয় না। ফলে অলসতা, মনোযোগের ঘাটতি এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কী বলছে সামগ্রিক গবেষণা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখা গেলে রোজা সাধারণত কর্মক্ষমতার বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। [বিবিসি বাংলা]