বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ © টিডিসি সম্পাদিত
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) ক্ষমতা সংকুচিত করে ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা অর্পণ এবং সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধির মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক এখনও ফুরোয়নি। এরই মধ্যে প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগে পুলিশ ভেরিফিকেশনে বিপুল সংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর বাদ পড়া নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ৮ মাস অপেক্ষার পর নিয়োগের আগ মুহূর্তে চাকরি থেকে বাদ পড়ে গেছেন প্রায় এক হাজার প্রার্থী।
সরকারি চাকরিতে প্রবেশে বৈষম্যমূলক কোটাপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্র ধরে রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বর্তমান বিএনপি সরকারের ৭ মাস যেতেই একের পর এক এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ জমা হচ্ছে চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তারা বলছেন, এ ধরনের একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠতে পারে ছাত্রসমাজ।
ম্যানেজিং কমিটি থেকে শুরু
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডিতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই নিয়ম বাতিল করে। এরই মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপরই পুনরায় ম্যানেজিং কমিটিতে রাজনৈতিক নেতাদের অংশগ্রহণের দাবি নতুন করে উঠতে থাকে।
ওই সময় ২২ ফেব্রুয়ারি শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানানো হয়েছিল যেন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে রাজনৈতিক নেতাদের বহাল রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। তাদের যুক্তি ছিল, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন। ওই সময় থেকেই ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদে রাজনৈতিক নেতাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে থাকে সরকার।
কাউকে যদি বাদ দিতে হয়, তার কোয়ালিফিকেশন না থাকলে সে ভাইভা বা রিটেনে বাদ পড়বে। কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে বাদ দেওয়া—অন্য চিন্তার মানুষ, অন্য ভাবনার মানুষ বা অন্য দল করে দেখে কিংবা পরিবার ভিন্ন দলের সাথে যুক্ত বলে নিয়োগ না দেওয়া মহা অন্যায়। এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য না এবং ইনজাস্টিস— অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এরই মধ্যে গত ১৪ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে এক বৈঠকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি গঠন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা নিয়ে আলোচনা হয়। ওই সময় ম্যানেজিং কমিটির হাতে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের ক্ষমতা না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও নিয়োগসহ বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সুপারিশকৃত নতুন শিক্ষক নিয়োগ ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শিক্ষক ও কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
