বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে দেশে সাধারণ ছুটি চলছে। এরমধ্যেও দেশে প্রাণঘাতী ভাইরাসটিতে আক্রান্তদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমনি এটি প্রতিরোধে ফ্রন্ট লাইনে থেকে যারা কাজ করছেন তাঁদের ঝুঁকিও বাড়ছে। দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন চিকিৎসক, ৫৭ জন নার্স, ৫৮ জন পুলিশ সদস্য এবং ১৬ জন সাংবাদিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে তাদের নিরাপত্তা আরও জোরদারের দাবিও করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিকিত্সকদের সংগঠন বাংলাদেশ ডক্টর্স ফাউন্ডেশন প্রধান নির্বাহী নিরুপম দাস উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, সংক্রমিত ডাক্তারের সংখ্যা ১০০ এ পৌঁছেছে। যদি এই সংখ্যা এভাবেই বাড়তে থাকে তবে রোগীদের চিকিত্সা করার জন্য কোনও ডাক্তার থাকবে না।
তিনি বলেন, বেশিরভাগ চিকিৎসক ঢাকাতে আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের মধ্যে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রকোপ বৃদ্ধির পিছনে একটি কারণ হিসাবে- ‘ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের’ মানকে দোষ দিয়েছেন চিকিত্সকরা।
বুধবার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভাইরাসে আক্রান্ত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক মারা গেছেন।
এদিকে সারাদেশে কমপক্ষে ৫৭ জন নার্স করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে এবং ২৭০ জনের মতো কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। সংক্রমিতদের মধ্যে ৩১ জন সরকারী হাসপাতালের এবং ২৬ জন বেসরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বেসিক গ্রাজুয়েট নার্সেস সোসাইটি।
৫৮ জন পুলিশ সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত
করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত ৫৮ জন পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭ জনই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া সংক্রমণের ঝুঁকিতে আছেন, এমন ছয় শতাধিক পুলিশ সদস্যকে হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে (সঙ্গনিরোধ) পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর এবং ডিএমপি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশজুড়ে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত ও লকডাউন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য পুলিশ সদস্যরা নিয়মিত টহল দিচ্ছেন। এ ছাড়া রাস্তায় জীবাণুনাশক ছিটানো, শ্রমজীবী মানুষকে সহায়তা করা, চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া এবং কোয়ারেন্টিন থেকে পালানোদের খুঁজে বের করার কাজ করছেন তাঁরা। পর্যাপ্ত পরিমাণ সুরক্ষাসামগ্রী না থাকায় দায়িত্ব পালনের সময় ‘অসাবধানতাবশত’ সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে এসে তাদের মধ্যে এই সংক্রমণ হচ্ছে।
বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যসংখ্যা দুই লাখের বেশি। পুলিশের কর্মকর্তা পর্যায়ের সদস্যরা সাধারণত নিজেদের বাসায় অবস্থান করেন। তবে অনেক পুলিশ সদস্যই অবস্থান করেন জেলাগুলোর পুলিশ লাইনসে। এসব জায়গায় একটি কক্ষে ১০ থেকে ১২ জন করে সদস্য থাকেন। তাঁদের যেকোনো একজন থেকে অনেকের মধ্যে সংক্রমণ দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পুলিশের আক্রান্ত ৫৮ জনের মধ্যে ২৭ জন ডিএমপিতে, ১১ জন গোপালগঞ্জে, ৬ জন নারায়ণগঞ্জে, ৫ জন গাজীপুর মহানগর পুলিশে, ২ জন কিশোরগঞ্জে এবং ১ জন করে ময়মনসিংহ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ, পুলিশ টিঅ্যান্ডআইএম, এপিবিএন ময়মনসিংহ, নৌ–পুলিশ ইউনিট ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের সদস্য।
এ ছাড়া ৬৩৩ জন পুলিশ সদস্যকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে আছেন ১৪৩ জন। আর কোয়ারেন্টিন থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৮৫ জন।
করোনায় আক্রান্ত ১৬ সাংবাদিক
দেশে ইতিমধ্যে ১৬ সাংবাদিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন জানিয়ে এ বিষয়ে শুক্রবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)।
সংগঠনের সভাপতি কুদ্দুস আফ্রাদ ও সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইতিমধ্যে সারা দেশে ১৬ জন সাংবাদিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। যার মধ্যে নয়জনই ঢাকার। অনেকের পরিবারের সদস্যরাও এ ভাইরাসে আক্রান্ত।’
তবে, প্রচণ্ড স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করে গেলেও বহু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এখনও সাংবাদিক কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধ করেনি বলে অভিযোগ করে তারা বলেন, ‘এমনকি, বহু প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের বকেয়াও আটকে আছে। দেশের প্রচলিত এবং শ্রম আইনে যা অন্যায়, অমানবিক ও অপরাধের শামিল। উপরন্তু নানা অজুহাত দেখিয়ে কয়েকটি দৈনিকের প্রিন্ট ভার্সন ইতিমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আবার বেতন কমিয়ে আনারও পাঁয়তারা করছে।’
করোনাভাইরাসের এ দুর্যোগের সময়ে কর্মরত সাংবাদিকদের প্রতি কর্মদিবসের জন্যে বাড়তি এক দিনের সমপরিমাণ ঝুঁকি ভাতা দেয়ার দাবি জানিয়ে ডিইউজে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দেশব্যাপী চলা ছুটির সময়ে সাংবাদিকদের নিরাপদে কর্মস্থলে আনা নেয়ার জন্যে পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করারও দাবি রাখেন।
বিবৃতিতে নেতারা বলেন, করোনাভাইরাসের মতো ভয়ংকর দুর্যোগ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সহায়তা ছাড়া সাংবাদিকরা শত ঝুঁকির মধ্যেও কাজ করছেন কেবলমাত্র পেশাগত দায়িত্ববোধ, পরিবারের ভরণপোষণের আর্থিক সুরক্ষা, প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি ও রাষ্ট্রের কথা ভেবে।
‘কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, বেশিরভাগ গণমাধ্যমে এখন পর্যন্ত মার্চ মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়নি। অথচ সবাই অবগত রয়েছেন করোনাভাইরাসের প্রেক্ষিতে জীবনযাত্রার প্রাত্যাহিক ব্যয় অনেকাংশে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতিটি দিন পার করতে হিমশিম খাচ্ছেন বেশিরভাগ সাংবাদিক পরিবার,’ যোগ করেন তারা।
ডিইউজে নেতারা জানান, এ দুর্বিষহ অবস্থায় মার্চ মাসের বেতন এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে বকেয়াসহ পরিশোধ করা না হলে ডিইউজে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়াসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি অবগত করতে বাধ্য হবে।