পাম্প থেকে তেল নিতে লাইনে মোটরচালকরা © সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম কমে একশ ডলারের নিচে নেমেছে সেসময় বাংলাদেশে দেড় মাসের মাথায় আবারো বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এটি নিয়ে মানুষের মাঝে বেশ উদ্বেগ দেখা গেছে। যদিও গণপরিবহনে বহুল ব্যবহৃত ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে সরকার।
তবে ভোক্তা পর্যায়ে জুন মাসের জন্য পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটার প্রতি পাঁচ টাকা বাড়িয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। রবিবার এক বার্তায় এই তথ্য জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম যখন শতভাগ বৃদ্ধি পেয়েছিল তখনও সরকার দাম বাড়ায়নি। একইসঙ্গে বাজেট ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই এখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে।
আরও পড়ুন : সরানো হচ্ছে সড়ক পরিবহনের শেখ রবিকে, কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে আলোচনায় নতুন মুখ
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এ কথাতো কেউ বলছে না, যখন জ্বালানি তেলের মূল্য শতভাগ বৃদ্ধি পেয়েছিল তখনও সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেনি।
যদিও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান মনে করছেন, ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা এবং অন্য জ্বালানি তেলের দাম মাত্র পাঁচ টাকা বাড়ানো অল্প মনে হলেও এর প্রভাব পড়বে সবক্ষেত্রে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানে হলো প্রতিটি জায়গায়ই ইম্প্যাক্ট পড়া বলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কেমন?
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ বাণিজ্যই হরমুজ প্রণালি দিয়ে হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথটি কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। ওই সময় থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে এই দাম প্রতি লিটার ১২৫ ডলারের বেশিও হয়েছিল। পরে হরমুজ প্রণালি কিছুটা শিথিল হওয়ার সময়ে আবার সেই দাম কমে একশ ডলারে নামে।
এদিকে, সোমবার (১ জুন) আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল বা ডব্লিউটিআই ক্রুড অয়েলের দাম একশ ডলারের নিচে রয়েছে।
ইরানের সাথে শান্তি চুক্তিতে কিছু পরিবর্তনের দাবির খবরের পরে এই দাম তিন শতাংশ বেড়ে যেতে পারে বলেও জ্বালানি তেলের দাম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সাইটগুলোতে বলা হয়েছে। তবে এরপরেও সেই মূল্য একশ ডলারের নিচেই থাকছে। এ ছাড়া ব্রেন্ট ক্রুড বা ব্রেন্ট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রতি লিটারের মূল্য সোমবার ৯৪ দশমিক ১০ ডলার ছিল। দুই শতাংশ দাম বাড়লেও সেটি একশ ডলারের নিচেই থাকছে।
আরও পড়ুন : শিক্ষার্থীরা বাংলা-ইংরেজি না পারলে শিক্ষকদের শাস্তি, যা বললেন গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী
কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বর্তমানে কম থাকলেও বাংলাদেশে এমন একটি সময়ে দাম বাড়ানো হয়েছে যখন বাজেট অধিবেশন আসন্ন।
বাংলাদেশের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের রবিবারের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস বা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে ভোক্তাপর্যায়ে বিক্রয়মূল্য অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হলো। কেবল ডিজেলের মূল্য আগের মতোই ১১৫ টাকা লিটার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
এর আগে, গত ১৮ই এপ্রিল দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছিল সরকার। ওই সময় ডিজেলের দাম বাড়িয়ে ১১৫ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া প্রতি লিটার পেট্রোল ১৩৫ টাকা ও কেরোসিন ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। রবিবার পর্যন্ত ওই নির্ধারিত মূল্যেই দেশে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হয়েছে। তবে আজ সোমবার থেকে নতুন দাম কার্যকর করা হয়েছে।
ডিজেল ১১৫ টাকা থাকলেও অকটেন, পেট্রোল, কেরোসিনে প্রতি লিটারে পাঁচ টাকা করে বাড়তি দাম দিয়ে ভোক্তাকে ক্রয় করতে হবে।
মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি যেমন
রাজশাহীর গুল গফুর পেট্রোলিয়াম ফিলিং স্টেশনে সোমবার মোটর সাইকেলে জ্বালানি তেল নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাহতাব শফিক। একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন তিনি।
তিনি জানান, কাজের সুবিধার জন্যই তার মোটর সাইকেল ব্যবহার জরুরি বিষয়। সকালে ফিলিং স্টেশনে অকটেন নিতে গিয়ে আবার পাঁচ টাকা বাড়ার কথা জানতে পারেন।
