কক্সবাজারের সাহিত্যিকা মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বি হাজ্জাজ © টিডিসি
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বি হাজ্জাজ বলেছেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, কার্যকর ও শিক্ষাবান্ধব করতে সরকার ব্যাপক নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান শিক্ষক সংকট, শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া এবং শিক্ষার গুণগত মানের ঘাটতি দূর করতে সরকার ইতোমধ্যে বহুমুখী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। শিক্ষা খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে।
আজ শনিবার (৯ মে) সকালে কক্সবাজারের সাহিত্যিকা মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং শিক্ষা কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
এর আগে কক্সবাজারের লিডারশীপ ট্রেনিং সেন্টারে আয়োজিত দিনব্যাপী এক কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তিনি। কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয় প্রি-প্রাইমারি ও প্রাইমারি স্কুল ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের আওতায়। এতে কক্সবাজার, বান্দরবান এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে বাস্তবায়নাধীন শিক্ষা কার্যক্রম, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও শিক্ষক সংকট বড় একটি সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা কম থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। তিনি জানান, শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এবং পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হলে প্রথমেই শিক্ষকদের প্রয়োজন ও সমস্যাগুলো বুঝতে হবে। শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা ও সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হবে।
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে এবং ঝরে পড়া রোধে মিড-ডে মিল চালুর বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, অনেক দরিদ্র পরিবারের শিশু অপুষ্টি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত স্কুলে আসতে পারে না। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা হলে উপস্থিতি বাড়বে এবং পড়াশোনায় মনোযোগও বৃদ্ধি পাবে। তার মতে, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম শুধু শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করবে না, বরং শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতেও সহায়ক হবে।
বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের সম্পর্ক তুলে ধরে বলেন, শিক্ষা খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য, অপরাধপ্রবণতা ও সামাজিক অস্থিরতাও অনেকাংশে কমে আসবে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা ‘মব কালচার’ প্রতিরোধে শিক্ষিত ও সচেতন সমাজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি বলেন, একটি সুশিক্ষিত জাতি গড়ে তুলতে পারলে সমাজে সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও অসহিষ্ণুতা অনেকটাই কমে আসবে। শিক্ষা শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়, এটি মানুষকে মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবেও গড়ে তোলে।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন জানান, বর্তমানে কক্সবাজার ও বান্দরবানে মোট ১ হাজার ৯৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রি-প্রাইমারি ও প্রাইমারি স্কুল ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং স্কুল ফিডিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বিশ্ব ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ইউনিসেফ উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ৪ হাজার ৪০০টি শিক্ষা কেন্দ্র এবং ভাসানচরে ২০টি স্কুলে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া ও বাস্তুচ্যুত শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
কর্মশালা শেষে প্রতিমন্ত্রী প্রকল্পের আওতাভুক্ত কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং স্কুল ফিডিং কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ ও শিক্ষা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেন তিনি।
সরকারের এই নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শিক্ষক সংকট নিরসন, শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনার ক্ষেত্রে এসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।