একই সাথে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মনোনয়ন সংক্রান্ত নতুন প্রস্তাবনায় বলা হয়, গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নের লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, ক্ষেত্রমত বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের সহিত আলোচনাক্রমে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি বা স্থানীয় খ্যাতিমান সমাজসেবকগণের মধ্য হইতে তিন জন ব্যক্তির নাম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত সংবলিত প্রস্তাব শিক্ষা বোর্ডের নিকট প্রেরণ করিবেন।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ওই সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির সভাপতি পদে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির অর্থ হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পুনরায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা। যদিও এ পদে অন্যদেরও সুযোগ রয়েছে; তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির নাম আসলে অন্যদের এ পদে বসার সুযোগ কম।
এদিকে গত ৩ আগস্ট শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠকে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, এনটিআরসিএ শুধু পরীক্ষা নেবে ও সনদ দেবে, কিন্তু শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দেয়। ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বড় বড় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠনও এর তীব্র বিরোধিতা করে।
তবে তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকার তার আগের অবস্থান থেকে পুরোপুরি পিছু হটে। গত ১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক জরুরি সভায় বিতর্কিত রেজুলেশনটি পুরোপুরি বাতিল ঘোষণা করে। একই সাথে জানায়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধার মূল্যায়ন বজায় রাখতে আগের নিয়মেই অর্থাৎ এনটিআরসিএর মাধ্যমেই ৩টি ধাপে পরীক্ষা নিয়ে (প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভা) শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হবে।
মৌখিক পরীক্ষায় অস্বাভাবিক নম্বর বৃদ্ধি
ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সভাপতি পদে রাজনৈতিক নেতাদের সুযোগদানের বিতর্কের মধ্যেই শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষাসহ সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গত ১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় শিক্ষক নিবন্ধনের মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর একটি প্রস্তাব রাখা হয়। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, শিক্ষক নিবন্ধনের ভাইভা পরীক্ষায় ১০ নম্বর বাড়িয়ে ৩০ নম্বর করার সুপারিশ করা হয়। নীতিগত অনুমোদন পেলে আসন্ন ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা থেকেই এই নতুন নম্বর বিভাজন কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে অন্যান্য সরকারি চাকরিতেও ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির (১১তম থেকে ২০তম গ্রেড) চাকরিতে ভাইভার নম্বর সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির একটি খসড়া বিধিমালা চূড়ান্ত হয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, বিভিন্ন গ্রেডের চাকরিতে লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে ভাইভার নম্বর ব্যাপকভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১ ও ১২তম গ্রেডে ১০ নম্বরের ভাইভা পরীক্ষায় ৪০০% বৃদ্ধি করে ৫০ নম্বর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ১৩ থেকে ১৬তম গ্রেডে ১০ নম্বরের জায়গায় ৪০ এবং ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে লিখিত ও ভাইভা উভয় ক্ষেত্রেই ২৫ নম্বর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বিধিমালার আরেকটি বড় দিক হলো, ভাইভার নম্বর বাড়ানোর পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার পাস মার্ক ৫০% থেকে কমিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩৫% থেকে ৪০% করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নীতিনির্ধারক ও সরকারি সূত্রগুলোর মতে, এই পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হলো লিখিত পরীক্ষায় প্রযুক্তির অপব্যবহার, এআই, প্রক্সি বা জালিয়াতি করে পাস করা অযোগ্য প্রার্থীদের ভাইভা বোর্ডে যাচাইয়ের মাধ্যমে বাদ দেওয়া। তবে বিরোধী দল এটিকে প্রশাসনকে ‘দলীয়করণের অশুভ ইঙ্গিত ও ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দেয়। একই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন।