শফিক বলেন, গত মাসে শুনলাম দাম আর বাড়াবে না। হুট করে এভাবে বারবার দাম বাড়ানোয় আসলে আমাদের ওপর খুবই প্রেসার পড়ে যাচ্ছে। এক মাসে, দুই মাসে দুইবার দাম বাড়ালো পাঁচ টাকা, দশ টাকা করে। সাধারণ মানুষ আমরা যারা গাড়ি চালাই জীবনের প্রয়োজনের জন্যইতো গাড়ি চালাই।
বেসরকারি আরেকজন চাকরিজীবী সাব্বির আহমেদ বলছেন, মধ্যবিত্তদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। অফিস যাতায়াতের খরচ যদি এভাবে বাড়তে থাকে তাহলে বেতনের সব টাকাইতো রাস্তায় খরচ হয়ে যাবে।
এদিকে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে প্রতিবাদ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, এর ফলে দ্রব্যমূল্যও বেড়ে গেছে অথচ মানুষের আয় বাড়েনি। ক্রমাগত বেকারত্ব বেড়েই চলেছে। দাম না বাড়ানোর বিষয়ে সরকার আশ্বস্ত করলেও তা রাখা হয়নি বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
জামায়াত আমির লিখেছেন, অথচ সরকার আশ্বস্ত করেছিল, অন্তত এই মাসে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করা হবে না। যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, নিঃসন্দেহে এটি হবে জনস্বার্থবিরোধী। আমরা এ ধরনের জনস্বার্থবিরোধী সব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে।
সরকার যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যখন কম তখন বাংলাদেশে কেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে দুপুরে এমন প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।
আজ সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এটাতো অবশ্যই আপনি বলতে পারেন, কিন্তু এ কথাতো কেউ বলছে না, যখন জ্বালানি তেলের মূল্য শতভাগ বৃদ্ধি পেয়েছিল তখনও সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেনি। বাজেট ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর।
তিনি বলেন, এটা একটা বাজেট ব্যবস্থাপনা আছে, কিভাবে কাভার করবেন। আজকে আমরা বলছি স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে চাই, পরিবারগুলোকে ফ্যামিলি কার্ড দিতে চাই, আমরা কৃষকদেরকে ফারমারস কার্ডের আওতায় আনতে চাই। ভর্তুকি কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতসহ সকল সেক্টরকে সচল রাখতে এই উদ্যোগ বলেও জানান তিনি।
তো এইগুলোর জন্য যদি সমস্ত অর্থের একটি বৃহৎ অংশ যদি আপনার ভর্তুকির পেছনে ব্যয় হয়ে যায় তাহলেতো আলটিমেটলি... যখন একটা স্কোপ থাকে তখন কিছু রিএডজাস্টমেন্ট হয় এবং এটা হতেই হয় সব সেক্টরগুলোকে সচল রাখার জন্য সকলের সুবিধার্থে বলেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। একইসঙ্গে, সরকার স্বাবলম্বী হতে চায় বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, একদিকে যেমন এই ভর্তুকিগুলো কমিয়ে আনার একটা প্রশ্ন আছে অপরদিকে জনদুর্ভোগ কমানোরও একটা ব্যাপার আছে। ভর্তুকির প্রশ্ন আসলো যে, উচ্চ দামে আমি বিদ্যুৎ কিনছি। তো উচ্চমূল্যের এই পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোগুলোকে যদি আমরা আস্তে আস্তে রিনিউবেল এনার্জি দিয়ে রিপ্লেস করতে পারি তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমে যাবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমলে গ্রাহককেও সাশ্রয় মূল্যে আমরা বিদ্যুৎ দিতে পারব।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রভাব পড়বে
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে প্রথমেই পরিবহন সেক্টরে এর প্রভাব পড়ে। সরকার এবার ডিজেলের দাম না বাড়ালেও এই খাতে শঙ্কা থেকেই যায় বলে মনে করেন ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের পরিবহন সেক্টরে প্রথম ড্যামেজটা হয়। পরিবহনের জ্বালানিটা ডিজেল এর দাম বাড়ানো হয়নি, কিন্তু পেট্রোল, অকটেনের দাম বাড়ানোতে এর কিছুটা প্রভাব পড়বেই। ডিজেলচালিত পরিবহন মালিকরা যাতে ভাড়া বৃদ্ধি না করে সেক্ষেত্রে সরকারকে নজর রাখতে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
ডিজেলের দাম না বাড়লেও দেখা গেল যে এই চান্সে আমাদের মোটরযানের মালিকরা পরিবহন ভাড়া বাড়িয়ে দিলে। সেখানে সরকারের দায়িত্ব যাতে, ডিজেলচালিত যেসব মোটর ভেহিকল আছে সেখানে কোনোভাবেই যাতে ভাড়া বৃদ্ধি করা না হয়। সে জায়গায় সরকারের ফোকাস করা উচিত বলেন সফিকুজ্জামান। এ ছাড়া, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটার প্রতি মাত্র পাঁচ টাকা বাড়লেও ব্যবসায়ীরা সুযোগের অপব্যবহার করে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা বর্ণনা করে তাদের কষ্ট লাঘবে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সূত্র : বিবিসি বাংলা