শরীরচর্চা © সংগৃহীত
ওজন কমানোর ভাবনাটা এখন প্রায় সবার মাথাতেই ঘুরপাক খায়। কেউ চান নিজেকে আরও ফিট রাখতে, আবার কেউ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা অতিরিক্ত ওজনের কারণে তৈরি হওয়া স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে চান। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন তড়িঘড়ি করে ওজন কমাতে গিয়ে অনেকে ভাত-রুটি একেবারেই ছেড়ে দেন, খাওয়া কমিয়ে প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনেন কিংবা সোশাল মিডিয়ায় দেখা কোনো কঠোর ডায়েট অন্ধভাবে অনুকরণ করা শুরু করেন।
এভাবে হয়ত সাময়িকভাবে আপনি ওজন কমাতে পারবেন, কিন্তু শরীরের ভেতরে শুরু হবে নানা জটিলতা। দ্রুত ওজন কমাতে গিয়ে উল্টো পুষ্টির ঘাটতি আর পেশি ক্ষয় দেখা দেওয়া মোটেও বিরল নয়। তাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল ওজন কমানো নয়; বরং শরীরের শক্তি, পুষ্টি ও মাসল বা পেশি ধরে রেখে এমন এক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া, যা দীর্ঘদিন স্বাচ্ছন্দ্যে বজায় রাখা যায়।
দ্রুত ওজন কমানো কি সত্যিই ভালো?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে জাদুকরী কোনো শর্ট্কাট নেই, এটি ধীরে ধীরে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) হিসাব অনুযায়ী, সপ্তাহে ৩০০ থেকে ৯০০ গ্রাম (বা ১ থেকে ২ পাউন্ড) ওজন কমানো হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সহজ হয়। তবে এর মানে এই নয় যে কারও ওজন এর চেয়ে সামান্য দ্রুত কমলে তা সবসময়ই বিপজ্জনক। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস এবং আনুষঙ্গিক নানা বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই গতি একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে।
তবে না খেয়ে খুব দ্রুত ওজন কমানোর একটি বড় ঝুঁকি হলো পিত্তথলিতে পাথর বা গল স্টোন তৈরি হওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, হঠাৎ ক্যালরি একদম কমিয়ে দিলে শরীর চর্বি ভাঙতে গিয়ে পিত্তথলিতে চাপ ফেলে, যা থেকে পাথরের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ওজন কমাতে কি ভাত-রুটি বন্ধ জরুরি?
আমাদের দেশে ওজন কমানোর কথা শুনলেই প্রথম কোপটা পড়ে ভাতের ওপর। কেউ কেউ রুটিও একদম বন্ধ করে দেন। কিন্তু পুষ্টিবিদদের মতে, ওজন কমাতে গিয়ে ভাত বা রুটি খাদ্যতালিকা থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলার কোনো দরকার নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনায় পরিষ্কার বলা আছে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাই আমাদের শরীরের মূল শক্তি জোগায়। তাই প্রধান শস্যজাতীয় খাবার, ডাল, শাকসবজি ও ফলমূল থেকে পাওয়া শর্করা আমাদের শরীরের জন্য জরুরি।
আসলে বিষয়টি ‘ভাত খাব কি খাব না’ এতটা সোজা হিসাব নয়। মূল বিষয় হলো, সারাদিনে আমরা মোট কতটা ক্যালরি গ্রহণ করছি, খাবারের গুণগত মান কেমন এবং শরীরকে কতটা সক্রিয় রাখছি। থালাভরা ভাতের বদলে পরিমিত ভাত, আর তার সঙ্গে বড় এক বাটি সবজি ও পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখতে পারলে ভালো।
একই কথা ফলের ক্ষেত্রেও। ফলে প্রাকৃতিক চিনি থাকে বলে অনেকেই ফল খাওয়া বন্ধ করে দেন। কিন্তু গোটা ফলে থাকা আঁশ ও ভিটামিন শরীরের জন্য দারুণ উপকারী। তবে মনে রাখা ভালো, গোটা ফল আর ফলের রস বা জুস এক কথা নয়। জুসে আঁশ থাকে না বললেই চলে এবং একসঙ্গে অনেকখানি চিনি শরীরে প্রবেশ করে। তাই জুস এড়িয়ে চিবিয়ে গোটা ফল খাওয়ার অভ্যাস করতে পারে।
শুধু প্রোটিন খেলেই কি দ্রুত ওজন কমবে?