জুলাই বিপ্লব পরবর্তীতে আমাদের প্রত্যাশা ছিল বিএনপি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে এবং অতীতের ভুলগুলো করবে না। কিন্তু একই কায়দায় মাত্র সাত মাসের মধ্যে তারা আবার রাষ্ট্রকে ফ্যাসিবাদী কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সব ধরনের বন্দোবস্ত করছে। পুরো দেশের যে বেকার আছে, সে বেকারের পেটে তারা লাথি মারতে চায় এবং সবার ভয়েসকে বন্ধ করে দিতে চায়। তারই প্রতিচ্ছবি হিসেবে এই ভাইভা মার্কস বাড়ানো, প্রত্যেকটা জায়গায় দলীয়করণ, ভেরিফিকেশনের নামে শিক্ষার্থীদের অধিকার হরণ করা। এর মাধ্যমে আল্টিমেটলি তারা চায় একদলীয় শাসন কায়েম করতে— সাদিক কায়েম, ভিপি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)
ভাইভায় নম্বর বৃদ্ধির এই বিতর্কের মধ্যেই গত ২১ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ইটনা উপজেলার মৃগা ইউনিয়নে আমিরগঞ্জ-জনতাগঞ্জ বাজারে আয়োজিত এক জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় চাকরিপ্রার্থীদের উদ্দেশ্যে সরাসরি বলেন, ‘এই গ্রামের কত ছেলে আছে যারা পরীক্ষা দিয়ে রিটেনে পাস করছে কিন্তু ভাইভায় এলাউ হইতে পারে নাই, চাকরি পায়নি। রিটেনে পাস করার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাডমিট কার্ড আমার কাছে নিয়ে যাইবা। আমি যেখানে ফোন করার সেখানে কইরা দেব। যখনই রিটেনে পাস করবে, আমি ওই ছেলেটার জন্য যেখানে গেলে চাকরিটা পাবে সেটা বলে দেব।’
৮ মাস অপেক্ষার পর পুলিশ ভেরিফিকেশনে বাদ
২০২৫ সালের প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল গত ৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু নানা জটিলতায় প্রার্থীদের চূড়ান্ত নিয়োগপত্র ইস্যু এবং যোগদানের তারিখ পেছাতে পেছাতে অবশেষে ১ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে নিয়োগপত্র হাতে পেয়েছেন প্রার্থীরা। তবে এরই মধ্যে ৮ মাস অপেক্ষার পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর বহু প্রার্থী জানতে পারেন পুলিশ ভেরিফিকেশনে তারা বাদ পড়েছেন।
পুলিশ ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রার্থীদের নির্ভরযোগ্য কোনো তালিকা পাওয়া না গেলেও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছেন গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশনের নামে নিয়োগপ্রাপ্ত ‘অন্তত এক হাজার’ মেধাবী তরুণের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে।
যা বলছেন ছাত্রনেতা-শিক্ষাবিদরা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সরকারের একের পর এক ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ছাত্রনেতারা। চাকরিতে বৈষম্যের প্রতিবাদ থেকে গণঅভ্যুত্থানের পর পুনরায় এমন পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৯ দফার ঘোষক ও ছাত্রনেতা আব্দুল কাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলন-সংগ্রাম আর জীবনের বিনিময়ে ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়ে বিএনপি সরকার একের পর এক চাকরিপ্রার্থী আর শিক্ষার্থী বিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অন্তত শিক্ষার্থীদের সাথে বিএনপি সরকারের এমন বেইমানী চিন্তাতীত।’
