রোনালদোকে সান্ত্বনা দিলেন ইয়ামাল © সংগৃহীত
টানেলের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। মাথা নিচু, চোখে গভীর হতাশার ছাপ। টেলিভিশনের ক্যামেরাও যেন সেদিন তাকে ছেড়ে যেতে চাইছিল না। মাঠ থেকে টানেল, টানেল পেরিয়ে করিডর, তারপর ড্রেসিংরুমের দরজা পর্যন্ত অনুসরণ করেছে বিশ্বের কোটি দর্শকের পরিচিত সেই মুখটিকে। যেন ক্যামেরাও বুঝতে পেরেছিল—এটি কেবল একজন ফুটবলারের মাঠ ছেড়ে যাওয়া নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসের এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য।
অন্যদিকে তখন ডালাস স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে উচ্ছ্বাসে ভাসছে স্পেন। খেলোয়াড়রা একে অপরকে জড়িয়ে ধরছেন, গ্যালারিতে লাল-হলুদের ঢেউ, চারদিকে বিজয়ের উল্লাস। একই মুহূর্তে ফুটবল যেন তুলে ধরল জীবনের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা, এক দলের উৎসবই অন্য দলের গভীর শোক।
স্পেনের জন্য এটি ছিল কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার আনন্দ, আর পর্তুগালের জন্য ছিল বিশ্বকাপ স্বপ্নের সমাপ্তি। সেই পরাজয়ের সঙ্গেই শেষ হয়ে গেল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায়ও।
ডালাসে শেষ ষোলোর লড়াইটি দীর্ঘ সময় ছিল ধৈর্য, কৌশল আর অপেক্ষার গল্প। বলের দখলে এগিয়ে থেকেও স্পেন পর্তুগালের সুসংগঠিত রক্ষণ ভাঙতে পারছিল না। অন্যদিকে পর্তুগালও পাল্টা আক্রমণে খুব বেশি ঝুঁকি নেয়নি। সময় যত গড়াচ্ছিল, ততই মনে হচ্ছিল ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্যই হয়তো এখানেই, একটি মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো গল্প।
নির্ধারিত সময়ের যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে ফেরান তোরেসের নিখুঁত পাস ধরে দুই ডিফেন্ডারের মাঝের ফাঁকা জায়গায় ঢুকে পড়েন বদলি মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো। ঠান্ডা মাথায় নেওয়া নিচু শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। সেই এক গোলেই বদলে যায় পুরো ম্যাচের ভাগ্য। স্পেন পেয়ে যায় কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট, আর পর্তুগালের সামনে নেমে আসে নীরবতা।
গোল হজমের পর মরিয়া হয়ে সমতায় ফেরার চেষ্টা করে রবার্তো মার্তিনেসের দল। শেষ কয়েক মিনিটে সব শক্তি উজাড় করে আক্রমণে ওঠে তারা। কিন্তু স্পেনের রক্ষণ আর কোনো সুযোগ দেয়নি। ম্যাচ শেষে হয়তো পর্তুগালের আক্ষেপ থাকবে, আরও আগে যদি আক্রমণে সাহস দেখানো যেত, তবে গল্পটা ভিন্নও হতে পারত। তবে ফুটবলে 'যদি' শব্দের কোনো মূল্য নেই।
শেষ বাঁশি বাজতেই স্পেনের খেলোয়াড়রা আনন্দে ছুটে যান একে অপরের দিকে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে পর্তুগাল শিবিরে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। সেই নীরবতার মাঝেই ধীরে ধীরে মাঠ ছেড়ে টানেলের দিকে হাঁটতে থাকেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বলে দিচ্ছিল, এবার সত্যিই শেষ।
বিশ্বজুড়ে কোটি দর্শক টেলিভিশনের পর্দায় দেখছিলেন সেই দৃশ্য। একসময়ের অদম্য, দুর্বার রোনালদোকে এতটা অসহায় খুব কমই দেখা গেছে। করিডর পেরিয়ে ড্রেসিংরুমের দরজা পর্যন্ত ক্যামেরা তাকে অনুসরণ করে। কোনো কথা নয়, কোনো অভিব্যক্তি নয়, শুধু নীরব হেঁটে চলা। কখনও কখনও নীরবতাই সবচেয়ে বেশি কথা বলে।
সেই আবেগঘন মুহূর্তে এগিয়ে এসে রোনালদোকে সান্ত্বনা জানান প্রতিপক্ষ দলের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল। দুই প্রজন্মের দুই তারকার সেই সংক্ষিপ্ত মুহূর্ত যেন ফুটবলকে আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে মাঠে, শ্রদ্ধা থাকে হৃদয়ে।
স্পেন উৎসব করেছে, পর্তুগাল বিদায় নিয়েছে। আর বিশ্বকাপ বিদায় জানিয়েছে এমন এক কিংবদন্তিকে, যিনি হয়তো ট্রফিটা জিততে পারেননি, কিন্তু কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন অনেক আগেই।