আজকাল ডায়েট বলতেই সবার আগে আসে ডিম, মাছ বা মাংসের কথা। ওজন কমানোর সময় শরীর যেন পেশি হারিয়ে দুর্বল হয়ে না পড়ে, সে জন্য প্রোটিনের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। বিভিন্ন গবেষণাও বলছে, ক্যালরি কমানোর সময় প্রোটিন বেশি খেলে তা শরীরের মাসল ধরে রাখতে সাহায্য করে।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে শাকসবজি, ফল বা অন্য খাবার বাদ দিয়ে কেবল ডিম-মাংস খেয়ে গেলেই হু হু করে ওজন কমে যাবে। শরীরকে সুস্থ রাখতে সব ধরনের উপাদানেরই সুষম ভারসাম্য দরকার।
তাহলে প্রতিদিনের খাবার থালা কেমন রাখবেন
সবার শরীরের ধরন এক নয়, তাই সবার খাদ্যতালিকাও একই ছাঁচে ঢালা হতে পারে না। আপনার বয়স, ওজন, কাজের ধরন ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে আপনার খাবার। তবে সাধারণভাবে প্লেটে মাছ, ডিম, মুরগির মাংস, ডাল, ছোলা, রঙিন শাকসবজি, অল্প পরিমাণ ভাত-রুটি বা ওটস, দিনে অন্তত একটি গোটা ফল, কাঠবাদাম বা বিভিন্ন বীজজাতীয় স্বাস্থ্যকর ফ্যাট থাকে এ ধরণের খাবার রাখতে পারেন। এবং সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, খাবারে বৈচিত্র্য আনুন, পরিমিত খান এবং অতিরিক্ত চিনি, অতিরিক্ত লবণ ও প্রসেসড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।
দিনে ৮০০ ক্যালরির ডায়েট: সবার জন্য কি ঠিক?
দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় অনেকে দিনে মাত্র ৮০০ ক্যালরির মতো অতি-কঠোর ডায়েট শুরু করে দেন। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এ ধরনের ডায়েট কেবল কিছু বিশেষ চিকিৎসাগত পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের কড়া নজরদারিতে করা উচিত। সাধারণ মানুষের নিজে থেকে এমন ডায়েট শুরু করা শরীরকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার শামিল।
খাবারের সঙ্গে নড়াচড়াও আবশ্যক
ওজন কমানো কেবল খাওয়ার হিসেব নয়, শরীর কতটা নড়াচড়া করছে তার ওপরও নির্ভর করে। বিশেষজ্ঞরা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট হালকা বা মাঝারি ধরণের শরীরচর্চার পরামর্শ দেন। এর মধ্যে দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতার কাটা যেমন হতে পারে, তেমনি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন হালকা ওয়েট লিফটিং বা স্ট্রেন্থ ট্রেনিং করা যেতে পারে, যা পেশি মজবুত রাখে। একসাথে অনেক বেশি দৌড়ঝাঁপ না করে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটাহাঁটি দিয়ে শুরু করা যায়, তারপর ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো যেতে পারে।
শুরুতেই খুব বড় লক্ষ্যের দরকার নেই
প্রথমেই ১৫ থেকে ২০ কেজি কমানোর চিন্তা না করে ছোট লক্ষ্য স্থির করুন। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, প্রথম ৬ মাসে নিজের বর্তমান ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নেওয়া সবচেয়ে বাস্তবসম্মত। অর্থাৎ আপনার ওজন যদি ৮০ কেজি হয়, তবে শুরুতেই লক্ষ্য হওয়া উচিত ৪ থেকে ৮ কেজি কমানো। ছোট ছোট এই সাফল্যগুলোই পরবর্তীতে আপনাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।
একদিন একটু বেশি খেয়ে ফেললে কি সব শেষ?
ডায়েট চলাকালীন কোনো উৎসব বা দাওয়াতে একটু বেশি খাওয়া হয়ে গেলে অনেকেই হতাশ হয়ে ভাবেন ‘আমার তো সব চেষ্টা বৃথা!’ সত্যি বলতে, ওজন নিয়ন্ত্রণ কোনো একদিনের পরীক্ষা নয়, এটি একটি জীবনযাত্রার ধরন। তাই একদিন একটু বেশি খাওয়া হলে অপরাধবোধে না ভুগে, পরবর্তী বেলা থেকেই স্বাভাবিক স্বাস্থ্যকর খাবারে ফিরে আসুন।
যে অভ্যাস ধরে রাখা যায়, সেটাই আসল সাফল্য
এমন কোনো ডায়েট বেছে নেওয়া অর্থহীন, যা দুই সপ্তাহ খুব কষ্ট করে করা যায় কিন্তু তারপর আর ধরে রাখা সম্ভব হয় না। খাওয়া কমিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার চেয়ে এমন একটি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা তৈরি করা উচিত, যা আপনি সানন্দে বছরের পর বছর চালিয়ে যেতে পারবেন। পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ সামলানো এবং নিয়ম মেনে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়াই ওজন কমানোর আসল মন্ত্র।
খেয়াল রাখবেন ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, প্রেসার, কিডনি বা লিভারের সমস্যা অথবা গর্ভাবস্থায় যেকোন ডায়েট শুরু করার আগে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ বা ডাক্তারের পরামর্শ নিন।