তিনি লিখেছেন, ‘ক্ষমতায় এসেই তারা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএর সরাসরি সুপারিশ ব্যবস্থা বাতিল করে ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির হাতে নিয়োগ ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করেছে। প্ল্যান অনুযায়ী তারপরে তারা আসল সিদ্ধান্ত নিল, সরকারি চাকরিতে ভাইভার নাম্বার ৪০০ পারসেন্ট বাড়াবে। এই সিদ্ধান্তের ফলাফল কেমন হবে, সেটা বিএনপির সাংসদ ফজলুর রহমান রাখঢাক না রেখেই প্রকাশ করেছেন। লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেই তার কাছে এডমিট কার্ড নিয়ে যেতে বলেছেন, যেখানে ফোন করার সেখানে ফোন করেই তিনি চাকরি পাইয়ে দিবেন।’
গতবছর বিএনপির আরেক সাংসদও খোলমেলাভাবে মিডিয়ার সামনে নেতাকর্মীদের এমন আশ্বাস দিয়েছেন উল্লেখ করে আব্দুল কাদের আরও লিখেছেন, ‘এখন আবার ভেরিফিকেশনের নামে বিরোধী দল-মতকে চাকরি থেকে বঞ্চিত করার প্ল্যান হাতে নিয়েছে সরকার। অথচ এমন অন্যায়ের বিরুদ্ধেই অভ্যুত্থান হয়েছিল; মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল। প্রাইমারির শিক্ষক নিয়োগের মতো জায়গায়ও এমন রাজনৈতিক বিবেচনা অশনিসংকেত। সরাসরি এমন শিক্ষার্থী বিরোধী কর্মপরিকল্পনা আর প্রতারণার খেসারত বিএনপি সরকারকে দিতে হবে এবং সেটা চড়া মূল্যেই।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আওয়ামী লীগের ছিল কোটা, আর বিএনপির হলো প্রত্যেকটা জায়গায় নির্লজ্জ দলীয়করণ। ভাইভা, তারপর ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে বঞ্চিত করা, এরপরে এনটিআরসিএকে নিয়োগ না দিয়ে দলীয় ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ—এই সবকিছুর মাধ্যমে আল্টিমেটলি তারা দেশের মেধাকে ধ্বংস করতে চায়, যেটা এর আগেও তারা করেছে। এর আগেও এক কলেজ থেকে ১০০-এর অধিক নিয়োগ হয়েছে।
তিনি বলেন, বিএনপির ইতিহাস সবসময় হচ্ছে দলীয়করণ এবং বাণিজ্যকরণ, এরপর মামা-চাচা-খালু পরিচয়ে নিয়োগের মাধ্যমে পুরো মেধাকে ধ্বংস করা। সেটা এর আগে করেছে এবং এর কারণে পুরো জাতিকে মূল্য দিতে হয়েছে। এরপরে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদ হলো।
সাদিক কায়েম আরও বলেন, জুলাই বিপ্লব পরবর্তীতে আমাদের প্রত্যাশা ছিল বিএনপি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে এবং অতীতের ভুলগুলো করবে না। কিন্তু একই কায়দায় মাত্র সাত মাসের মধ্যে তারা আবার রাষ্ট্রকে ফ্যাসিবাদী কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সব ধরনের বন্দোবস্ত করছে। পুরো দেশের যে বেকার আছে, সে বেকারের পেটে তারা লাথি মারতে চায় এবং সবার ভয়েসকে বন্ধ করে দিতে চায়। তারই প্রতিচ্ছবি হিসেবে এই ভাইভা মার্কস বাড়ানো, প্রত্যেকটা জায়গায় দলীয়করণ, ভেরিফিকেশনের নামে শিক্ষার্থীদের অধিকার হরণ করা। এর মাধ্যমে আল্টিমেটলি তারা চায় একদলীয় শাসন কায়েম করতে। এখানে অপজিশন এবং পুরো তরুণদের, যে তরুণরা জুলাই বিপ্লব করেছে, সে তরুণদের ভয়েসকে তারা বন্ধ করে দিতে চায়। আল্টিমেটলি এর মাধ্যমে বিএনপি ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে চায়।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন-সংগ্রাম আর জীবনের বিনিময়ে ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়ে বিএনপি সরকার একের পর এক চাকরিপ্রার্থী আর শিক্ষার্থী বিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অন্তত শিক্ষার্থীদের সাথে বিএনপি সরকারের এমন বেইমানী চিন্তাতীত— আব্দুল কাদের, ছাত্রনেতা ও ৯ দফার ঘোষক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন
ডাকসু ভিপি বলেন, আমরা মনে করি এটার মাধ্যমে সরকার পতনের দিকে যাচ্ছে। কারণ যে তরুণরা জুলাই বিপ্লবে রাজপথে নেমে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, সে তরুণরা এই ধরনের নব্য ফ্যাসিবাদ সহ্য করবে না। আমরা অনুরোধ করব তারা জুলাই বিপ্লবের যে আকাঙ্ক্ষা, সে আকাঙ্ক্ষা যেন তারা ধারণ করে এবং এই সমস্ত অন্যায্য ব্যবস্থাগুলো যেন অনতিবিলম্বে বাতিল করে। আর যদি না করে তাহলে বাংলাদেশে এর আগে ফ্যাসিবাদের যে পরিণতি হয়েছে, তার চেয়ে ভয়াবহ পরিণতি এই বিএনপির জন্য অপেক্ষা করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষা এমন একটা জিনিস, যেখানে রাজনীতি করার কিছু নাই। রাজনৈতিক কর্মী নিয়োগ দিতে হলে বহু জায়গা আছে, কিন্তু শিক্ষকতায় না। শিক্ষকের আবার জাত কী, দল কী? শিক্ষক শিক্ষকই, জাস্ট শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, আজকে আমরা শুনি বিভিন্ন অনিয়মের কথা, দুর্নীতির কথা শোনা যায়; এটা খুবই দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। বিশেষ করে ২৪-এর অভ্যুত্থানের পরে এটা মোটেই এক্সপেক্টেড না। এগুলো নিয়ে যদি টানা হেঁচড়া করতে যায় এখন, তবে সরকারি দল বিপদে পড়ে যাবে। আমরা চাই না দীর্ঘদিন পর একটা গণতান্ত্রিক সরকার এসে বিপদে পড়ুক বা হোঁচট খাক। কিন্তু তারা যদি গোঁয়ারতুমি করে, দিনশেষে সেটার কোনো বিকল্প থাকবে না।
এই শিক্ষাবিদ আরও বলেন, সরকারকে বোঝা উচিত যে চাকরি নিয়ে—যেকোনো চাকরি, শুধু শিক্ষকতা না—কোনো রকম বৈষম্য বা দলীয়করণ করা যাবে না। বিশেষ করে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি এডুকেশনের ক্ষেত্রে জাতির সেরা, শ্রেষ্ঠ এবং মেধাবীদের শিক্ষকতায় আনতে হবে। তা না করে সুপারিশ বা তদবিরের মাধ্যমে নিয়োগ হলে দেশের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও আমাদের শিক্ষার বেস ঠিক নাই; রিডিং-রাইটিং ক্যাপাসিটি বা হায়ার এডুকেশনের মান সন্তোষজনক না। তাই শিক্ষার মূল ভিত্তি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে নজর দিতে হবে।
পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কাউকে যদি বাদ দিতে হয়, তার কোয়ালিফিকেশন না থাকলে সে ভাইভা বা রিটেনে বাদ পড়বে। কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে বাদ দেওয়া—অন্য চিন্তার মানুষ, অন্য ভাবনার মানুষ বা অন্য দল করে দেখে কিংবা পরিবার ভিন্ন দলের সাথে যুক্ত বলে নিয়োগ না দেওয়া মহা অন্যায়। এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য না এবং ইনজাস্টিস।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, শিক্ষার দর্শন, নীতি বা কারিকুলাম না থাকা এবং সাত-আট মাস পার হওয়ার পরও শিক্ষার কোনো রূপরেখা না আসা খুবই দুঃখজনক। এতদিন পর একটা গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসলে এগুলো ঠিক হবে এমন আশা ছিল, কিন্তু আগের মতোই এক দলের বদলে আরেক দলের ডমিনেশনের কালচার দেখা যাচ্ছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
একই সাথে এনটিআরসিএকে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) আদলে স্বতন্ত্র কমিশনে রূপান্তরের দাবিও জানান এই শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, এনটিআরসিএকে পিএসসির আদলে একটা ‘শিক্ষক নিয়োগ কমিশন’ করা দরকার। এখন যে অতিরিক্ত সচিব চেয়ারম্যান হন তাকে বেশ চাপের মুখে কাজ করতে হয়। এটা না করে পিএসসির আদলে একটা স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী চেয়ারম্যান এবং কয়েকজন মেম্বার দিয়ে নিরপেক্ষ, স্বাধীন কমিশন গঠন করা দরকার, যারা শিক্ষকদের সুপারিশ করবে।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে জিনিসটা মাথায় রাখা দরকার—আমরা যাকে বলি আগ্রহ, সাইকোলজিক্যাল রেডিনেস, সাইকোলজিক্যালি সে ফিট কি না, কনটেন্ট নলেজ আছে কি না, প্যাডাগজিক্যাল স্কিল আছে কি না—এই সমস্ত জিনিস বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া উচিত। তাই পিএসসির আদলে একটি স্বতন্ত্র কমিশন করে নিরপেক্ষভাবে শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই কমিশনই গবেষণা করবে কেমন মানের ও কতজন শিক্ষক দরকার এবং সাইকোলজিক্যাল অ্যাপটিটিউড ও মোরাল স্ট্যান্ডার্ড টেস্টের মাধ্যমে যোগ্যদের নির্বাচন করবে। সরকার সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে এসব তদন্ত করতে গিয়ে সবকিছু গোলমেলে করে ফেলছে।